ড. বি এম শহীদুল ইসলাম : আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স)-কে নবুয়্যত দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। রাসুল (স)-এর আদর্শকে সর্বযুগের সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর আদেশ ও নির্দেশনা অনুসরণের জন্য বলা হয়েছে। রাসুল (স)-কে মান্য করার ব্যাপারে তাঁর সম্পর্কে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা পবিত্র কুরআনে যেসব দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো। যারা বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন, আশাকরি এর মাধ্যমে তারা আল্লাহকে অনুসরণ করার পাশাপাশি রাসুল (স)-কে অনুসরণের পরিপূর্ণ গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
১. রাসুল (স)- এর আদেশ গ্রহণ কর: রাসুল সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন; তোমরা রাসুলের আদেশ গ্রহণ কর। অর্থাৎ তিনি যা করার জন্য নির্দেশ দেন তা যথাযথভাবে পালন কর। যা তিনি করার জন্য নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক। এটি আল্লাহর হুকুম। মহান আল্লাহর হুকুম পালন না করলে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। সুতরাং রাসুল (স)-এর আদেশ অবশ্যই পালন ও গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে- "রাসুল যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক"।
[সুরা-৫৯, হাশর: ০৭]। যারা বলে আমরা আল্লাহ মানি, কিন্তু রাসুল (স) মানি না। তারা অবশ্যই ভুলের মধ্যে রয়েছে। তাই তাদেরকে সঠিক পথে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
২. রাসুলের (স) আনুগত্য করা মানে আল্লাহর আনুগত্য করা: রাসুল (স) সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন; তোমরা রাসুলের আনুগত্য কর, তার কথা মান্য কর এবং তার নির্দেশনা অনুসরণ কর। কারণ রাসুলের (স) আনুগত্য করা মানেই আল্লাহর আনুগত্য করা। আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন; যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে রাসুলকে অমান্য করল, সে আমাকেই অমান্য করল"। [সুরা-৪, নিসা: ৮০]। সুতরাং অবশ্যই রাসুল (স)-এ-র আনুগত্য করতে হবে। অন্যথায় কাঠির গুনাগার হতে হবে এবং আল্লাহর নিকট শাস্তি পেতে হবে।
৩. রাসুল (স)-কে মিমাংসাকারী মানা: সকল ক্ষেত্রে রাসুল (স)-কে মিমাংসা কারী বা ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেয়া মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ রাসুল (স)-কে ফায়সালাকারী না মানা পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া যায় না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন; "তোমরা রাসুলকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেয়া পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না"। [সুরা-৪, নিসা: ৬৫]। অতএব, সকল ক্ষেত্রে রাসুল (স) ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেয়া অপরিহার্য।
৪. রাসুল (স)-এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত: একজন মুনিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে- আল্লাহ ও রাসুল (স)-এর সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসুল (স) কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে মুমিনের আর নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "আল্লাহ ও রাসুল যদি কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন তাহলে কোনো মুমিন ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই"। [সুরা-৩৩, আহযাব:৩৬]। সুতরাং মুমিন ব্যক্তির সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তার রাসুল (স)-এর সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকতে হবে। কোনোভাবেই তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নিতে পারবে না।
৫. রাসুলের (স) প্রতি কিতাব ও হিকমাহ নাযিল: মহান আল্লাহ তায়ালা রাসুল (স)-এর প্রতি কিতাব ও হিকমাহ নাযিল করেছেন। অর্থাৎ রাসুল (স)-এর ওপর মহাগ্রন্থ পবিত্র আল কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এটি স্বয়ং আল্লাহর বাণী। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন; আমি রাসুলের প্রতি কিতাব ও হিকমাহ নাযিল করেছি। এখানে `কিতাব` বলতে পবিত্র ঐশী গ্রন্থ আল কুরআনকে বুঝানো হয়েছে এবং `হিকমাহ` বলতে গভীর জ্ঞান বা প্রজ্ঞাকে বুঝানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন; "আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমাহ নাযিল করেছেন"। [সুরা-৪, নিসা:১১৩]। সুতরাং রাসুল (স)-এর নির্দেশ অনুসরণ করা অপরিহার্য।
৬. রাসুল (স) কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন: রাসুল (স) কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দান এবং পরিশুদ্ধ করেন। পবিত্র কুরআনের দাওয়াত ও মহান বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা রাসুল পাঠিয়েছেন। রাসুল (স)-এর কাজ হচ্ছে- কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে মানুষকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা। এছাড়া এমন সব বিষয়ে রাসুল (স) তোমাদেরকে জ্ঞান দান করেন, যা তোমাদের জানা ছিল না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন; "আমি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসুল পাঠিয়েছি। যিনি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন এবং এমন সব বিষয়ে তোমাদেরকে শিক্ষা দেন, যা তোমাদের জানা ছিল না"। [সুরা-২, বাক্বারাহ: ১৫১ আয়াত]। এ থেকে আমরা পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারি যে, রাসুল (স) উম্মাহর মহান শিক্ষক।
৭. রাসুলের কাজ মানুষের নিকট আল্লাহর বিধান স্পষ্ট করা: মানুষের কাছে রাসুল (স)-কে পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিধান আল কুরআনের বিষয়বস্তু তাদের নিকট সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা। আল্লাহ তায়ালা এ মহান দায়িত্ব রাসুল (স)-এর প্রতি অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন;
"আগের রাসুলদেরকেও আমি উজ্জ্বল নিদর্শন ও কিতাব দিয়ে পাঠিয়েছিলাম এবং এখন এ বাণী তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি লোকদের সামনে সেই শিক্ষার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে যেতে থাক। যা তাদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে লোকেরা নিজেরাও চিন্তা-ভাবনা করে"। [সুরা-১৬, নাহল:৪৪]। সুতরাং বুঝা গেল যে, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের দাওয়াত ও মহান শিক্ষা সম্পর্কে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যই আল্লাহ রাসুল (স)-কে মহান দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (স)-এর পর নবুয়তের সমাপ্তি ঘটে গেছে। সুতরাং এ দায়িত্ব এখন তার উম্মতে ওপর বর্তায়।
৮. আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর: আল্লাহ ও তার প্রেরিত রাসুলের আনুগত্য করা অপরিহার্য। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ করা অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্যের বিধানকে পরিপূর্ণরূপে মেনে নেয়া। আর আল্লাহর আনুগত্যের বিধান মেনে নেয়ার অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ ও রাসুল (স)-এর আনুগত্য করা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে- "হে নবী বল! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য কর। তারপর যদি তারা তোমাদের এ দাওয়াত গ্রহণ না করে, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন লোকদের ভালোবাসেন না, যারা তার ও তার রাসুলদের আনুগত্য অস্বীকার করে"। [ সুরা-৩, ইমরান:৩২]। সুতরাং উপর্যুক্ত আয়াতসমূহের আলোকে বলা যায় যে, রাসুল (স)- অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব এবং তাকে ব্যতীত কোনোভাবেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়।
সুতরাং যারা বলে, "কুরআন মানি, কিন্তু হাদিস মানি না"-তারা গোমরাহির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। যদি তারা গোমরাহি থেকে ফিরে না আসে তাহলে তাদেরকে পরকালে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ গবেষক কলামিস্ট ও ইসলামিক থিংকার। ০২/০৮/২৬