তাজরিন আক্তার মুন্নি মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ডা.এম এ রশীদ উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না। ডা.এম এ রশীদ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে কোনো নিজস্ব জমি নেই। অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যালয়টি নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে,যা গুরুতর অপরাধের পর্যায় পড়ে,
শিক্ষার্থীদের ফলাফলও আশানুরূপ নয় চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় নিজস্ব জমি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিদ্যালয়টি পেয়েছে পাঠদানের অনুমতি (ইন নম্বর)। শুধু তাই নয়, সরকারি অর্থে এক কোটি ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন একাডেমিক ভবন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারি ইউনিয়নের বোর্ড বাজার এলাকায় ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ডা. এম এ রশীদের সন্তানেরা। তাঁর জীবিত চার সন্তানের মধ্যে দুজন বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব, একজন কলেজের অধ্যক্ষ এবং একজন কৃষক। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলার জিয়নপুর ইউনিয়নের বেলায়েত হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউলের ১১ শতক এবং মকবুল হোসেনের আত্মীয়ের ২৪ শতক জমিতে বিদ্যালয়টি গড়ে তোলা হয়েছে। জমিগুলো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয়। মৌখিক চুক্তিতে ভাড়া নেওয়া জমির জন্য প্রতি শতক বাবদ বছরে ৫০০ টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়।
গত সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। দুটি কক্ষে দুই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াচ্ছিলেন। প্রধান শিক্ষকসহ অন্য কোনো শিক্ষক-কর্মচারীকে সেখানে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর প্রাইভেট পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মোখলেসুর রহমান বলেন, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। এরপর প্রাইভেট কোচিং চলে।
বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক জানান, হাজিরা খাতায় প্রায় ২৩৩ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। তবে বাস্তবে নিয়মিত উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে ১১ জন কর্মরত আছেন।
বিদ্যালয়টি ২০২৩ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি পায়। পরে পাশের একটি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে নিবন্ধন করে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তবে বিদ্যালয়ের গণিত ও ইংরেজি শিক্ষক চলতি বছর কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, সে তথ্যও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি প্রধান শিক্ষক মাসুম রানাকে। বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রধান শিক্ষককে কল করে সাংবাদিকের পরিচয় দিলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছর ১২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল মাত্র একজন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতিসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের নামে নিজস্ব জমি থাকতে হবে। জমির মালিকানা, খারিজ ও খাজনা-সংক্রান্ত কাগজপত্রও দাখিল করতে হয়।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, নিজস্ব জমি না থাকলে কোনো বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
দৌলতপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম বলেন, আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। বিদ্যালয়টি কীভাবে অনুমতি পেয়েছে, তা বলতে পারব না। তবে পাঠদানের অনুমতি পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের নামে জমি থাকা বাধ্যতামূলক।
শুধু পাঠদানের অনুমতিই নয়, নিজস্ব জমি না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টির জন্য পাঁচতলা ফাউন্ডেশনসহ একতলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে এক কোটি ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেজমেন্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খান জিল্লুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারকে এখনো কোনো বিল দেওয়া হয়নি। বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে।