| বাংলার জন্য ক্লিক করুন
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * কক্সবাজারে ইয়াবা ও আগ্নেয়াস্ত্র সহ মাদক ব্যবসায়ী আটক   * স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৪০০ মণ আম ধ্বংস   * হুয়াওয়ের সাথে প্যানাসনিকের ব্যবসা স্থগিত   * বিজেপি এগিয়ে ৩৩৯ আসনে, কংগ্রেস ৯০   * ৩২ দলেই হবে কাতার বিশ্বকাপ   * সংগীতশিল্পী খালিদ হোসেনকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা   * টিকিট নিয়ে বিভ্রান্তি, ভোগান্তিতে মানুষ   * গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে আগুন ধরে একই পরিবারের ৪ জন নিহত   * সঙ্গীতশিল্পী খালিদ হোসেনের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক   * মেক্সিকোতে অপরাধী চক্রের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১০  

   উপ-সম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
প্রসঙ্গ ভ্রাম্যমাণ ফায়ার সার্ভিস ও Fire hydrant

মোমিন মেহেদী

বাংলাদেশকে কখনোই ভালো না বেসে পারেন নি যারা; তারা আজো জীবন্ত ইতিহাসের পাতায়। সেই ইতিহাসের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে তৈরি হই আলোর কথা-ভালোর কথা। আর একারণেই সাহসের সাথে বলছি- পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার পর এবার মৃত্যুকূপ হলো আধুনিক ঢাকার বনানী। বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর এফ আর টাওয়ার নামের ২২তলা ভবনের কয়েকটি ফ্লোর আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। আগুনে ২৫ জন নিহত ও ৭৫ জন আহত হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৭১ জন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বনানীতে ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনা। আধুনিক ঢাকায় কোনো ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে এত প্রাণহানির ঘটনা এই প্রথম। আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক চারটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি উদ্ধারকারী দল ভবনে প্রবেশ করে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলও ভেতরে যায়। বিভিন্ন তথ্য সূত্র থেকে জানতে পেরেছি- ভবনের ৭ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এফ আর টাওয়ারের ৯ তলা থেকে ১৩ তলা পর্যন্ত পাঁচটি ফ্লোর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ফাল্গুনের তপ্ত দুপুরেও ধোঁয়ার কারণে ওই এলাকা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ধোঁয়ায় আটকেপড়া অসংখ্য মানুষ বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল। এই আকুতি তৈরি করেছে আমার মত অসংখ্য মানুষের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। তবে উত্তর এসেছে দায়সাড়া গোছের। আর একারণেই বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, দায়সাড়া গোছের রাষ্ট্রপরিচালনাকারীদের জন্যই যে ২২ তলা ভবনটির সবকটি ফ্লোরেই কোনো না কোনো অফিস আছে, আর নিচের দুটি তলায় মার্কেট; সেই সহ¯্র মানুষের ভবনটিতে ১২ জন করে ধারণ ক্ষমতার তিনটি লিফট ও জরুরি সিঁড়ি আছে দুটি। বেজমেন্টে পার্কিং আছে। আগুনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে লিফট বন্ধ হয়ে যায়। প্রচন্ড ধোঁয়ার কারণে সাততলা থেকে উপরে যারা ছিল তারা সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেনি। যে কারণে একাধিক ব্যক্তিকে লোহার রড হাতে নিয়ে ভবনের কাচ ভাঙতে দেখা যায়। যাতে ভাঙা কাচ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। অন্যান্য ফ্লোরেও একইভাবে ধোঁয়া বের করার জন্য আটকেপড়া লোকজন কাচ ভেঙে দেন। আতঙ্কিত মানুষ লাফিয়ে নিচে পড়ে। কেউ কেউ পাইপ বা তার বেয়ে নিচে নামেন। অনেকে ঝুঁকি নিয়ে লাফ দিয়ে অন্য ভবনে চলে যান।
অসহনীয় জ্যাম আর জনারণ্যের কারনে নির্মম চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি, বনানী ট্রাজেডি সহ প্রায় সকল ট্রাজেডিতে ফায়ার সার্ভিস ইউনিট পৌছেছে দেরিতে। তবুও আমাদের ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- আগুন দ্রুততার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে বনানী-গুলশান এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত। ভবনটির ফায়ারের ছাড়পত্র ছিল কিনা, বা নকশার বাইরে ভবনে কিছু ছিল কিনা খতিয়ে দেখা হবে। ফায়ার সার্ভিস দেরিতে আসা ও অগ্নিনির্বাপণের কাজ বিলম্বের প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। তা ছাড়া আমাদের অত্যাধুনিক গাড়িগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল। এগুলো সেট করতে কিছুটা সময় লাগে। ভবনে সোফা সেট, পর্দাসহ সিনথেটিকের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ ছিল, যা অতিমাত্রায় দাহ্য। এগুলো থেকে প্রচন্ড ধোঁয়া হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রচন্ড বেগ পেতে হয়। আমরা আগুন পেয়েছি ১২ ও ১৩ তলাতে। আগুন ৮ তলা থেকেও উঠতে পারে ৯ তলা থেকেও উঠতে পারে। তবে আমরা ১২ তলাতে আগুন পেয়েছি। আগুন কোন ফ্লোরে কীভাবে লেগেছে তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। আমরা আটকে পড়া অন্তত ১০০ জনকে উদ্ধার করেছি। উঁচু ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিশ্বের সবচাইতে বিপজ্জনক ফায়ার ফাইটিং। ভবনটির দুই পাশে খালি জায়গা ছিল না। এ ধরনের ভবনে আগুন লাগলে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। আমাদের ২২টি টিম কাজ করেছে। শুরুতে ডিফেন্সিভ ও পরে অফেন্সিভ মুডে কাজ করি। আগুন লাগার খবর পাওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। রাস্তায় যানজটের বিষয়টিও আপনার বিবেচনায় রাখতে হবে। কোথায় থেকে আগুনের সূত্রপাত সেটা তদন্ত করে বলা যাবে। প্রাথমিক সার্চে ভেতরে কেউ আটকা পড়েনি। আমরা বড় লেডার দিয়ে উদ্ধার করেছি। ভবনের এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লোকজন চলে গেছে।
চরম বাস্তবতা হলো- নির্মম অগ্নিকান্ডগুলোর পর আমরা দেখেছি যে, আগুনের কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, নির্মাণজনিত ত্রুটি অনুসন্ধানসহ এ ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ করার জন্য চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব কমিটি করেছে। বাংলাদেশে সমস্যায় আক্রান্ত জনগনের জন্য সমাধান নিয়ে কে কি ভেবেছে আমার জানা নেই। তবে আমি বরাবরই সমস্যা দেখলে সমাধানের জন্য নিরন্তর রাজনৈতিক কর্মসূচী ও লেখালেখি করে যাচ্ছি। কেন যেন কানে বাজছে- নরককুন্ডের ক্ষেত্র যেন ‘তৈরি হয়েই ছিল’; যেভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল চকবাজারের আগুন; ক্যানেস্তারাগুলো কাজ করেছে ‘বোমার মত’। অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর এক কর্মী কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন আজগর লেনের পাশে। কিন্তু সরু রাস্তা দেখে কোন পথে যাবেন, তা নিয়ে পড়েন দ্বিধায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘মানুষ পালাচ্ছিল। কেউ বলছিল হায়দার বক্স দিয়ে যেতে, কেউ বলছিল আজগর লেন দিয়ে ঢুকতে। আজগর লেনের উত্তর মাথা থেকে চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনের আগুন দেখা যাচ্ছিল। তখন আজগর লেন দিয়েই গাড়ি ঢুকালাম। আগে আসলে কী হবে? প্রায় সাড়ে ৪ হাজার লিটার পানির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গাড়িটি সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকাতে বেগ পেতে হয়েছে চালককে। চালক আমাদের বলে, ‘ভাই গাড়ি আজগর লেনের রাস্তা দিয়ে ঢুকবে না’। তখন আমরা চালককে অভয় দিয়ে ঢুকাই। গাড়িটি যদি তখন না ঢোকানো যেত, তাহলে আগুন আরও উত্তরে চলে আসত। রাস্তায় যানজট থাকলেও বোর্ড অফিসের সামনে দিয়ে আমার গাড়ি লালবাগ ফায়ার স্টেশন থেকে আনতে সময় লেগেছে ৩ মিনিট ৫২ সেকেন্ড। গাড়ি ঢোকানোর পরই ফায়ারম্যান শাহজালাল আর দিপুল পাইপ টান দিয়ে নামিয়ে পানি ছুড়তে শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা দেখে আরও ইউনিটের প্রয়োজনের কথা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানান তিনি। অগ্নিকান্ডস্থল থেকে সোয়া এক কিলোমিটার দূরত্ব থেকে লালবাগ ফায়ার স্টেশনের গাড়ি আসার পরপরই চলে আসে পলাশী ফায়ার স্টেশনের গাড়ি। ভয়াবহ এই আগুন নেভাতে আরও ৩৫টি ইউনিট পরে যুক্ত হয়। এত কিছুর পরও সত্য কথাটি হলো- রাস্তা সরু হওয়ার কারণে হাইরাইজ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য আমাদের যেসব গাড়ি আছে, তার একটাও ঢোকেনি। ওই সব গাড়ি ঢোকানো গেলে আরও তাড়াতাড়ি আগুন নেভানো যেত। কারণ সরু রাস্তা আর এ ধরনের অবস্থায় প্রচুর ক্রাউডি হয়।’
উন্নত বিশ্বে যেখানে আগুন লাগে, সেখানেই পৌছে যায় অত্যাধুনিক ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। শুধু পৌছে গিয়েই শেষ নয়; উদ্ধার করার জন্য একদিকে থাকে ক্রেন, উন্নমানের ট্রলি সহ বিভিন্ন উদ্ধার যন্ত্র এবং পানি বোঝাই গাড়ি। অথচ বাংলাদেশে? তা নেই-ই, বরং গিয়ে আগুন নেভাতে পানি খুঁজতে থাকে। কোথাও নেই পানি উত্তলন যন্ত্রও। এমন অনেক কারনেই আজ যখন গবেষষার চেষ্টা করি, তখনজানতে পারি- বাংলাদেশে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় যতই প্রাণ যায়, তার ৭১ শতাংশই কেড়ে নেয় সড়ক। অর্থাৎ, বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত হলে তার ৭১ জনই প্রাণ হারায় সড়ক দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জীবনহানি ঘটছে নৌপথে। ২০১৮ সালে দেশে সাত ধরনের দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা গেছে, তার ১৮ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে নৌ দুর্ঘটনায়। জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরের অবস্থানে রয়েছে আগুন। গত বছর দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে শতকরা প্রায় ২ জন নিহত হয় অগ্নিকান্ডের ঘটনায়। গত মাসে আগুনে চুড়িহাট্টায় ৭১ জন নিহত হওয়ার পর বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে ২৫ জনের প্রাণ যায়। অর্থাৎ, এ বছরের প্রথম তিন মাসে অগ্নিকান্ডের এ দুটি বড় দুর্ঘটনায় ৯৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সংখ্যা ২০১৬-১৭ সালে অগ্নিকান্ডে সারা দেশে নিহতের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৩৫০ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৬৯ জন। আগের বছর সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন গেছে ২ হাজার ২১৭ জনের। যদিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। সরকার প্রদত্ত তথ্য সবসমই বাংলাদেশে সীমিত এসেছে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী এই সংখ্যা দ্বিগুন ছাড়িয়ে গেছে।
কারণ হিসেবে বহু বিষয় থাকলেও একটি বিষয় সবচেয়ে বড়; আর তা হলো- অপরিকল্পিত নগর। আইন না মানার প্রবণতা। কর্তৃপক্ষের অবহেলা। সব মিলিয়ে মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে বাস রাজধানী ঢাকার মানুষের। পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা হিসেবে খ্যাত নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় আগুনের বিভীষিকার কথা এখনও কেউ ভুলতে পারেনি। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ফারুক-রুপায়ন টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল ২৫ তাজা প্রাণ। প্রশ্ন হলো, কত অশ্রুজলে থামবে এমন মৃত্যু। কত স্বজনহারা মানুষের গগনবিদারী আর্তনাদে কর্তৃপক্ষের টনক লড়বে। কত অসহায় পরিবার বাড়লে কার্যকর হবে আইন। কত বিপর্যয়, চোখের সামনে বিভীষিকাময় মৃত্যু হলে গড়ে উঠবে নিরাপদ নগরী। বাড়বে নাগরিক সচেতনতা। প্রশ্নগুলো ফের সামনে এসেছে। নগরীর ৯৫ ভাগ ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনে অগ্নি নিরাপত্তায় নেয়া হয়নি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। যেমন ছিল না বনানীর এফআর টাওয়ারে। ভবনটির সিঁড়িপথও ছিল অপ্রতুল। অনুমোদনহীন কয়েকটি তলা বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই এফআর টাওয়ারের চারপাশে গা ঘেষে ঘেষে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক সুউচ্চ ভবন। অথচ বিল্ডিং কোড অনুযায়ী এক ভবন থেকে অন্য ভবনের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম রয়েছে। চরম বাস্তবতা হলো- এফআর টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসার জরুরী পথ ছিল না; যা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক। ফায়ার এক্সিট বা আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জরুরী নির্গমন পথ থাকলে হয়ত এত হতাহত হতো না। কিংবা আগুন নেভানোর নিজস্ব ভাল ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা হতো না। তাছাড়া বিল্ডিং কোড অনুযায়ী- প্রতিটি ভবনে থাকতে হবে স্মোক ডিটেক্টর বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র। এই যন্ত্র বসানো হলে কোন তলায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা এর ওপর উঠে গেলেই একটি শব্দ করে ভবনের সবাইকে সতর্ক করে দেবে। থাকবে হিট ডিটেক্টর সিস্টেম। এই যন্ত্র বসানো হলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সবাইকে জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা থাকবেন, যিনি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সবকিছু তদারক করবেন। সুউচ্চ ভবনে হেলিপ্যাড থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতি সাড়ে ৫০০ বর্গফুট আয়তনের জন্য একটি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকতে হবে। এরপরও প্রতি তিন মাস পর পর ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সুউচ্চ ভবনে কমপক্ষে দুটি সিঁড়িপথ থাকবে। এমনটা হলে আর হারাতে হতো না তাজা প্রাণগুলো। সবকিছুর নেপথ্য কারণ দুর্নীতি। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজউক সহ সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অসংখ্য ভবন নির্মিত হচ্ছে। ঝুঁকি বাড়ছে আমাদের মৃত্যুর। এমতবস্থায় সকল সেক্টরের দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সময়ের আলোচিত দৈনিক এশিয়া বানীর প্রকাশক জনাব তাজুল ইসলামের যুক্তিনুসারে ভ্রাম্যমান ফায়ার সার্ভিস পয়েন্ট প্রত্যাশা করছি। তাঁর মতে যদি চকবাজারে ফায়ার সার্ভিস যথাযথ সময়ে পৌছতে পারতো, তাহলে কিছু প্রাণ হয়তো আরো বেঁেচ যেতো, ক্ষয় ক্ষতিও কম হতো। একই কথা বনানী বা গুলশানের বেলাও। যেহেতু একের পর এক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছেই, সেহেতু সতর্কতার সাথে ভ্রাম্যমান ফায়ার সার্ভিস ইউনিট কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ ও ঝুঁকির্পূর্ণ এলাকায় রাখলে নিরাপত্তায় অগ্রসর হবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আমি ব্যাক্তিগতভাবে চাই ঋরৎব যুফৎধহঃ -এর ব্যবস্থা করা হোক। যেহেতু ১ কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানি সংযোগ দেওয়া হয়েছিলো চকবাজারে। মানুষের পায়ের চাপে সেই পানি প্রবাহ বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো; সেহেতু তার থেকে উত্তরণের জন্য ঋরৎব যুফৎধহঃ খুবই জরুরী। যা আমাদের দেশের রাজনীতিক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভাবেনইনি। অথচ ১৮০১ সালে আবিষ্কার হয়েছে। ২১৮ বছরেও এদেশে কোথাও ঋরৎব যুফৎধহঃ লাগানো হয়নি। আমরা কি এতটাই পিছিয়ে?’ হ্যাঁ, আমরা রাজনীতি-ক্ষমতা আর দুর্নীতির গ্যারাকলে পড়ে অনেক পিছিয়ে আছি। পুরো জাতি পিছিয়ে আছে। কেননা, প্রতিদিন এই দেশে শত কোটি টাকার রাজনৈতিক কর্মসূচী পালিত হয়; দুর্নীতি হয় অন্তত ৩ থেকে ৪ শত কোটি টাকার। চাঁদা ওঠে ঠেলা গাড়ি-রিক্সা-সিএনজি-বাস স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে বড় বড় জুয়ার কোটে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। তবু বাংলাদেশ পিছিয়ে যায়, কারণ একটাই এই টাকা জনগনের রক্ত চুষে চুষে পাচার হয় আমেরিকায়-মালয়েশিয়ায়-অস্টেলিয়ায়-কানাডায়-লন্ডনে আর রাশিয়া বড় বড় পতিতার দেশে। বউকে নিয়ে দেশে থাকেন নেতারা, বিদেশ গেলে সেখানে থাকেন রক্ষিতাদের সাথে। তাই গজব নেমে আসে বাংলাদেশে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য সবসময় বলে এসেছেন নীতিহীন নেতা-দুর্নীতিবাজদের বেলায় তিনি জিরো টলারেন্সে। কিন্তু তার ক্ষমতার এই মসনদ তো ধরে রেখেছেন নেতা নামক জুয়ারী-চাদাবাজ-জঙ্গী-সন্ত্রাসী আর আমলা-প্রশাসনের রাঘব বোয়ালরা। তারা যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘোরায়, সেদিকেই ঘোরে বাংলাদেশ। পাশাপাশি শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ এমনকি ধর্মীয় কমূসূচীও চলে তাদের মত করে। তারা হয়তো জানেই না যে, এই ঢাকায় ৩০৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় আড়াই কোটি লোক থাকে (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৩০০০+ জন) আর কোন দুর্ঘটনা ঘটতেছে না বলে বলে মুখে ফেনা উঠাচ্ছেন নীতি আদর্শ বিবর্জিত রাজনীতি ও প্রশাসনিক কর্তাগন। উত্তরণ প্রয়োজন, খুবই প্রয়োজন তাই সবার প্রতি অনুরোধ জানাই- চলুন নিবেদিত থাকি সত্য-সাহস-আদর্শ আর নীতির সাথে সকল সমস্যা সমাধানের জন্য নিরন্তর...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি ও প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় পরিবেশধারা

 

প্রসঙ্গ ভ্রাম্যমাণ ফায়ার সার্ভিস ও Fire hydrant
                                  

মোমিন মেহেদী

বাংলাদেশকে কখনোই ভালো না বেসে পারেন নি যারা; তারা আজো জীবন্ত ইতিহাসের পাতায়। সেই ইতিহাসের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে তৈরি হই আলোর কথা-ভালোর কথা। আর একারণেই সাহসের সাথে বলছি- পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার পর এবার মৃত্যুকূপ হলো আধুনিক ঢাকার বনানী। বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর এফ আর টাওয়ার নামের ২২তলা ভবনের কয়েকটি ফ্লোর আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। আগুনে ২৫ জন নিহত ও ৭৫ জন আহত হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৭১ জন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বনানীতে ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনা। আধুনিক ঢাকায় কোনো ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে এত প্রাণহানির ঘটনা এই প্রথম। আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক চারটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি উদ্ধারকারী দল ভবনে প্রবেশ করে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলও ভেতরে যায়। বিভিন্ন তথ্য সূত্র থেকে জানতে পেরেছি- ভবনের ৭ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এফ আর টাওয়ারের ৯ তলা থেকে ১৩ তলা পর্যন্ত পাঁচটি ফ্লোর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ফাল্গুনের তপ্ত দুপুরেও ধোঁয়ার কারণে ওই এলাকা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ধোঁয়ায় আটকেপড়া অসংখ্য মানুষ বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল। এই আকুতি তৈরি করেছে আমার মত অসংখ্য মানুষের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। তবে উত্তর এসেছে দায়সাড়া গোছের। আর একারণেই বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, দায়সাড়া গোছের রাষ্ট্রপরিচালনাকারীদের জন্যই যে ২২ তলা ভবনটির সবকটি ফ্লোরেই কোনো না কোনো অফিস আছে, আর নিচের দুটি তলায় মার্কেট; সেই সহ¯্র মানুষের ভবনটিতে ১২ জন করে ধারণ ক্ষমতার তিনটি লিফট ও জরুরি সিঁড়ি আছে দুটি। বেজমেন্টে পার্কিং আছে। আগুনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে লিফট বন্ধ হয়ে যায়। প্রচন্ড ধোঁয়ার কারণে সাততলা থেকে উপরে যারা ছিল তারা সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেনি। যে কারণে একাধিক ব্যক্তিকে লোহার রড হাতে নিয়ে ভবনের কাচ ভাঙতে দেখা যায়। যাতে ভাঙা কাচ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। অন্যান্য ফ্লোরেও একইভাবে ধোঁয়া বের করার জন্য আটকেপড়া লোকজন কাচ ভেঙে দেন। আতঙ্কিত মানুষ লাফিয়ে নিচে পড়ে। কেউ কেউ পাইপ বা তার বেয়ে নিচে নামেন। অনেকে ঝুঁকি নিয়ে লাফ দিয়ে অন্য ভবনে চলে যান।
অসহনীয় জ্যাম আর জনারণ্যের কারনে নির্মম চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি, বনানী ট্রাজেডি সহ প্রায় সকল ট্রাজেডিতে ফায়ার সার্ভিস ইউনিট পৌছেছে দেরিতে। তবুও আমাদের ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- আগুন দ্রুততার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে বনানী-গুলশান এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত। ভবনটির ফায়ারের ছাড়পত্র ছিল কিনা, বা নকশার বাইরে ভবনে কিছু ছিল কিনা খতিয়ে দেখা হবে। ফায়ার সার্ভিস দেরিতে আসা ও অগ্নিনির্বাপণের কাজ বিলম্বের প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। তা ছাড়া আমাদের অত্যাধুনিক গাড়িগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল। এগুলো সেট করতে কিছুটা সময় লাগে। ভবনে সোফা সেট, পর্দাসহ সিনথেটিকের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ ছিল, যা অতিমাত্রায় দাহ্য। এগুলো থেকে প্রচন্ড ধোঁয়া হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রচন্ড বেগ পেতে হয়। আমরা আগুন পেয়েছি ১২ ও ১৩ তলাতে। আগুন ৮ তলা থেকেও উঠতে পারে ৯ তলা থেকেও উঠতে পারে। তবে আমরা ১২ তলাতে আগুন পেয়েছি। আগুন কোন ফ্লোরে কীভাবে লেগেছে তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। আমরা আটকে পড়া অন্তত ১০০ জনকে উদ্ধার করেছি। উঁচু ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিশ্বের সবচাইতে বিপজ্জনক ফায়ার ফাইটিং। ভবনটির দুই পাশে খালি জায়গা ছিল না। এ ধরনের ভবনে আগুন লাগলে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। আমাদের ২২টি টিম কাজ করেছে। শুরুতে ডিফেন্সিভ ও পরে অফেন্সিভ মুডে কাজ করি। আগুন লাগার খবর পাওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। রাস্তায় যানজটের বিষয়টিও আপনার বিবেচনায় রাখতে হবে। কোথায় থেকে আগুনের সূত্রপাত সেটা তদন্ত করে বলা যাবে। প্রাথমিক সার্চে ভেতরে কেউ আটকা পড়েনি। আমরা বড় লেডার দিয়ে উদ্ধার করেছি। ভবনের এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লোকজন চলে গেছে।
চরম বাস্তবতা হলো- নির্মম অগ্নিকান্ডগুলোর পর আমরা দেখেছি যে, আগুনের কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, নির্মাণজনিত ত্রুটি অনুসন্ধানসহ এ ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ করার জন্য চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব কমিটি করেছে। বাংলাদেশে সমস্যায় আক্রান্ত জনগনের জন্য সমাধান নিয়ে কে কি ভেবেছে আমার জানা নেই। তবে আমি বরাবরই সমস্যা দেখলে সমাধানের জন্য নিরন্তর রাজনৈতিক কর্মসূচী ও লেখালেখি করে যাচ্ছি। কেন যেন কানে বাজছে- নরককুন্ডের ক্ষেত্র যেন ‘তৈরি হয়েই ছিল’; যেভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল চকবাজারের আগুন; ক্যানেস্তারাগুলো কাজ করেছে ‘বোমার মত’। অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর এক কর্মী কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন আজগর লেনের পাশে। কিন্তু সরু রাস্তা দেখে কোন পথে যাবেন, তা নিয়ে পড়েন দ্বিধায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘মানুষ পালাচ্ছিল। কেউ বলছিল হায়দার বক্স দিয়ে যেতে, কেউ বলছিল আজগর লেন দিয়ে ঢুকতে। আজগর লেনের উত্তর মাথা থেকে চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনের আগুন দেখা যাচ্ছিল। তখন আজগর লেন দিয়েই গাড়ি ঢুকালাম। আগে আসলে কী হবে? প্রায় সাড়ে ৪ হাজার লিটার পানির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গাড়িটি সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকাতে বেগ পেতে হয়েছে চালককে। চালক আমাদের বলে, ‘ভাই গাড়ি আজগর লেনের রাস্তা দিয়ে ঢুকবে না’। তখন আমরা চালককে অভয় দিয়ে ঢুকাই। গাড়িটি যদি তখন না ঢোকানো যেত, তাহলে আগুন আরও উত্তরে চলে আসত। রাস্তায় যানজট থাকলেও বোর্ড অফিসের সামনে দিয়ে আমার গাড়ি লালবাগ ফায়ার স্টেশন থেকে আনতে সময় লেগেছে ৩ মিনিট ৫২ সেকেন্ড। গাড়ি ঢোকানোর পরই ফায়ারম্যান শাহজালাল আর দিপুল পাইপ টান দিয়ে নামিয়ে পানি ছুড়তে শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা দেখে আরও ইউনিটের প্রয়োজনের কথা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানান তিনি। অগ্নিকান্ডস্থল থেকে সোয়া এক কিলোমিটার দূরত্ব থেকে লালবাগ ফায়ার স্টেশনের গাড়ি আসার পরপরই চলে আসে পলাশী ফায়ার স্টেশনের গাড়ি। ভয়াবহ এই আগুন নেভাতে আরও ৩৫টি ইউনিট পরে যুক্ত হয়। এত কিছুর পরও সত্য কথাটি হলো- রাস্তা সরু হওয়ার কারণে হাইরাইজ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য আমাদের যেসব গাড়ি আছে, তার একটাও ঢোকেনি। ওই সব গাড়ি ঢোকানো গেলে আরও তাড়াতাড়ি আগুন নেভানো যেত। কারণ সরু রাস্তা আর এ ধরনের অবস্থায় প্রচুর ক্রাউডি হয়।’
উন্নত বিশ্বে যেখানে আগুন লাগে, সেখানেই পৌছে যায় অত্যাধুনিক ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। শুধু পৌছে গিয়েই শেষ নয়; উদ্ধার করার জন্য একদিকে থাকে ক্রেন, উন্নমানের ট্রলি সহ বিভিন্ন উদ্ধার যন্ত্র এবং পানি বোঝাই গাড়ি। অথচ বাংলাদেশে? তা নেই-ই, বরং গিয়ে আগুন নেভাতে পানি খুঁজতে থাকে। কোথাও নেই পানি উত্তলন যন্ত্রও। এমন অনেক কারনেই আজ যখন গবেষষার চেষ্টা করি, তখনজানতে পারি- বাংলাদেশে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় যতই প্রাণ যায়, তার ৭১ শতাংশই কেড়ে নেয় সড়ক। অর্থাৎ, বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত হলে তার ৭১ জনই প্রাণ হারায় সড়ক দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জীবনহানি ঘটছে নৌপথে। ২০১৮ সালে দেশে সাত ধরনের দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা গেছে, তার ১৮ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে নৌ দুর্ঘটনায়। জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরের অবস্থানে রয়েছে আগুন। গত বছর দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে শতকরা প্রায় ২ জন নিহত হয় অগ্নিকান্ডের ঘটনায়। গত মাসে আগুনে চুড়িহাট্টায় ৭১ জন নিহত হওয়ার পর বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে ২৫ জনের প্রাণ যায়। অর্থাৎ, এ বছরের প্রথম তিন মাসে অগ্নিকান্ডের এ দুটি বড় দুর্ঘটনায় ৯৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সংখ্যা ২০১৬-১৭ সালে অগ্নিকান্ডে সারা দেশে নিহতের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৩৫০ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৬৯ জন। আগের বছর সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন গেছে ২ হাজার ২১৭ জনের। যদিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। সরকার প্রদত্ত তথ্য সবসমই বাংলাদেশে সীমিত এসেছে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী এই সংখ্যা দ্বিগুন ছাড়িয়ে গেছে।
কারণ হিসেবে বহু বিষয় থাকলেও একটি বিষয় সবচেয়ে বড়; আর তা হলো- অপরিকল্পিত নগর। আইন না মানার প্রবণতা। কর্তৃপক্ষের অবহেলা। সব মিলিয়ে মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে বাস রাজধানী ঢাকার মানুষের। পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা হিসেবে খ্যাত নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় আগুনের বিভীষিকার কথা এখনও কেউ ভুলতে পারেনি। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ফারুক-রুপায়ন টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল ২৫ তাজা প্রাণ। প্রশ্ন হলো, কত অশ্রুজলে থামবে এমন মৃত্যু। কত স্বজনহারা মানুষের গগনবিদারী আর্তনাদে কর্তৃপক্ষের টনক লড়বে। কত অসহায় পরিবার বাড়লে কার্যকর হবে আইন। কত বিপর্যয়, চোখের সামনে বিভীষিকাময় মৃত্যু হলে গড়ে উঠবে নিরাপদ নগরী। বাড়বে নাগরিক সচেতনতা। প্রশ্নগুলো ফের সামনে এসেছে। নগরীর ৯৫ ভাগ ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনে অগ্নি নিরাপত্তায় নেয়া হয়নি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। যেমন ছিল না বনানীর এফআর টাওয়ারে। ভবনটির সিঁড়িপথও ছিল অপ্রতুল। অনুমোদনহীন কয়েকটি তলা বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই এফআর টাওয়ারের চারপাশে গা ঘেষে ঘেষে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক সুউচ্চ ভবন। অথচ বিল্ডিং কোড অনুযায়ী এক ভবন থেকে অন্য ভবনের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম রয়েছে। চরম বাস্তবতা হলো- এফআর টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসার জরুরী পথ ছিল না; যা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক। ফায়ার এক্সিট বা আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জরুরী নির্গমন পথ থাকলে হয়ত এত হতাহত হতো না। কিংবা আগুন নেভানোর নিজস্ব ভাল ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা হতো না। তাছাড়া বিল্ডিং কোড অনুযায়ী- প্রতিটি ভবনে থাকতে হবে স্মোক ডিটেক্টর বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র। এই যন্ত্র বসানো হলে কোন তলায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা এর ওপর উঠে গেলেই একটি শব্দ করে ভবনের সবাইকে সতর্ক করে দেবে। থাকবে হিট ডিটেক্টর সিস্টেম। এই যন্ত্র বসানো হলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সবাইকে জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা থাকবেন, যিনি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সবকিছু তদারক করবেন। সুউচ্চ ভবনে হেলিপ্যাড থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতি সাড়ে ৫০০ বর্গফুট আয়তনের জন্য একটি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকতে হবে। এরপরও প্রতি তিন মাস পর পর ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সুউচ্চ ভবনে কমপক্ষে দুটি সিঁড়িপথ থাকবে। এমনটা হলে আর হারাতে হতো না তাজা প্রাণগুলো। সবকিছুর নেপথ্য কারণ দুর্নীতি। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজউক সহ সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অসংখ্য ভবন নির্মিত হচ্ছে। ঝুঁকি বাড়ছে আমাদের মৃত্যুর। এমতবস্থায় সকল সেক্টরের দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সময়ের আলোচিত দৈনিক এশিয়া বানীর প্রকাশক জনাব তাজুল ইসলামের যুক্তিনুসারে ভ্রাম্যমান ফায়ার সার্ভিস পয়েন্ট প্রত্যাশা করছি। তাঁর মতে যদি চকবাজারে ফায়ার সার্ভিস যথাযথ সময়ে পৌছতে পারতো, তাহলে কিছু প্রাণ হয়তো আরো বেঁেচ যেতো, ক্ষয় ক্ষতিও কম হতো। একই কথা বনানী বা গুলশানের বেলাও। যেহেতু একের পর এক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছেই, সেহেতু সতর্কতার সাথে ভ্রাম্যমান ফায়ার সার্ভিস ইউনিট কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ ও ঝুঁকির্পূর্ণ এলাকায় রাখলে নিরাপত্তায় অগ্রসর হবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আমি ব্যাক্তিগতভাবে চাই ঋরৎব যুফৎধহঃ -এর ব্যবস্থা করা হোক। যেহেতু ১ কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানি সংযোগ দেওয়া হয়েছিলো চকবাজারে। মানুষের পায়ের চাপে সেই পানি প্রবাহ বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো; সেহেতু তার থেকে উত্তরণের জন্য ঋরৎব যুফৎধহঃ খুবই জরুরী। যা আমাদের দেশের রাজনীতিক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভাবেনইনি। অথচ ১৮০১ সালে আবিষ্কার হয়েছে। ২১৮ বছরেও এদেশে কোথাও ঋরৎব যুফৎধহঃ লাগানো হয়নি। আমরা কি এতটাই পিছিয়ে?’ হ্যাঁ, আমরা রাজনীতি-ক্ষমতা আর দুর্নীতির গ্যারাকলে পড়ে অনেক পিছিয়ে আছি। পুরো জাতি পিছিয়ে আছে। কেননা, প্রতিদিন এই দেশে শত কোটি টাকার রাজনৈতিক কর্মসূচী পালিত হয়; দুর্নীতি হয় অন্তত ৩ থেকে ৪ শত কোটি টাকার। চাঁদা ওঠে ঠেলা গাড়ি-রিক্সা-সিএনজি-বাস স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে বড় বড় জুয়ার কোটে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। তবু বাংলাদেশ পিছিয়ে যায়, কারণ একটাই এই টাকা জনগনের রক্ত চুষে চুষে পাচার হয় আমেরিকায়-মালয়েশিয়ায়-অস্টেলিয়ায়-কানাডায়-লন্ডনে আর রাশিয়া বড় বড় পতিতার দেশে। বউকে নিয়ে দেশে থাকেন নেতারা, বিদেশ গেলে সেখানে থাকেন রক্ষিতাদের সাথে। তাই গজব নেমে আসে বাংলাদেশে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য সবসময় বলে এসেছেন নীতিহীন নেতা-দুর্নীতিবাজদের বেলায় তিনি জিরো টলারেন্সে। কিন্তু তার ক্ষমতার এই মসনদ তো ধরে রেখেছেন নেতা নামক জুয়ারী-চাদাবাজ-জঙ্গী-সন্ত্রাসী আর আমলা-প্রশাসনের রাঘব বোয়ালরা। তারা যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘোরায়, সেদিকেই ঘোরে বাংলাদেশ। পাশাপাশি শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ এমনকি ধর্মীয় কমূসূচীও চলে তাদের মত করে। তারা হয়তো জানেই না যে, এই ঢাকায় ৩০৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় আড়াই কোটি লোক থাকে (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৩০০০+ জন) আর কোন দুর্ঘটনা ঘটতেছে না বলে বলে মুখে ফেনা উঠাচ্ছেন নীতি আদর্শ বিবর্জিত রাজনীতি ও প্রশাসনিক কর্তাগন। উত্তরণ প্রয়োজন, খুবই প্রয়োজন তাই সবার প্রতি অনুরোধ জানাই- চলুন নিবেদিত থাকি সত্য-সাহস-আদর্শ আর নীতির সাথে সকল সমস্যা সমাধানের জন্য নিরন্তর...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি ও প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় পরিবেশধারা

 

পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী আচরণ
                                  

| ইকতেদার আহমেদ |

প্রায় সব রাষ্ট্রই জাতিসংঘের সদস্য। এগুলোর মধ্যে কেবল পাঁচটি রাষ্ট্র- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন- নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এ পাঁচ রাষ্ট্রের প্রতিটির রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করলে সিদ্ধান্তটি কার্যকারিতা হারায়। এই পাঁচটি রাষ্ট্রই আবার পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন। এসব রাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক বোমার পাশাপাশি হাইড্রোজেন বোমাও রয়েছে। হাইড্রোজেন বোমা পারমাণবিক বোমার চেয়ে একশ` গুণ অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। সমর বিশারদদের মতে, বর্তমান পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্য তিনটি হাইড্রোজেন বোমাই যথেষ্ট।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ছাড়াও সংস্থাটির আরও কতিপয় সদস্যরাষ্ট্রের স্বীকৃত পারমাণবিক বোমা রয়েছে। এ রাষ্ট্রগুলো হল ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার দাবি, তাদের কাছে হাইড্রোজেন বোমাও রয়েছে। ইসরাইলের হেফাজতে পারমাণবিক বোমা থাকার বিষয়টি স্বীকৃত না হলেও রাষ্ট্রটি যে পারমাণবিক শক্তিধর তা অনেকটাই নিশ্চিত। পাকিস্তান, ভারত ও ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। অপরদিকে উত্তর কোরিয়া এ চুক্তিটি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

সাদ্দাম হোসেনের জীবদ্দশায় ইরাক পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের কাজ শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরাইল ১৯৮১ সালে বোমাবর্ষণ করে ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর ২০০৭ সালে ইসরাইল আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সিরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে স্থাপনাটি ধ্বংস করে দেয়। লিবিয়ার শাসক গাদ্দাফিকে ২০১১ সালে হত্যা করার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরাইল সেখানে ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণ করে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যে যুক্তি তা হল- এসব রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিধর হলে ইসরাইলসহ পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনী কর্তৃক ইরাক ও লিবিয়ায় আগ্রাসন চালানোর আগে দাবি করা হয়েছিল, ওই দুই রাষ্ট্রের কাছে গণবিধ্বংসী রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র রয়েছে, যা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু উভয় রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানোর পর দেখা গেল রাষ্ট্র দুটির হেফাজতে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র থাকার অভিযোগ মিথ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তার ও তার মিত্রদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ইরাক ও লিবিয়ায় হামলা চালিয়ে রাষ্ট্র দুটির শাসকদ্বয়কে হত্যা করার পর সেখানে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অদ্যাবধি তার অবসান হয়নি। উভয় রাষ্ট্রে হামলাজনিত কারণে কয়েক লাখ লোক নিহত ও আহত হওয়া ছাড়াও অগণিত মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছে। এ দুটি রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেভাবে অস্থিতিশীল করেছে, অনুরূপ পন্থায় তারা সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করে অনেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরাক ইরান আক্রমণ করলে কোনো লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই সর্বাত্মক যুদ্ধ দ্বারা উভয় রাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত কিছুর পরও ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে; তবে দেশটির দাবি তা শুধু শান্তিপূর্ণ কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ইসরাইল ইরানের এ দাবি মানতে অপারগ এবং ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে দেশটি একাধিকবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইরানের ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা প্রকারান্তরে ইরানকে সব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়েছে। এটি দেখে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্ররা হয়েছে বিস্মিত। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও তার অস্ত্রভাণ্ডারে তিনশ` থেকে পনেরোশ` মাইল পাল্লার দেড় লক্ষাধিক মিসাইল রয়েছে। এগুলোর আওতা ইসরাইল অবধি বিস্তৃত এবং ইসরাইলের যে কোনো আগ্রাসন ইরান যে অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করতে সক্ষম, সে সত্যটি আজ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই অনুধাবন করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া উপদ্বীপে রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে তা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে রূপ নেয়। এ যুদ্ধ তিন বছর চলার পর উপদ্বীপটিকে দু`ভাগে ভাগ করে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুটি রাষ্ট্র তৈরি করা হলেও উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে আজও যুদ্ধাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যে দূরপাল্লার মিসাইলের কয়েকটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে এবং একটি উৎক্ষেপণ রয়েছে সম্পন্নের অপেক্ষায়। উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘ কর্তৃক আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে আজ বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়াকে হুশিয়ারি প্রদান করে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রটি পুনরায় দূরপাল্লার মিসাইলের পরীক্ষা চালালে তার ওপর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থেকে হামলা চালানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির বিপরীতে উত্তর কোরিয়া থেকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে- উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আক্রান্ত হলে তারা তাদের বিমানবাহী রণতরীসহ পার্শ্ববর্তী ঘাঁটিগুলো ও মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলা চালাতে কোনোরূপ দ্বিধা করবে না।

এটি অনস্বীকার্য যে, উত্তর কোরিয়া আজ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হুমকি ও আগ্রাসন মোকাবেলার সাহস দেখাতে সমর্থ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক উত্তর কোরিয়া আক্রান্ত হলে উভয় রাষ্ট্র পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমার অধিকারী হওয়ার কারণে সে যুদ্ধ কোনো রাষ্ট্রের জন্যই যে চূড়ান্ত বিজয় বয়ে আনতে পারবে না, তা তাদের উপলব্ধিতে থাকলেও পারস্পরিক অনাস্থার কারণে যুদ্ধাবস্থা থেকে রাষ্ট্র দুটি সরে আসার ব্যাপারে অনেকটাই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার গাদ্দাফিকে যে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে, রাষ্ট্র দুটির অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক বোমার মজুদ থাকলে তা হতো না। ইরাক ও লিবিয়ার দুর্ভাগ্য, উভয় রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে আগ্রাসন পরিচালনার সময় রাশিয়া ও চীন ছিল নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। সিরিয়ায় রাশিয়ার প্রত্যক্ষ উপস্থিতির কারণে সে দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমর্থন নিয়ে যেসব বিদ্রোহী দল যুদ্ধ করছে আজ তারা অনেকটা নিশ্চিহ্নের পথে।

বিগত শতকের শেষ দশকের সূচনালগ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় দু`যুগ ধরে য্ক্তুরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বে পরাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল। বর্তমানে রাশিয়া ও চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য স্তিমিত হওয়ার পথে। এখন উত্তর কোরিয়াকে আগের মতো চোখ রাঙিয়ে পদাবনত করার সাহস দেখাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও একাধিকবার ভাবতে হয়।

সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত মার্কিন রণতরী থেকে ক্রুজ মিসাইল হামলা পরিচালনার আগে রাষ্ট্রটির পক্ষ থেকে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এ বিষয়ে সিরিয়া ও রাশিয়ার দাবি, আসাদ সরকার কোনোরূপ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলার অজুহাত সৃষ্টির অভিপ্রায়ে আসাদ সরকার কর্তৃক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অলীক অভিযোগ এনেছে। প্রণিধানযোগ্য যে, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ক্রুজ মিসাইল হামলা পরিচালনার বিষয়ে জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছিল না।

সিরিয়ায় ক্রুজ মিসাইল হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই যুক্তরাষ্ট্র পাক-আফগান সীমান্তে আফগানিস্তানের নানগড়হার প্রদেশের অচিন জেলায় সবচেয়ে শক্তিধর অপারমাণবিক বোমা `মোয়াব` নিক্ষেপ করে তালেবানদের সুরক্ষিত সুড়ঙ্গপথ ও ভূঅভ্যন্তরস্থ কাঠামো ধ্বংসের দাবি করেছে। বিভিন্ন নিরপেক্ষ সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখন নানগড়হার প্রদেশের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ`র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ সুড়ঙ্গপথ ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যে সুড়ঙ্গপথ ও স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তা তারাই সৃষ্টি করেছিল তৎকালীন আফগান সরকার ও সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত তালেবানদের শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, আজ সেই তালেবানদের অবস্থান আফগানিস্তানের বর্তমান মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে। আর তাই নিজ সৃষ্ট সুড়ঙ্গ ও ভুগর্ভস্থ স্থাপনা তাদের নিজেদেরই ধ্বংস করতে হয়! এর চেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা আর কী হতে পারে!

উত্তর কোরিয়া ও ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা যদি যুক্তরাষ্ট্রের দাবিমতে বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়, তাহলে এ কথা বলার অবকাশ আছে কি- যুক্তরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা পরিষদের অপর চার রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে? বস্তুত পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করেই কেবল পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া ও আফগানিস্তানে যে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে, তা যে মিথ্যা অজুহাতে করা হয়েছে এটি আজ বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কাছে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী বা আগ্রাসী আখ্যা দেয়া হলে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র তা মানতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্র নিজে তার সামরিক প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখার জন্য যখন উন্নততর মিসাইল উদ্ভাবন নিয়ে ব্যস্ত এবং যখন তার অস্ত্রভাণ্ডার তার অন্যায় আচরণের বিরোধিতাকারী কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, তখন অপর কোনো রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কি দোষণীয়, নাকি তা মার্কিন আগ্রাসন ও অন্যায় আচরণ মোকাবেলায় ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক- বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

iktederahmed@yahoo.com

আমার গেলাস সদাই থাক অর্ধেক পূর্ণ
                                  

আলী যাকের :

এই পরিণত বয়সে এসে আমার এই পরম আশাবাদী মনটাকে আর বদলাতে চাই না। থাকুক না সে যেমন আছে? জীবনের সেই কোন বিহানবেলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার জীবনে রোদ, বৃষ্টি এবং দাবদাহের প্রচণ্ডতা অথবা কালো মেঘের ভয়াবহ কটাক্ষ আমাকে জীবনবিমুখ করতে পারেনি। বড় সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলাম বোধ হয়, যে কারণে আমার জীবনের কোনো সমস্যাই আমি মাটিচাপা দিয়ে রাখতে পারিনি; বরং অতি স্বচ্ছন্দে মুখোমুখি হয়েছি তার। জীবন কখনো আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। সব সমস্যার একটা না একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছি। এভাবেই জীবন কেটেছে যুগের পর যুগ। এভাবেই চালিয়ে যেতে চাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

আমাদের সমাজে সাম্প্রতিককালে চিন্তাশীল একটি জনগোষ্ঠী অনেক লেখাপড়া করে, অনেক চিন্তাভাবনা করে যেকোনো সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে। আমি এ পর্যন্ত দেখিনি যে তারা কখনো কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছে। বাল্যকালে বাবার কাছে শুনেছি যে একজন ইংরেজ সাহেবকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, `এই পরিস্থিতিতে আমি কী করব?` তার উত্তরে তিনি ভেবেচিন্তে বলবেন, `আমি যদি তুমি হতাম এবং সমস্যাটা যদি ঠিক একই রকম হতো, একচুলও এদিক-ওদিক না হয়ে, তাহলে আমি হয়তো তুমি যা ভাবার চেষ্টা করছ সেই সম্পর্কে আরো একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, ভেবেচিন্তে অতঃপর একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতাম।` এমনই জটিল ছিল তাঁদের সহজীকরণ প্রক্রিয়া। কোনো একটা জটিল বিষয় নিয়ে যদি একাধিক পণ্ডিত ব্যক্তি একসঙ্গে বসে সেই জটিলতার সমাধানে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধারণত এই রকম দাঁড়ায়, যেমন লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, `একটি সম্মেলনের সংজ্ঞা হচ্ছে কতিপয় বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং সবজান্তা মানুষের দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে তর্কবিতর্কে প্রবৃত্ত হওয়া। এর ফলে তাঁরা এককভাবে সমস্যাটির সমাধানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না বটে, তবে যৌথভাবে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে সমস্যাটির আসলেই কোনো সমাধান নেই। `

হবুচন্দ্র রাজার পায়ে ধুলা লাগে, তাই তাঁর মন্ত্রী গোবুচন্দ্রকে তিনি কড়া ধমক দিয়ে বললেন—এ সমস্যার একটি সমাধান করা দরকার। এর পরে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় আছে—শুনিয়া গোবু ভাবিয়া হল খুন/দারুণ ত্রাসে ঘর্ম বহে গাত্রে/পণ্ডিতের হইল মুখ চুন/পাত্রদের নিদ্রা নাহি রাত্রে/রান্নাঘরে নাহিকো চড়ে হাঁড়ি/কান্নাকাটি পড়িল বাড়ি-মধ্যে/অশ্রুজলে ভাসায়ে পাকা দাড়ি/কহিলা গোবু হবুর পাদপদ্মে—/‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে/পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!`

আমরা সাধারণ মানুষরা বড় বড় তত্ত্বকথা শুনে অভ্যস্ত। শুরুতে ভাবতাম যে এর মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনো উপদেশ কিংবা পরামর্শ নিশ্চয়ই আছে, যার দ্বারা সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এখন যেন মনে হয় যে যেকোনো বিষয়ে অভিমত কিংবা বচনকে যদি একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে শক্ত করা হয় অথবা যদি মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলা যেতে পারে যে এই সমস্যার সমাধান এভাবেও সম্ভব, ওভাবেও সম্ভব; কিন্তু তৃতীয় কিছু চিন্তা করতে হবে, তাহলে বোধ হয় পণ্ডিতরা পালে হাওয়া পান। সাধারণ মানুষ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাবে, `বাহ, বেশ জবরদস্ত কথা বলেছে তো!` সমস্যাটি কিন্তু যেমন গ্যাঁট হয়ে বসেছিল, তেমনি বসে থাকে। বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। কিছু সমস্যা নিজ থেকেই সমাধান হয়ে যায়, অন্যদিকে কিছু সমস্যা কিছুদিন বাদে আর সমস্যা থাকে না। বিশেষজ্ঞরা এতে বড় স্বস্তি পান। সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা ভুলে গিয়ে নিজ নিজ জীবনধারণের চিন্তায় মগ্ন হয়।

সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে যে সমস্যার আয়তন ও সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত আরো বেশি জটিল ও অবোধগম্য হওয়ায় গণমাধ্যম এ নিয়ে বেশ খেলাধুলা করে। তারা একবার এই কথা বলে, আরেকবার সেই কথা। এসব সমস্যা, যেমন সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনীতির কূটকচাল, এমনকি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক—সব বিষয়েই আজকাল গণমাধ্যম আমাদের অহরহ তাদের মন্তব্যে ভারাক্রান্ত করছে। যদি কোনো ব্যক্তি এ নিয়ে উদ্ভট একটি মন্তব্য করে, আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তাদের জবাব সাধারণত হয় `ওই যে অমুক টিভিতে দেখলাম কিংবা তমুক পত্রিকায় পড়লাম?` কেবল পড়া এবং দেখাটাই কি যথেষ্ট? এ কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, `আমরা তবে আর কী করব? আমরা হতদরিদ্র জনগণ, লোকে যা বলে তা-ই শুনি।` আজকাল তো এমন হয়েছে যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রায় সবারই একটি নিজস্ব মত আছে। অবশ্য এই মতটি কান-কথার ওপর নির্ভরশীল। কানের কথায় অতি পুরনো একটি কৌতুক মনে পড়ে গেল। এক লোককে বলা হলো, চিলে তার কান নিয়ে গেছে। সে নিজের কানে হাত দিয়ে পরীক্ষা না করেই চিলের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন দান করে ফেলল। এই যে নিজের কানটি আছে কি না তা না দেখা বা নিজের জ্ঞানের পরিমিতির মধ্যে যে বোধগম্যতা আছে, তা দিয়ে কোনো বিষয় বোঝার চেষ্টা না করে কেবল চিলের পেছনে পেছনে দৌড়ানো—এতে আমরা দিন দিন বড়ই কাহিল হয়ে পড়ছি।

একটু লক্ষ করলেই পাঠক বুঝতে পারবেন, আমাদের এই যে যেকোনো বিষয়ে ত্বরিত অভিমত সৃষ্টি করা এবং তা নিয়ে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কথাবার্তা অবলীলায় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বলে যাওয়া—এতে সমূহ বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৫ বছর হলো। আমরা সবাই বলে বেড়াই যে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে হবে। আমরা যদি এতে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করে থাকি, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটিও আমাদের জানা দরকার। জানা দরকার কী কারণে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, যুদ্ধের সময় কারা আমাদের বন্ধু ছিল, যুদ্ধের পরেই বা কারা আমাদের দিকে সব ব্যাপারে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই মৌল বিষয়গুলো যদি আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি, তাহলে একটি ইতিবাচক স্থান থেকে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় যেকোনো বিষয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। এর আগে যে তিনজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন আই কে গুজরাল। আই কে গুজরালের বাংলাদেশ সফরের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে যে ১৯৭৪-এ মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রথম একটি সত্যিকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সব সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে। আমরা যদি কেউ আশা করে থাকি যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি সফরেই অথবা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের মাধ্যমে আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারব, তাহলে সেটা নিতান্তই বালখিল্যের চিন্তা হবে। যে সমস্যাগুলো আমাদের এই দুই দেশের মধ্যে ৪২ বছর ধরে, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিরাজ করছে এবং যে সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা কোনো সরকারই করেনি, বিশেষ করে তারা, যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে যারা হাতে মারণাস্ত্র নিয়ে মার্শাল লর মাধ্যমে আমাদের দেশে ক্ষমতায় এসেছে, সেসব সমস্যার সমাধান একটি বা দুটি সফরেই হয়ে যাবে ভাবলে আমরা মূর্খের রাজ্যে বাস করছি। গত ৪২ বছরে সমস্যা লাঘবের চেষ্টা না করে সমস্যাকে আমরা আরো জটিল করে তোলার চেষ্টায় ব্যাপৃত ছিলাম। কথায় আছে—বাঘের ঘা হলে সে সেই ঘাটিকে সারতে দেয় না। চুলকে চুলকে জীবিত রাখে এবং জিবে চেটে পরম আনন্দ লাভ করে। আমাদের সরকারগুলোও এই বাঘের ঘায়ের নীতি অনুসরণ করেছিল। আমরা চেষ্টা করছি, ভারতের মধ্যে একটি কৃত্রিম শত্রু সৃষ্টি করে তার সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ করতে এবং সে সম্পর্কে অপার মিথ্যা কথা আমাদের দেশের মানুষকে বুঝিয়েছি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য। আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন লক্ষ করেছি যে পাকিস্তানি সরকার এই একই নীতি অনুসরণ করত। কেউ যদি চিৎকার করে কেঁদে উঠত এই বলে যে `আমি খেতে পাচ্ছি না, আমায় খাবার দাও`, তাহলে পাকিস্তানি সরকার বলত, `ভারতীয় আগ্রাসনের জন্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে` (!) নিজস্ব সমস্যাগুলো সমাধান করতে অক্ষম এই ক্ষমতালোভীরা সব বিষয়ে অন্যকে দোষারোপ করতে বড় সিদ্ধহস্ত হয়। আমরা লক্ষ করেছি যে ভারতের যেকোনো সরকারপ্রধান যখন এখানে আসেন তখন আমাদের মধ্যে যেসব রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দল সর্বদাই ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করে, তারাও একেবারে গদগদ হয়ে হামলে পড়ে তাঁদের সান্নিধ্য পেতে। কিন্তু সেসব সরকারপ্রধান চলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তারা আবার আড়মোড়া ভেঙে তাদের ভারতবিরোধী চরিত্রের বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের কণিকার একটি পদ্যের উল্লেখ করছি, `যথাসাধ্য-ভাল বলে, ওগো আরো-ভাল/কোন্্ স্বর্গপুরী তুমি করে থাকো আলো?/আরো-ভাল কেঁদে কহে, আমি থাকি হায়/অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়।` এবারের ভারত-বাংলাদেশ সংলাপে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার কথা ছিল। সব কটিতে হয়নি। এবং এই না হওয়ার পেছনে ভারতের অপারগতাই ছিল প্রধান কারণ। যত দূর জানি, অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অন্যগুলো অচিরেই হবে বলে আশা করা যায়। কেননা এগুলো সম্পর্কে দ্বিপক্ষীয় একটি বোঝাপড়া আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের আগেই হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের জাঁতাকলে থেকে আমাদের মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে আমরা ধরেই নিই, যেকোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দেশের নির্বাহী প্রধানের সম্মতিই যথেষ্ট। এর কারণ এই যে এখনো আমরা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হইনি। ভারত একটি বিশাল দেশ এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর যথেষ্ট ক্ষমতা। কিন্তু যেকোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো মুখ্যমন্ত্রী যদি গররাজি থাকেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রীরও কোনো বিষয়ে সম্মত হওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। কিন্তু অচিরেই সব সমস্যার সমাধান হবে যদি দুই দেশের মধ্যে হৃদ্যতা থাকে, থাকে উষ্ণতা এবং সহমর্মিতা।

সব শেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই, `তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়/তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়/অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে/প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।`

অতএব, আমি অর্ধপ্রাপ্তিকে পূর্ণপ্রাপ্তি বলেই ধরে নিতে চাই। আশা করি, আশাহত হব না।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

লাখো কন্ঠে বিদ্রোহী কবিতা
                                  

একটা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ পেয়েছে, এবার লাখো কন্ঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের `বিদ্রোহী` কবিতাটি আবৃত্তির আয়োজন করতে যাচ্ছে নজরুল চর্চা কেন্দ্র `বাঁশরী`। বিদ্রোহী কবির মানবতাবোধ, বিভেদহীন সমাজ গঠনের চেতনাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এই আয়োজনটি করা হচ্ছে বলে জানান বাঁশরীর সভাপতি মোঃ খালেকুজ্জামান। তিনি জানান, ১ মে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকেল ৪টায় লাখো কন্ঠে `বিদ্রোহী` কবিতা পাঠের আয়োজন হবে।

এই আয়োজনকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাবো। `বিদ্রোহী` কবিতাটি নজরুল রচনা করেছিলেন ১৯২২ সালে। `বিদ্রোহী` কবিতা প্রথম ছাপা হয় বিপ্লবী বারীন ঘোষের সহবন্দী শ্রী অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারী তারিখে, শুক্রবার। মুজফ্ফর আহমদ জানিয়েছেন, `আসলে `বিদ্রোহী` কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে।` (নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, মুক্তধারা ১৯৯৯, পৃ: ১৬৭)। তখনো পর্যন্ত নজরুলের কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। এই একটি কবিতা তাঁকে এতটা খ্যাতি এনে দিয়েছিলো যে, তিনি বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পাশে দাঁড়াবার যোগ্যতা অর্জন করেন। নজরুল বিদ্রোহী অভিধা পেয়ে যান এই কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই। নজরুলের অন্য কোনো কবিতা, কোনে গল্প, প্রবন্ধ কিংবা উপন্যাস তাঁকে এত খ্যাতি এনে দিতে পারেনি। হ্যাঁ, তবে এরপর `কারার ঐ লৌহ কপাট` গানটি প্রায় বিদ্রোহীর সমতুল খ্যাতি এনে দিয়েছে।

নজরুলের বহুমুখী প্রতিভা এবং তাঁর দ্রোহী সত্তার সর্বোচ্চ বাঙময় প্রকাশ ঘটেছে এই কবিতায়। এই কবিতার অগ্নিকুন্ডু ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছিলো। নজরুলের সাহিত্যিক-সাহসের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিলো `বিদ্রোহী` কবিতার ভেতরে। তিনি যখন বলেন, `আমি মানি নাকো কোনো আইন,` তখন স্বভাবতই এই ঘোষণা ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। ইংরেজের টনক নড়ে যায়। ইংরেজ দুই বাঙালিকে নিয়ে বিচলিত থাকতো, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোস এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাই দেখা যায় প্রেমের কাব্যগুলো বাদ দিয়ে নজরুলের প্রায় সব কাব্য ও প্রবন্ধ গ্রন্থ ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিলো। তিনি জেল খেটেছিলেন `আনন্দময়ীর আগমনে` কবিতা লেখার অপরাধে, `ধূমকেতু` পত্রিকাও ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিলো। কারণ ওই কবিতায়ও যে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটেছিলো, তাও ইংরেজ সরকার মেনে নিতে পারেনি।

কিন্তু `বিদ্রোহী` কবিতার ধরণ আলাদা, তার পৌরুষত্ব আলাদা, তার আত্মপ্রত্যয়ের সংহত প্রকাশ আলাদা, তার বলিষ্ঠতা আলাদা, তার দ্রোহ আলাদা। শুধু ইংরেজ নয় তিনি স্বসম্প্রদায়েরও শত্রু হয়েছিলেন। তিনি যখন বলেন, `খোদায় আসন আরশ ছেদিয়া উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর,` তখন তিনি ইংরেজ সরকারের চেয়েও ক্রুর তাঁর সম্প্রদায়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। `বিদ্রোহী` কবিতা লেখার পর থেকেই তিনি `কাফের` উপাধী পেতে থাকেন।

`বিদ্রোহী` কবিতার প্রচন্ডতা দিয়ে বাংলা কবিতার এমন কি বাংলা সাহিত্যের যাত্রাপথ পাল্টে দিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য যে, ১৯৭১ সালে যখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলে তখন কবির জ্যেষ্ঠপুত্র সব্যসাচী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে `বিদ্রোহী` কবিতাটি আবৃত্তি করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নজরুল প্রতিভার মূল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছিলো এ কবিতায়। বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন এই একটি কবিতা দিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিপদের ঝুঁকি নিয়েছিলেন `বিদ্রোহী` লিখে। `আমপারা পড়া` হামবড়া মোল্লাদের প্রচলিত ধ্যান ধারনাকে তিনি এ কবিতায় তছনছ করে দিয়েছেন।
তিনি যখন বলেন, `আমি স্রষ্টা সূদন, শোক-তাপ-হারা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।`

তখন তিনি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক সাহসের পরিচয় দেন। স্বসম্প্রদায়ের প্রচলিত ধর্মানুভূতিকে উত্তীর্ণ হওয়া সর্বাধিক বিপজ্জনক। এ কাজটি তিনি করেছিলেন- সাহসের দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। অসামান্য সাফল্যের সঙ্গে নজরুল এই কবিতায় হিন্দু মুসলমানের পৌরাণিক ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ষোলো আনা মুনশিয়ানার প্রকাশ ঘটেছে। হিন্দু মুসলমানের মিলনের কবি তিনি। যথার্থ বাঙালি তিনি। `বিদ্রোহী` কবিতায়ও হিন্দু-মসুলমানের মিলিত ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়েছেন ৭ মার্চের অগ্নিগর্ভ ভাষণের গুনে, নজরুলও শতাব্দীর অন্যতম শেষ্ঠ বাঙালি হয়েছেন `বিদ্রোহী` কবিতার গুনে। আর মাত্র দু`বছর পরে `বিদ্রোহী` কবিতার ১০০ বছর পূর্তি হবে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিও অর্ধশতাব্দীতে পা দিতে চলেছে। এই কবিতাটি লিখে নজরুল বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন, বাঙালিকে অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষতা দান করেছিলেন এই কবিতায় যৌথ ঐতিহ্যচেতনা ব্যবহার করে; আর সেই জাতিকে বঙ্গবন্ধু একটি সেক্যুলার স্টেট এনে দিয়েছিলেন একটি ভাষণ দিয়ে। বঙ্গবন্ধুও উপাধী পেয়েছিলেন `রাজনীতির কবি`। আর নজরুল তাঁর `বিদ্রোহী` কবিতায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন যতদিন পর্যন্ত উৎপাড়িতের ক্রন্দন বন্ধ না হবে, ততদিন তিনি অশান্ত থাকবেন।

আজ ১০০ বছর হতে চলেছে নজরুল `বিদ্রোহী` কবিতা লিখেছেন কিন্তু এর আবেদন এক বিন্দুও কমেনি। আরো ১০০ বছরেও এই কবিতার আবেদন কমবে বলে মনে হয় না। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করছি, `লাখো কন্ঠে বিদ্রোহী কবিতা` আবৃত্তির অনুষ্ঠানটি সার্বিক ভাবে সফল হবে।

মাহমুদুল বাসার
কলাম লেখক, গবেষক।

বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব
                                  

॥ লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল ॥
পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু। এই শেষ চৈত্র আর পহেলা বৈশাখ নিয়ে যে উৎসব আয়োজন, তা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালির নতুন বছরের প্রথম দিন। মোঘল সম্রাট আকবর তার শাসনামলে ফসলের খাজনা তোলার সুবিধার্থে বাংলা বছরের হিসাব শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা নববর্ষ বরণ শুরু হয়। পহেলা বৈশাখ ধর্ম বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সকল সম্প্রদায়ের এক মিলনের স্মারক। সময় পরিক্রমায় নববর্ষ আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির জীবনের সার্বজনীন সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। বাঙালি জাতি সারাটা বছর অধীর আগ্রহে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। পহেলা বৈশাখ প্রকৃতির নিয়মে ঘুরে আসে। দেশজ সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানস গঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোন জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়। বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। মূলত বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সচেতন জাতির পরিচয় প্রকাশিত হয়, বিচিত্র সাংস্কৃতির রূপের মধ্য দিয়ে। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সেই পরিচয়বাহী। নববর্ষ মানুষকে সচেতন করে তার সাংস্কৃতিক চেতনার স্বপন্দনে। জাতীয় জীবনে বর্ষ বরণের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অর্থ নতুনকে বরণের সাগ্রহ মনোভাব। বাঙালি একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। যাদের জন্ম বঙ্গে, মাতৃভাষা বাংলা, মূলত তারাই বাঙালি। এই বাঙালির বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। বিগত বছরের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, উৎসবের স্মৃতিচারণ পরিহার করে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। বৈশাখে উৎসবের ঢল নামে। মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। নানা ধরনের হাতের তৈরী দ্রব্য ও খাবারের মেলা যেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খন্ড খন্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারু কাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিখা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিমালা, কত না অদ্ভুত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। চোখে না দেখলে যেন বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন এত সমৃদ্ধশালী। বাংলার মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিস্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। নববর্ষ বছরটির জন্যে আশার বাণী বহন করে নিয়ে আসে। তাই নববর্ষ আমাদের প্রাণে জাগায় আশার আলো ও উদ্দীপনা। এ জন্য আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ, পারসিকদের কাছে নওরোজ এবং ইংরেজদের কাছে Happy New Year বিশেষ আনন্দময় দিবস।

 


বাঙালি জীবনে যেমন ছিল পূণ্যাহ অনুষ্ঠান তেমনি হালখাতা অনুষ্ঠান। জমিদারি প্রথা বাতিলের সাথে পূণ্যাহ অনুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু হালখাতা অনুষ্ঠান সগৌরবে বিরাজমান। নানা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উদযাপিত হয় হালখাতা উৎসব। বিগত বছরের ধার-দেনা শোধের পর্ব শুরু হয় এই দিনে। এর মধ্যে শুধু ব্যবসায়িক লেনদেন নয় হৃদয়ের বিনিময়ও ঘটে। ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখে মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যতা বাড়ে। আজকাল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। শহরে শহরে মুক্তাঙ্গণে কবিতা পাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মসূচী পালিত হয়। ঢাকায় রমনার বটমূলে এই অনুষ্ঠান বিশেষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু নাচ-গানই নয়, বাঙালির বহুকালের অভ্যাস, পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজি খাওয়া ওখানে চালু আছে বহু বছর থেকে। বৈশাখের তথা বাংলা নববর্ষের চেতনা বাঙালির হৃদয়ে অন্তরে মিশে আছে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলা নববর্ষের ব্যবহারিক প্রয়োগ আমাদের জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা সন কিংবা বাংলা তারিখের ব্যবহার নেই বললেই চলে। স্কুল, অফিস, আদালত, ব্যাংক-বীমা, বিদেশ ভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কোন পর্যায়েই বাংলা তারিখ ব্যবহৃত হয় না। পৃথিবীর বুকে একমাত্র যে দেশের মানুষ তাদের ভাষা রক্ষার জন্যে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, যে দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালিত হয় জমজমাট পরিবেশে, আনন্দঘন উৎসবে। সে দেশেই বাংলা সন ও বাংলা তারিখ উপেক্ষিত! এই অবস্থায় পহেলা বৈশাখের চেতনা তথা বাঙালির সংস্কৃতি আমাদের আদালতসহ দেশের সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও বাংলা তারিখ ব্যবহার করা অপরিহার্য।

সিরিয়া হামলায় মধ্যপ্রাচ্য বনাম রুশ হিসাব
                                  

রবার্ট ফিস্ক: সিরিয়ার খান শেইখুন শহর থেকে পাওয়া ছবিগুলো ভয়ংকর; কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে এ মুহূর্তের বড় প্রশ্নটি হচ্ছে রাশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে!

সিরিয়ার শহরটিতে রাসায়নিক গ্যাস কি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ব্যবহার করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তর তো রাশিয়ার জানা থাকা উচিত। রুশরা সিরিয়ার কোথায় নেই! তারা আছে সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে; আছে মন্ত্রণালয় ও সেনা সদর দপ্তরেও। রাশিয়া যদি এখন বলে ব্যাপক প্রাণঘাতী সেই গ্যাস সিরীয়রা ব্যবহার করেনি—এ দাবির ব্যাপারে তাদের নিজেদের আগে সুনিশ্চিত হতে হবে।

গ্যাস হামলায় ক্রুদ্ধ হওয়ার কথা বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন। এ হামলা চালানোর কথা রাশিয়াকে কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছিল। এখন ওয়াশিংটন দাবি করছে, তারা রাশিয়াকে মাত্র এক ঘণ্টা আগে সতর্ক করেছিল। সত্যটি হচ্ছে এক ঘণ্টা নয়, বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে হামলার সিদ্ধান্তের কথা রাশিয়ার কানে দেওয়া হয়। এরপর রাশিয়াও সিরিয়াকে সম্ভবত সতর্ক করে দিয়ে বলে, যত দ্রুত পারো ঘাঁটি থেকে সব যুদ্ধবিমান সরাও। সিরিয়ার এ যুদ্ধে রুশদের হত্যা করা যাবে না, ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু করা মানেই হতাহত হওয়া। অতএব, পাঠাও আগাম বার্তা।

সিরীয় সেনাবাহিনী সম্ভবত খানিকটা রূঢ় স্বভাবের! পূর্বাঞ্চলীয় শহর আলেপ্পো পুনর্দখল করার পর তারা কি ভেবেছিল যে এমন কিছু করতে হবে, যাতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়? এ প্রশ্ন এখন তুলতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, সেনা কর্মকর্তারা যেসব এলাকায় বাস করেন, এমনকি যেসব গ্রামে তাঁদের পরিবারের বাস, সেসব এলাকায় গ্যাস হামলা চালানো হয়েছে। সিরীয়দের অভিযোগ, তুরস্ক এই গ্যাস দুই জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা সমর্থক জাবাত আল নুসরা ও ইসলামিক স্টেটকে দিয়েছে। রুশদের দাবি হচ্ছে, সিরিয়ার রাজধানী দামাসকাসে যেসব গ্যাস হামলা হয়েছে সেগুলোর রাসায়নিক উপাদান এসেছিল লিবিয়া থেকে, যা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় ঢোকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইপরেস ও গাজায় অস্ত্র হিসেবে গ্যাসের আবির্ভাব এবং অটোমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে জেনারেল আলেনবির এ গ্যাস ব্যবহার এমন ভয়ংকর দৃশ্য তৈরি করে, যা এমনকি হিটলারও মিত্রবাহিনীর ওপর ব্যবহারের সাহস পাননি। কিন্তু সাদ্দাম কী করলেন? তিনি হালাবজার কুর্দদের ওপর রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহার করলেন। সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পরও বাগদাদের আদালতে শোনা গিয়েছিল কিভাবে ওই হামলার আদেশ দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সিরিয়ার সেনারা কি নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবে?

সেদিনের হামলার শিকার শহরের ছবিগুলো আমাদের একটা নিশ্চিত বার্তা দেয়। এ দৃশ্য ভয়ংকর। অসহ্য। আবার আমাদের আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলের আড়াই লাখ বেসামরিক মানুষের কথাও ভুলে গেলে চলবে না; পরে যারা কমে দেড় লাখ হলো, তারপর হলো ৯০ হাজার। বিশ্বের যেসব সংঘাতের খবর গণমাধ্যমে অনেক দুর্বলভাবে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম সিরিয়ার সংঘাত। এ পর্যন্ত কতজন মারা পড়ল যেন? চার লাখ? সাড়ে চার লাখ, নাকি পাঁচ লাখ? শেষেরটি সর্বশেষ প্রাপ্ত উপাত্ত। গ্যাসে মোট কতজনের প্রাণহানি হলো হিসাবটা আমরা কোথায় শেষ করব? সিরিয়ার সরকারকে বিশ্বাস করার জন্যই কি এ হিসাব করব? যখন আগের শেষ গ্যাস হামলাটি হলো দামাসকাসে, জাতিসংঘ তাদের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনের মাঝখানে শুধু এটুকু বলল, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাপারে ‘কমপ্রোমাইজ’ করা হয়েছে।

কিন্তু তারপর আমরা রুশদের কাছে গেলাম। তারা সব গ্যাস অস্ত্র প্রত্যাহারে সিরিয়াকে সাহায্য করার কথা বলল। ওবামা যখন সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রের ওপর বিমান হামলার হুমকি দিলেন, রাশিয়া সমর্থন দিল; হুমকিটি যখন পরে প্রত্যাহার করা হয় সমর্থন তখনো দেওয়া হলো।

সে যা-ই হোক, এবার রুশরা দেখল ট্রাম্প কী করতে পারেন যদি তিনি বিশ্বাস করেন (সত্যি যদি বিশ্বাস করেন) যে রাসায়নিক অস্ত্র সত্যি ব্যবহার করা হয়েছে। আর আমি জানতে পেরেছি যে রুশরা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা আগেই জেনে গিয়েছিল এবং জেনেছিল অনেক আগেই। এরপর সরে আসার আগে তারা কি সত্যি কোনো সিরীয় বিমানঘাঁটিতে কোনো সিরীয় বিমান রেখে এসেছিল? এ ধরনের কোনো অস্ত্র কি তারা বিমানঘাঁটির রানওয়েতে ফেলে আসতে পারে? কিংবা কোনো সুরক্ষিত বাংকারে?

বাস্তবে সিরিয়ায় এ মার্কিন হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কের যতটা যোগসূত্র আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্কের। এটি এমন এক সমস্যা, যা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে কাজ করতে হবে। অবশ্যই করতে হবে বাশার আল আসাদকেও। আরো একটি বিষয়ে পাঠক আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আর তা হচ্ছে দামাসকাস ও মস্কোর মধ্যে রাতে যদি কোনো ফোনালাপ হয়, তা হবে দীর্ঘ।

 

লেখক : খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি ইনডিপেনডেন্ট থেকে ভাষান্তর


   Page 1 of 1
     উপ-সম্পাদকীয়
প্রসঙ্গ ভ্রাম্যমাণ ফায়ার সার্ভিস ও Fire hydrant
.............................................................................................
পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী আচরণ
.............................................................................................
আমার গেলাস সদাই থাক অর্ধেক পূর্ণ
.............................................................................................
লাখো কন্ঠে বিদ্রোহী কবিতা
.............................................................................................
বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব
.............................................................................................
সিরিয়া হামলায় মধ্যপ্রাচ্য বনাম রুশ হিসাব
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত । ফোন: ০২-৭১৯৩৮৭৮ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪
Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com
   All Right Reserved By www.dailyasiabani.com Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]