রাঙামাটিতে টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। জেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ২০ হাজার মানুষ। বন্যায় বিশুদ্ধ পানির উৎস তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট।
এদিকে, শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল থেকেই জেলায় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধস ও বন্যার শঙ্কা বাড়ছে
বন্যার পানিতে নলকূপ ও অন্যান্য সুপেয় পানির উৎস তলিয়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রেও নিরাপদ পানির অভাব দেখা দেওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পানির কন্টেইনার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রাঙামাটি সদর উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী সুব্রত বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করতে পানির কন্টেইনার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। শুক্রবার সদর উপজেলার লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে এসব সামগ্রী বিতরণ করতে দেখা যায়।
বাঘাইছড়ি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, টানা বর্ষণে তাদের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বটতলী উচ্চ বিদ্যালয় ও বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকেছে। বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির। নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য অনেককে পাহাড়ি এলাকায় যেতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাঘাইছড়ির পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ।
শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮০৭ পরিবারের ২ হাজার ৩৬৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে বিলাইছড়ি উপজেলার কোংড়াছড়ি, তক্তানালা, এগুইজ্জেছড়ি, ফারুয়া বাজারেরসহ নিম্নাঞ্চলের অনেক গ্রাম এখনো প্লাবিত রয়েছে। বিলাইছড়িতে ৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১২২ জন লোক আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। গত দুই দিন ধরে মালামালবোঝাই বেশ কয়েকটি ট্রাক সড়কে আটকে আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আগত যাত্রী এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মধ্যে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বাঘাইছড়িতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টায় সাজেক ভ্যালিতে আটকা পড়া পর্যটকদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আরও ৩১১ জন পর্যটক সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে সাজেক ত্যাগ করেছেন। বৈরী আবহাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও পর্যায়ক্রমে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুর ২টা পর্যন্ত জেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫২৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন জায়গায় ১২৫টি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলে প্রকাশিত জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, সর্বশেষ আরও ৩৭০টি পানিবন্দি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত সবাইকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার, সুপেয় পানি ও প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্গত ও পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছে।