প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
যেকোনো নির্বাচিত বা রূপান্তরকালীন সরকারের মূল্যায়নের জন্য পাঁচ মাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে একটি সরকারের "হানিমুন পিরিয়ড" বা প্রাথমিক গুছিয়ে ওঠার পর্ব বলা চলে। তবে প্রবাদ রয়েছে, "মর্নিং শোজ দ্য ডে" বা সকালের সূর্যই দিনের পূর্বাভাস দেয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই পাঁচ মাস কেবল একটি শাসনকাল নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্থবির ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিপরীতে একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের উন্মেষকাল। নাগরিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যে মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত শিফট (Structural Shift) এনেছেন, তা জনমনে গভীর আগ্রহের সঞ্চার করেছে। তবে এই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জও দৃশ্যমান হয়েছে, যা একজন তাত্ত্বিক হিসেবে আমাদের নির্মোহ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
দর্শনের নতুন দিগন্ত: সমতা, সহনশীলতা ও সার্বভৌমত্ব
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে যে নিত্যনতুন দর্শন ও পলিসি নিয়ে হাজির হয়েছেন, তার মূল ভিত্তি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা বা Inclusive Governance। তাঁর গৃহীত্ব তিনটি মূল স্তম্ভকে তাত্ত্বিকভাবে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. ইন্টিগ্রেশন সোসাইটি (Integration Society): দীর্ঘদিনের বিভাজনের রাজনীতি—যা সমাজকে `আমরা বনাম ওরা` (Us vs Them) তত্ত্বে খণ্ডিত করেছিল—তা থেকে বের হয়ে একটি সমন্বিত সমাজ বিনির্মাণের ডাক দিয়েছেন তিনি। এটি সমাজবিজ্ঞানী জর্গেন হাবেরমাসের "কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন" (Communicative Action) তত্ত্বের কাছাকাছি, যেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সংলাপের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ সামাজিক চুক্তি (Social Contract) তৈরি হয়।
২. জিরো প্রতিশোধ নীতি (Zero-Revenge Policy): রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশ দশকের পর দশক ভুগছে, সেখানে এই নীতি একটি প্যারাডাইম শিফট। নেলসন ম্যান্ডেলা যেভাবে বর্ণবাদ পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকায় "ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন" (Truth and Reconciliation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে প্রতিশোধহীন শান্তির পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর `জিরো প্রতিশোধ নীতি` আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই উচ্চতারই প্রতিফলন। এটি রাজনৈতিক অপরাধতত্ত্বের (Political Criminology) দৃষ্টিতে চক্রাকারে চলা রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটানোর মোক্ষম হাতিয়ার।
৩. সবার আগে বাংলাদেশ (Bangladesh First): এটি মূলত একটি নিও-রিয়েলিস্ট (Neo-realist) পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতি। বিশ্বায়নের যুগে কোনো আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নত না করে দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের `আমেরিকা ফার্স্ট` বা তুরস্কের আঞ্চলিক নীতিগুলোর মতোই, এই নীতি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
নাগরিক মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা: কল্যাণ রাষ্ট্রের মডেল
একটি রাষ্ট্র কেবল জিডিপি (GDP) দিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে ওঠে না, বরং তা নির্ধারিত হয় প্রান্তিক নাগরিকের মর্যাদা বা Personal Dignity রক্ষার সক্ষমতা দিয়ে। অমর্ত্য সেনের `ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ` (Capability Approach) বা সক্ষমতা তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখছি প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক নীতিগুলোতে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড: এটি কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং নাগরিকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা দুর্নীতি হ্রাস এবং সামাজিক সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
স্কুলগামী শিশুদের কমপ্লিট ড্রেস কোড: এই উদ্যোগের মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ক্লাসরুমে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু একই পোশাকে বসে, তখন তাদের মধ্যকার শ্রেণিবিভেদ বা Class Discrimination অবচেতনেই বিলুপ্ত হয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে সমতার বীজ বপন করার একটি দূরদর্শী প্রয়াস।
বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও রেডমার্ক ঘটনা: সমালোচকদের দৃষ্টিতে পাঁচ মাস
কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এই মহৎ যাত্রায় আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সীমাবদ্ধতাগুলোকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সীমিত সম্পদ, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়—নাগরিক হিসেবে এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে।
তবে এই পাঁচ মাসে সরকারের উচ্চপদে নিয়োগ, বদলি এবং নীতি নির্ধারণী কিছু ক্ষেত্রে `রেডমার্ক` বা উদ্বেগজনক ঘটনাও সমালোচক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ওপেন সোর্স ইনফরমেশন, জাতীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য ডেটা অ্যানালিসিস করলে কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতা বা বিচ্যুতি চোখে পড়ে:
১. ফ্যাসিবাদী দোসরদের পুনর্বাসন ও পদোন্নতি: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী বা ব্যুরোক্রেসির (Bureaucracy) একাংশ, যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, তাদের অনেককে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। এটি প্রশাসনকে ভেতর থেকে দুর্বল করার ঝুঁকি বাড়ায়, যা ক্রান্তিকালীন বিচার ব্যবস্থা বা Transitional Justice-এর ধারণার পরিপন্থী।
২. প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগে দৃষ্টিভঙ্গিগত ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ: রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা, সততা ও সৎসাহসের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বদ্ধপরিকর এবং তাঁর এই সদিচ্ছা সর্বজনবিদিত। তবে বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর কিছু স্তরে এখনো একটি নির্দিষ্ট চিন্তাদর্শন বা বিশেষ বলয়ের মনস্তাত্ত্বিক প্রাধান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি সফল রূপান্তরকালীন সরকারের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত `ইনক্লুসিভ মেরিটোক্রেসি` (Inclusive Meritocracy), যেখানে রাজনৈতিক বা আদর্শিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমিক, সৎ ও সাহসী প্রতিভাকে আলিঙ্গন করা হয়। নতুবা, সুশাসনের গতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের যে বৃহত্তর লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা এই অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
৩. মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: মন্ত্রিসভার ২/৩ জন মন্ত্রীর রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাব এবং কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড মাঠপর্যায়ের ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি, তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের গভীরভাবে ব্যথিত ও হতাশ করেছে। এটি সরকারের সামগ্রিক অর্জনকে আড়াল করার সুযোগ করে দেয়।
নেতৃত্বের আলোকবর্তিকা
এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, "একজন মহান নেতার গুণ হলো তিনি পরিবর্তনকে ধারণ করেন কিন্তু ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেন না।" সব সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এই সরকারের মূল চালিকাশক্তি হলেন স্বয়ং সরকার প্রধান জননেতা তারেক রহমান। একজন রাষ্ট্রনায়ক বা Statesman-এর বড় গুণ হলো তিনি সমালোচকদেরও তাঁর কর্ম ও নীতি দিয়ে প্রশংসা করতে বাধ্য করেন।
আজ আমরা দেখছি, অতীতে যারা তীব্রভাবে বিএনপির নীতি ও নেতৃত্বের সমালোচনা করতেন, সেই সব জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরাও আজ অকপটে স্বীকার করছেন—"বাংলাদেশ ইতোপূর্বে এমন দূরদর্শী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তার প্রধানমন্ত্রী আর পায়নি।" আলহামদুলিল্লাহ, এটিই এই সরকারের পাঁচ মাসের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।
একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের এই যাত্রায় ভুলত্রুটি থাকবেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর দর্শন বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকেন এবং প্রশাসনিক ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন করে মেধা ও সততার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করেন, তবে বাংলাদেশ যে একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে—তা একজন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।