মঈনুল ইসলাম, চকরিয়া-মাতামুহুরি: রোববার থেকে শুরু হওয়া টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকেও পাহাড়ি ঢলের পানি মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে চকরিয়া উপজেলা ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার শতাধিক গ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে দুই উপজেলার অন্তত দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছে, বুধবার বিকালে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১১.৮০ মিটার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে প্লাবিত এলাকার পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভারী বৃষ্টিতে গেল চারদিন ধরে চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা এবং উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, বরইতলী, হারবাং, কাকারা, লক্ষ্যারচর, বমুবিলছড়ি, ফাঁসিয়াখালী, চিরিঙ্গা ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নের বেশিরভাগ নিচু এলাকা সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
অপরদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের কয়েকশো ঘরবাড়িতে ঢলের পানি ঢুকে গেছে। বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে গ্রামীণ প্রধান সড়ক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা,যার ফলে অনেক এলাকা উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
টানা বৃষ্টিতে মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢলের পানি বেড়ে যাবার কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ সড়ক, কাঁচা ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং চিংড়িজোনের অসংখ্য চিংড়ি ঘের তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে চকরিয়া পৌরশহরের হাসপাতাল পাড়া, থানা সেন্টার ও মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে টানা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার তৎপরতা তদারকি করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার (পিআইও) দিলীপ দে জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার গ্রামীন জনপদে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ি এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিসাধন হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট বাড়িঘরের তালিকা চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত ও বন্যার দকল কমে গেলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে এবিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহনে জেলা প্রশাসক এবং জেলা ত্রান ও পুর্নবাসন কর্মকর্তার দপ্তরে পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নিম্নাঞ্চলে দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য ইতোমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের সবকটি স্লুইসগেটের কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। বন্যাদুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসসহ স্থানীয় প্রশাসনের সব বিভাগকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের ভেতর, টিলা ও ঢালুতে ঘর তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি এড়াতে সর্বসাধারণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রশাসন।
ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, বুধবার সারাদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শন করে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিপিপির সদস্যদের মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এরই মধ্যে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। আগামী ৬ থেকে ৭ দিন কক্সবাজারে কমবেশি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে।