মস্কো থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ভোলগদাসহ রাশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি ডিপো ও তেল পরিশোধন স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ায় জ্বালানি সহজলভ্য ছিল এবং ইউরোপের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি হতো। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করা; এখন অনেক রুশ নাগরিকের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার ভোলগদা শহরের বাসিন্দা ইয়েলেনা ও দিমিত্রি নিজেদের গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পথে একের পর এক চারটি পেট্রোল পাম্প ঘুরেও জ্বালানি পাননি। অবশেষে পঞ্চম একটি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাড়িতে তেল ভরতে সক্ষম হন তারা।
গাড়িতে অপেক্ষা করতে করতে ইয়েলেনা এএফপিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। এখন শুধু অপেক্ষা করতে হবে। দেখা যাক, আমাদের পালা আসার আগেই জ্বালানি শেষ হয়ে যায় কি না।
ক্রেমলিন অবশ্য পরিস্থিতিকে অতটা গুরুতর বলে মনে করছে না। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবি, ইউক্রেন রুশ সমাজে আতঙ্ক ও বিভাজন তৈরির উদ্দেশ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
রাশিয়ার বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে অধিকাংশ অঞ্চলে ব্যক্তিগত গাড়িই প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। ফলে জ্বালানি সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে করা এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জুন মাস থেকে রাশিয়ার ৯০ শতাংশেরও বেশি অঞ্চলে কোনো না কোনো ধরনের জ্বালানি সংকট বা রেশনিং চালু হয়েছে।
ভোলগদায় অনেক পেট্রোল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। যেগুলো খোলা আছে, বিশেষ করে বড় তেল কোম্পানিগুলোর স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
সংকট মোকাবিলায় মস্কো সরকার প্রথমে নির্দিষ্ট গ্রেডের পেট্রোল ও বিমান জ্বালানির রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা ডিজেল রপ্তানিতেও সম্প্রসারণ করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি রেশনিং চালু করা হয়েছে।
চালকদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে রাজধানী মস্কোসহ কিছু এলাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মস্কোতে এখন আগের তুলনায় পাম্পে অপেক্ষার সময় কমেছে।
ভোলগদার বাসিন্দা নিকোলাই জানান, আগের চেয়ে এখন বেশি স্টেশন চালু হয়েছে এবং নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে লাইনের দৈর্ঘ্যও কিছুটা কমেছে।
তবে এই সংকট ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি খাত কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনার্জি ইন্টেলিজেন্স জুলাইয়ের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার দৈনিক ৬৬ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অচল হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেন বলছে, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা তাদের শহরগুলোর ওপর মস্কোর অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব। একই সঙ্গে এটি রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎসে আঘাত হানার কৌশল।
অন্যদিকে পুতিন দাবি করেছেন, ইউক্রেন রাশিয়ার অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে তার মতে, রাশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থার সক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে এসব প্রচেষ্টা সফল হবে না।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা ভোলগদাতেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।
স্থানীয় অনেক চালক এই সংকটের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে দায়ী করছেন, যা ক্রেমলিনের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে মিল রয়েছে।
ইয়েগর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, তোমাদের মিত্ররাই আমাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধটা চায় ইউক্রেন আর ইউরোপ।
তার দাবি, রাশিয়া অন্য কোনো দেশ আক্রমণ করতে চায় না; বরং পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্যই যুদ্ধ করছে।
ইয়েগরের স্ত্রীও একই সুরে বলেন, অনেকে বলে রাশিয়া অন্য দেশ দখল করতে চায়। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাশিয়া কখনও কাউকে আক্রমণ করেনি।