ফিরোজ মাহবুব কামাল
উৎসব পৌত্তলিকদের বিজয় নিয়ে!
যে ভূমিতে মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা থাকে, সে ভূমিতে শয়তানের খলিফাও থাকে। ফলে উভয়ের মাঝে সংঘাতও থাকে। পাকিস্তানে সে রকম একটি রক্তাক্ত সংঘাত দেখা দেয় ১৯৭১’য়ে। যে পক্ষে পৌত্তলিক কাফির শক্তির বিশাল সেনাবাহিনী, অর্থ, অস্ত্র ও যুদ্ধ থাকে বুঝতে হবে সেটিই হলো বিশুদ্ধ শয়তানী পক্ষ। একাত্তরে শয়তানের বাঙালি খলিফা ও হিন্দুস্থানী খলিফাদের সাথে সেদিন যোগ দিয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্ট খলিফাগণও। ১৯৭১’য়ে বিজয়টি ছিল শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের; সে বিজয়ে খণ্ডিত হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। পাকিস্তানের শক্তিহানীর অর্থ মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী। সমগ্র ইতিহাসে আর কোন মুসলিম দেশের নাগরিক শয়তান ও তার পৌত্তলিক খলিফাদের ঘরে এতো বড় বিজয় তুলে দেয়নি -যা তুলে দিয়েছিল মুজিব ও তার অনুসারী পূর্ব পাকিস্তানীরা। পৌত্তলিকদের সমগ্র ইতিহাসে সেটি ছিল বিশাল বিজয়। এ কারণেই প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতীয় পৌত্তলিকগণ সে বিজয় নিয়ে অতি ধুম ধামে উৎসব করে। ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে মুজিব ও তার অনুসারীরা এজন্যই এতো আপন। ২০২৪’য়ের ৫ আগস্ট পলায়নের পর হাসিনা তাই অন্য দেশে আশ্রয় না পেলেও নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে ভারতে। বাংলাদেশের আদালতে হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যা ও নিপীড়নের মামলা চলছে। কিন্তু সে বিচারের মুখোমুখী হতে ভারত তাকে বাংলাদেশের কাছে ফিরত দিচ্ছে না।
ইতিহাসের অতি বুনিয়াদি বিষয় হলো, পৌত্তলিক শক্তির বিজয় এবং মুসলিমদের বিজয় কখনোই একত্রে ঘটে না। পৌত্তলিক শক্তির বিজয়ের অর্থই হলো মুসলিমদের পরাজয়। অথচ অতি বিস্ময়ের বিষয় হলো, শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের একাত্তরের বিজয় নিয়ে বাঙালি ফ্যাসিস্ট, বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ও বামপন্থীদের সাথে অনেক বাঙালী ইসলামপন্থী দল ও ছাত্র সংগঠন ১৬ ডিসেম্বর এলে উৎসব করে। রাজপথে বিশাল বিশাল মিছিল বের করে। গর্ব বোধ করে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের সৃষ্টিতে। প্রশ্ন হলো, মুসলিমদের যে বিভক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালা হারাম করলেন, এবং পাকিস্তানের যে বিভক্তিকে হারাম বলে ফতোয়া দিলেন একাত্তরের আলেমগণ -সেটি আজ উৎসব রূপে গণ্য হয় কি করে? এ উৎসব তো শয়তান ও তার পৌত্তলিক ও সেক্যুলারিস্ট খলিফাদের খুশি করার পথ।
অতএব পচন শুধু বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, বাঙালি ফ্যাসিস্ট ও বাঙালি বামধারার লোকদের একার নয়, সে পচন থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশের তথাকথিত বহু ইসলামপন্থী দলের নেতা-কর্মী ও আলেমগণ। কোনটি শয়তানের বিজয় আর কোনটি ইসলামের বিজয় -সে সহজ বিষয়টি বুঝতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বাঙালি মুসলিমের বিপদ যে কত গভীর তা বুঝতে কি এরপরও কিছু বাকি থাকে?
শেখ মুজিবের ন্যায় শয়তানের খলিফাকে যারা পিতা, নেতা ও বন্ধু রূপে গ্রহণ করে, তাদের বিপদটি তো ভয়ানক। এমন বিভ্রান্ত মানুষদের দেশে পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশ ভাঙার ন্যায় হারাম কাজটিও যে প্রশংসনীয় ও উৎসবযোগ্য গণ্য হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। এরাই ১৬ ডিসেম্বর এলে বিজয় উৎসব করে। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে এরা স্বাধীনতা বলে। এর অর্থ, অখণ্ড পাকিস্তানে তারা পরাধীন ছিল। প্রশ্ন হলো, যে পাকিস্তানের ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, দুই জন রাষ্ট্রপ্রধান, ৩ জন স্পীকার এবং বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন বাঙালি, সে পাকিস্তানে বাঙালি পরাধীন হয় কি করে? বাঙালি সেক্যুলারিস্ট মুসলিমদের চেতনা বিভ্রাট যে কতটা প্রকট -এ হলো তার দলিল। প্রশ্ন হলো, এরূপ মিথ্যার জোয়ারে ভেসে কি সভ্য মানব ও সভ্য রাষ্ট্রের নির্মাণ করা যায়? যে কোন সভ্য কাজের জন্য তো সর্বপ্রথম এরূপ মিথ্যা থেকে মুক্তি পেতে হয়। অথচ সে কাজটিই বাংলাদেশে হচ্ছে না। বরং মিথ্যার জোয়ারে ভাসাটাই এদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এখানেই বাঙালি মুসলিমের মূল বিপদ।
অবাধ্যতা ও বিদ্রোহই যখন সংস্কৃতি
মুসলিমের ঈমানদারীর মূল কথা হলো, সে মেনে চলবে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি হুকুম। মহান রব’য়ের এজেন্ডাই হবে তার এজেন্ডা। সেটি শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে নয় বরং পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব থাকবে রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনের ন্যায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার যে কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই যথেষ্ট। ইবলিস অভিশপ্ত শয়তান হয়েছে শুধু একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে। সে হুকুমটি ছিল আদমকে সিজদার। এবং হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়াকে জান্নাত ছাড়তে হয়েছে শুধু একটি মাত্র হুকুম অমান্য করার অপরাধে। কিন্তু মুসলিমগণ আজ বাঁচছে মহান রব’য়ের বহু হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে। হুকুম মানার বেলায় তারা বড্ড সিলেকটিভ। পবিত্র কুর’আনে রোজার হুকুম এসেছে মাত্র একবার, কিন্তু সে হুকুম অধিকাংশ মুসলিম মেনে চলে। কিন্তু জিহাদের হুকুম বহুবার এসছে; কিন্তু সে হুকুম তারা মানে না। তারা বেছে নিয়েছে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের নীতি। আব্দুল্লাহ বিন উবাই নবীজী (সা:)’র পিছনে নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে, অর্থদান করেছে কিন্তু জিহাদে যোগ দেয়নি।
যুগে যুগে মুসলিমদের বিপর্যয়ের মুল কারণ এই জিহাদ শূণ্যতা। মুসলিম শাসনামলে বাঙলার কৃষিজমির শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বরাদ্দ ছিল মসজিদ -মাদ্রাসার জন্য। সেসব মসজিদ-মাদ্রাসায় বহু হাজার ইমাম, শিক্ষক ও ছাত্র ছিল। কিন্তু ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ৪ হাজার সৈন্যের হাতে নবাব সিরাজুদ্দৌলার বাহিনী পরাজয় ঘটলো তখন সে চরম বিপর্যয়ের দিনে সেসব মাদ্রাসার আলেম ও ছাত্ররা এবং মসজিদের ইমামগণ দেশের স্বাধীনতা বাঁচাতে ইংরেজ কাফির শক্তির বিরুদ্ধে কোন জিহাদ সংগঠিত করেনি। বরং নিষ্ক্রিয় থেকেছে। তারা তখনও নিষ্ক্রিয় থেকেছে যখন দেশ ১৯৭১’য়ে পৌত্তলিক কাফির বাহিনী দ্বারা সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান আক্রান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে আজ মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া বেঁচে নাই, শাসন চলছে ইসলামের শত্রু সেক্যুলারিস্টদের। দেশে বহু লক্ষ মসিজদ এবং বহু হাজার মাদ্রাসা রয়েছে; সেগুলির সাথে জড়িত রয়েছে বহু লক্ষ আলেম। কিন্তু তারা দ্বীনের পরাজয়কে নীরবে মেনে নিয়েছে। জিহাদের হুকুম তারা মানে না, বেছে নিয়েছে বিদ্রোহের পথ। অথচ এত্বেয়াত তথা আনুগত্যের পথ হলো রহমত ও ইজ্জত লাভের পথ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালার বয়ান হলো:
وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّـۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّـٰلِحِينَ ۚ وَحَسُنَ أُو۟لَـٰٓئِكَ رَفِيقًۭا
অর্থ: “এবং যারা আনুগত্য করলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের, এরাই হলো তারা যারা থাকবে তাদের সাথে যাদের উপর আল্লাহ নাযিল করেছেন নিয়ামত -যারা হলো নবী, সিদ্দিকীন, শহীদ এবং সৎকর্মশীল বান্দাহগণ। সঙ্গী হিসাবে তারাই উত্তম।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৬৯)।
প্রশ্ন হলো, পবিত্র কুর’আনে বার বার ধ্বনিত হলো যে জিহাদের হুকুম, সে হুকুমের আনুগত্যের বদলে মুসলিমদের মাঝে যে বিদ্রোহ -তা কি বিজয় ও রহমত বয়ে আনবে? রহমত যে বয়ে আনছে -তা তো দেশে দেশে শত্রু শক্তির অধিকৃতি, গণহত্যা, ধ্বংস প্রক্রিয়া দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
নিজ গৃহের শত্রু
মানব জাতির বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টদের নাশকতাটি বিশাল ও ভয়ানক। এ ফ্যাসিস্টগণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা জুড়ে বার বার গণহত্যা, বর্ণবাদী নির্মূল, অসংখ্য যুদ্ধ এবং দুইটি বিশ্বযুদ্ধ উপহার দিয়েছে। একমাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে তারা সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণনাশ ঘটিয়েছে। গণহত্যার পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ ঘর-বাড়ি, দোকানপাট এবং বহু নগর-বন্দরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। মানবতার এ শত্রুদের ভয়াবহ নাশকতা মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধেও। ফ্রান্স ১৫ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে একমাত্র আলজিরিয়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায়। ফ্যাসিস্ট তো তারাই যারা উগ্র জাতীয়তবাদী, বর্ণবাদী, গোত্রবাদী এবং সে সাথে উগ্র স্বৈরাচারীও। সে সাথে তাদের থাকে উগ্র জাতিবিদ্ধেষ, বর্ণবিদ্বেষ ও ধর্মবিদ্বেষ।
ফ্যাসিস্টগণ সর্বদাই যুদ্ধাংদেহী; ভিন্ন জাতি, ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানে তারা রাজী নয়। তারা তাদের নির্মূল চায়। পাশ্চাত্য বিশ্বের ফ্যাসিস্টগণ তাই দুটি বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করেছিল। একাত্তরে তেমনি যুদ্ধ ডেকে এনেছিল বাঙালি ফ্যাসিস্টগণ। তারা ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল একাত্তরের যুদ্ধ শুরুর আগেই। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের পক্ষ থেকে তেমন একটি লাগাতর যুদ্ধ চলছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে, ধ্বংস করা হচ্ছে তাদের গৃহ, দোকানপাট ও মসজিদ। ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিব ২৫ শে আগস্ট পাক সেনাবাহিনীর ময়দানের নামার ১৮ দিন আগে ৭ মার্চ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, হাতের কাছে যা জুটে তা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর। অবাঙালি হত্যা, তাদের দোকান-পাট লুট শুরু হয় মার্চের ৩ তারিখ থেকে। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এমন কি ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের ক্যাডারদের হাতে কিছু বিচ্ছিন্ন পাক সেনাও নিহত হয়েছিল।
ফ্যাসিস্টরা দখলদারী চায় শুধু দেশের ভৌগলিক মানচিত্রের উপর নয়, চেতনার মানচিত্রের উপরও। সে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যারাই খাড়া হয়, এরা তাদের নির্মূল চায়। এরাই বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পরই বিরোধীদের নির্মূলে “ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি” গড়েছিল। এরা ছিল ভারত প্রতিপালিত বাঙালি ফ্যাসিস্ট। বিশ্বের সকল বর্ণবাদী ও জাতীয়তাবাদী নির্মূলের কান্ডগুলি ঘটেছে এ জাতীয় ফ্যাসিস্টদের হাতে। ক্ষুদ্র মনের এসব ছোট লোকেরা কখনোই বড় কিছু নিয়ে ভাবতে পারে না। তাদের ভাবনাগুলো সীমিত থাকে ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, গোত্রীয় স্বার্থ এবং ভাষা ও বর্ণভিত্তিক স্বার্থ নিয়ে। তাদের পক্ষে নানা ভাষা ও নানা ভৌগলিক পরিচয়ের মানুষদের নিয়ে বিশ্বময় মুসলিম উম্মার কথা চিন্তা করা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কিছু করা। বরং ক্ষুদ্র চিন্তার এই ক্ষুদ্র কীটগুলির সামর্থ্য থাকে না নিজ শক্তিতে কিছু করার; বাঙালি ফাসিস্ট এবং বাম সেক্যুলারিস্টদের তাই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের কোলে গিয়ে উঠতে হয়েছে এবং তাদের অর্থে প্রতিপালন নিতে হয়েছে। তারা চুক্তিবদ্ধ হয়েছে পৌত্তলিক কাফির শক্তির সেবাদাস রূপে। ভারতের সাথে তাজুদ্দীন তাই ৭ দফা এবং মুজিব ২৫ সালা দাসচুক্তি সাক্ষর করেছিল। প্রতি যুগে শত্রু শক্তি এভাবেই ইসলামী চেতনা বিবর্জিত সেক্যুলারিস্টদের মধ্য থেকেই বিপুল হারে দাস সৈনিক পেয়েছে। ১৯১৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে এ সেক্যুলারিস্টদের সৈনিক রূপে কাজে লাগিয়েছে উসমানিয়া খেলাফত ভাঙার কাজে এবং ১৯৭১’য়ে কাজে লাগিয়েছে পাকিস্তান ভাঙার কাজে। এসব সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টরাই হলো মুসলিম উম্মাহর ঘরের শত্রু। এরা যেমন গণতন্ত্রের শত্রু, তেমনি শত্রু ইসলামের। তাদের রাজনীতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের মূল লক্ষ্য হলো শয়তানের এজেন্ডা পূরণ। মুসলিম উম্মাহর মাঝে এরূপ শত্রুর উৎপাদন বন্ধ করতেই ইসলাম বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ ও সেক্যুলারিজমকে হারাম করেছে। এবং হারাম করেছে ফ্যাসিবাদকে।
অথচ যারা ঈমানদার, তাদের ভাবনাটাই বিশ্বময়। তারা ভাবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এবং সে সাথে বিশ্ববাসীর কল্যাণ নিয়ে। ঈমানদারকে তাঁর প্রতিটি কর্মে, ভাবনায় ও ইবাদতে মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের সুন্নতের অনুসারী হতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা সমগ্র বিশ্বজগত ব্যাপী। তিনি চান সকল মানবের কল্যাণ; নবীজী (সা:) প্রেরিত হয়েছেন সমগ্র মানব জাতির প্রতি রহমত রূপে। তাই সমগ্র বিশ্ববাসীর কল্যাণ নিয়ে ভাবাটি মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত। সে সূন্নতের অনুসারী হতে হয় প্রতিটি ঈমানদারকেও। তাই ঈমানদার কখনোই গোত্রবাদী, বর্ণবাদী, আঞ্চলিকতাবাদী বা জাতীয়তাবাদী হয়না। ইসলামে এটি হারাম।
নবীজী (সা:)’র জন্ম আরবের মক্কা নগরীতে। তাঁরও বর্ণ, পরিবার ও গোত্র ভিত্তিক পরিচয় ছিল। নিজস্ব জন্মভূমিও ছিল। কিন্তু সে জন্য তিনি বর্ণবাদী ও গোত্রবাদী ছিলেন না; আরব জাতীয়তাবাদীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্যান-ইসলামী। নবীজী (সা:) নিজে প্রেরীত হয়েছিলেন সমগ্র মানব জাতির জন্য। ফলে তাঁর ভাবনার জগতে স্থান পেয়েছিল সমগ্র মানব জাতির কল্যাণের ভাবনা। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ বিলাল, ইরানের সালমান ফার্সি ও রোমের সোহায়েল তাঁর অতি আপনজন ছিলেন। এটিই হলো ইসলামের প্যান-ইসলামীজম। উপমহাদেশের মুসলিমগণ অনুপ্রাণীত হয়েছিল সে প্যান-ইসলামী চেতনায়, ফলে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা এলাকার মুসলিমগণ তখন কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সে নৈতিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য প্যান-ইসলামী চেতনা বিবর্জিত জাতীয়তাবাদী, আঞ্চলিকতাবাদী ও বর্ণবাদী সেক্যুলারিস্টদের ছিল না। ফলে তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের মুসলিমদের নিয়ে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের রক্ষক হওয়া। তারা বরং একাত্তরে পাকিস্তানের ধ্বংসে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে। কারণ সে কাজে তাদের ছিল ভারতীয়দের সাথে কাঙ্খিত আদর্শিক ম্যাচিং। সে আদর্শিক ম্যাচিং’য়ের কারণে হিন্দুত্ববাদীদের ন্যায় তাদের পক্ষেও সহজ হয় ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানী মুসলিমদের হত্যায় যুদ্ধ নামা।
ঈমানদারদের জন্য অসম্ভব ছিল একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় যুদ্ধে অংশ নেয়া। কারণ, সেটি অসম্ভব করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। তিনি সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা মুমতাহানার ১ নম্বর আয়াতে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব ও কোয়ালিশন করাকে হারাম করেছেন। কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় যারা ইসলাম থেকে দূরে সরে, তারা শুধু প্যান-ইসলামী চেতনা থেকেই দূরে সরে না, দূরে সরে ইসলামের হারাম-হালালের বিধান থেকেও। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা সে কারণেই একাত্তরে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের কোলে গিয়ে উঠে এবং বিজয় তুলে দেয় ভারতের ঘরে। মুসলিম উম্মাহ আজ যেরূপ ৫০টির বেশী টুকরোয় বিভক্ত, শক্তিহীন, মর্যাদাহীন ও স্বাধীনতাহীন -তার মূল কারণ হলো রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে ইসলামী চেতনাশূণ্য ফ্যাসিবাদী সেক্যুলারিস্টদের দখলদারী। এ দখলদারগণ নামে মুসলিম; এবং সে মুসলিম নামটি মুখোশ মাত্র। সত্যিকার মুসলিম হতে হলে শুধু নামটি মুসলিম হলে চলে না, চেতনায় ধারণ করতে হয় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বিশ্বজগত নিয়ে পবিত্র কুর’আনের দর্শনকে। এবং একাত্ম হতে হয় কুর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহ তায়ালার পবিত্র এজেন্ডার সাথে। তাঁর সে এজেন্ডাটি হলো সকল মতাদর্শ ও ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়। সেরূপ একাত্মতা না থাকলে ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে কোন রূপ আগ্রহ সৃষ্টি হবে না -সেটিই তো স্বাভাবিক। সেটিই তো দেখা যায় মুসলিমের মুখোশধারী বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট এবং বামপন্থীদের মাঝে। তাদের উৎসব বরং ভারতের একাত্তরের বিজয় নিয়ে এবং পাকিস্তানের পরাজয় নিয়ে; সেটিই তো দেখা যায় প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর এলে।