ড. বি এম শহীদুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মাণের জন্য ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির থাকা অপরিহার্য। ইসলামী সংগঠন পরিচালনার জন্য নেতার যেসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি থাকা আবশ্যক আজ সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে-ইনশাআল্লাহ। তার আগে নেতৃত্ব সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা জরুরি।
নেতৃত্বের সংজ্ঞা: নেতৃত্ব শব্দের অর্থ নেতার দায়িত্ব যার ওপর অর্পিত হয়। নেতৃত্বকে দায়িত্বশীল বলা যেতে পারে। যিনি সংগঠন পরিচালনা করেন বা সংগঠন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন তাকে নেতা বলা হয়। ছোট বড় প্রত্যেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় যারা শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন তারা প্রত্যেকেই এক একজন নেতা। সুতরাং নেতার দায়িত্ব বা কর্মকান্ডকে নেতৃত্ব বলে। ইংরেজিতে নেতাকে বলা হয় `লিডার` আর নেতৃত্বকে বলা হয় "লিডারশিপ"। আরবি ভাষায় নেতৃত্বকে আমির বা ইমাম বলা হয়। আমির বা ইমামকে আনুগত্য করা বা অনুসরণ করা সকলের দায়িত্ব। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি দ্বীনের সঠিক পথে পরিচালনা করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার আনুগত্য করা যাবে। অন্যথায় আনুগত্য করা জায়েয নেই।
ইসলামী নেতৃত্বের সংজ্ঞা: ইসলামী সংগঠন পরিচালনায় যিনি নেতৃত্ব দান করেন তাকে ইসলামী নেতৃত্ব বলে। আর সংগঠন শব্দের অর্থ সংঘবদ্ধ করা, একত্রিত করা, দলবদ্ধ করা ইত্যাদি। তবে বিশেষ অর্থে সংগঠিত বা সংঘবদ্ধ জীবন যাপনকে সংগঠন বলা হয়। ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করে যে সংগঠন তাকে ইসলামী সংগঠন বলা হয়। ইসলামী সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ইকামাতে দ্বীনের মহান আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজ কাজ। সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন; "তোমারা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" [ সুরা-৩, আল ইমরান:১০৩ আয়াত]। নবী করীম (সা) বলেছেন; "তিনজন লোক যদি একত্রে সফর করে তাহলে যেন তারা তাদের মধ্য থেকে একজনকে অবশ্যই আমির বানিয়ে নেয়"। [সহীহ বুখারী]। হযরত ওমর (রা) বলেন; "সংগঠন ছাড়া ইসলাম নেই, নেতৃত্ব ছাড়া সংগঠন নেই এবং আনুগত্য ছাড়া নেতৃত্ব নেই"। এসব আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুমিনদেরকে সংঘবদ্ধ বা জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। নেতৃত্ব সাধারণত ২ ধরণের হয়ে থাকে।
১.ইসলামী নেতৃত্ব: যিনি ইসলামী আদর্শের অনুসারী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন বা ইসলামী দলের নেতৃত্ব দেন তাকে ইসলামী নেতৃত্ব বলে। কুরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পদের প্রতি আকাঙ্ক্ষিত হন না, এমন ব্যক্তিই ইসলামী নেতৃত্বের জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। আর যিনি নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করেন তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে-ব্যক্তির আল্লাহ ও রাসুলের (সা) প্রতি আনুগত্য, দ্বীনি ইলম, আল্লাহ ভীতি, দেশপ্রেম, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, অনড় মনোবল, কর্মের দৃঢ়তা, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী শক্তি, প্রশস্ত চিত্ততা, সুন্দর ব্যবহার, মেজাজের ভারসাম্য, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন; " যারা ঈমানদার তারা আল্লাহ ও রাসুলের (সা)-এর আনুগত্য করে"।
২.বাতিল নেতৃত্ব: যিনি ইসলামী সংগঠন ছাড়া অন্য কোনো মানবরচিত মতবাদ প্রতিষ্ঠার সংগঠনের নেতৃত্ব দেন বা ইসলামী সংগঠনের বিপরীতে নেতৃত্ব দেন তাকে বাতিল নেতৃত্ব বলে। বাতিল নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পদ পাওয়ার জন্য লবিং, গ্রুপিং ও আর্থিক প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পায়। সেখানে প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন; "যারা কফের তারা শয়তানের আনুগত্য করে"।
ইসলামী সংগঠনে নেতৃত্বের গুরুত্ব: ইসলামী সংগঠনে নেতৃত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই গোটা কর্মী বাহিনী পরিচালিত হয়। ইসলামী নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য গুণাবলি ও আমল-আখলাক গোটা কর্মী বাহিনীর ওপর প্রভাব ফেলে। নেতৃত্ব যদি সুশৃঙ্খল হয় তাহলে কর্মী বাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব আমলদার হলে কর্মী বাহিনী উন্নত আমলের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করে, নেতৃত্ব আনুগত্যশীল হলে কর্মীরা আনুগত্যশীল হয়। মোটকথা, ইসলামী সংগঠনে নেতৃত্বের আলোকে কর্মী বাহিনী ও সমর্থকরা গড়ে ওঠে। সুতরাং ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের নিম্নরূপ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি অর্জন করা অপরিহার্য।
১.জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন: ইসলামী নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে হবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। ইসলামী জীবন দর্শন, ইসলামী আইন-কানুন ও ইসলামী জীবন বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। তেমনি মানব রচিত যাবতীয় মতবাদ সম্পর্কে ও শয়তানী চিন্তার আলোকে গঠিত ভ্রান্ত মতবাদ ও দর্শন সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করা জরুরি। মোটকথা, তথ্য প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও বস্তুগত দর্শন, পুঁজিবাদ, সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, মার্কসবাদ, ফ্যাসিবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, লেলিনবাদসহ সব ধরণের বৈশ্বিক জ্ঞান থাকা ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জ্ঞান দানের জন্য এবং পরিশুদ্ধ করার জন্যই যুগে যুগে নবী ও রাসুল পাঠিয়েছন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "আমি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসুল পাঠিয়েছি। যিনি তোমাদেকে আমার আয়াত পড়ে শুনাবেন, পরিশুদ্ধ করবেন, কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবেন এবং এমন সব বিষয়ে শিক্ষা দেবেন যা তোমাদের জানা ছিল না।" [সুরা-২, বাকারাহ:১৫১ আয়াত]।
২. অমায়িক ও বিনয়ী আচরণ: ইসলামী নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি হতে হবে অমায়িক, বিনয়ী ও বিনম্র আচরণ। কর্কশ ভাষা ও রুক্ষ আচরণ মানুষকে চরমভাবে আহত করে। কঠোরতা অবলম্বন ও রূঢ় আচরণ কখনো মানুষের অন্তরকে জয় করতে পারে না। ইসলামী নেতৃত্বের পক্ষে রুক্ষ আচরণ বড় ধরণের অযোগ্যতা। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে কর্মীরা এ ধারণের নেতার আনুগত্য করলেও তাদের অন্তরে তীব্র বেদনা ও অসন্তুষ্টি লুকায়িত থাকে। ফলে তাদের সাংগঠনিক কাজকর্মে গতিশীলতার পরিবর্তে গতিহীনতা দেখা দেয়। এজন্য নেতাকে অবশ্যই অমায়িক ও বিনম্র আচরণের অধিকারী হতে হবে। তার আচরণের সৌন্দর্য কর্মীদেরকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো আকর্ষণ করবে। ফলে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ রুহানি শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং মজবুত হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "তুমি যদি বিনম্র স্বভাবের না হতে তাহলে লোকেরা তোমার চতুর্দিক থেকে সরে যেত।
৩. উত্তম আমল: ইসলামী নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে হবে উত্তম আমল। উত্তম আমল ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ হবে। ইসলামী সংগঠনের নেতাদের হতে হবে ইসলামের বিমূর্ত নিদর্শন বা প্রতীক। ইসলামী সংগঠনের নেতার কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, গবেষণা ও দর্শনে ইসলামের সত্যিকার রূপ প্রতিফলিত হওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে রাসুল (সা)- এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সর্বোত্তম আদর্শ ও আমল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মুমিন জীবনের যেসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল কুরআন নির্দেশনা দিয়েছে, রাসুল (সা) ছিলেন তার জীবন্ত ও বাস্তব প্রমাণ। রাসুল (সা)-এর জীবনের আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল। যার ফলশ্রুতিতে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলামকে আনন্দের সাথে আলিঙ্গন করেছে।
৪. সময়ানুবর্তিতা ও শৃংঙ্খলা: ইসলামী সংগঠনের নেতাদের প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। অনেক উর্ধ্বতন ও অধস্তন নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ করতে হয়। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক বৈঠকে উপস্থিত হতে হয়। সাধারণ মানুষের সাথে আদান-প্রদান ও ভাব বিনিময় করতে হয়। সমাজ সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের নিমিত্তে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতার সাথে যথাসময়ে সকল কাজ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। একটি কাজ সময় মতো করতে না পারলে অন্যান্য সকল কার্যক্রমের ওপর ব্যর্থতার প্রভাব পড়ে। এজন্য সময় সম্পর্কে সচেতন থাকলে প্রতিটা কাজ নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হবে। অতএব সময়ানুবর্তিতা বা সময়ের প্রতি গুরুত্ব অনুধাবন করা ইসলামী নেতৃত্বের জন্য খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা: ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি হচ্ছে-তাকে
শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা থাকতে হবে। বিশৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন কখনো ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা সাংগঠনিক জীবনে স্বস্তি দিতে পারে না। নেতৃত্বের দায়িত্ব হচ্ছে-সংগঠনের সকল স্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার চর্চা ইসলামী সংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়। উর্ধ্বতন সংগঠনের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা আসবে, সেসব নির্দেশনা মেনে চলা বা আনুগত্য করা যেমন অধস্তন সংগঠনের জন্য অপরিহার্য। ঠিক তেমনি উর্ধ্বতন সংগঠনের দায়িত্বশীলগণ এমন কিছু করবেন না, যাতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। অর্থাৎ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যদি সাংগঠনিক স্তরের কোনো একটি ধাপের দায়িত্বশীলকে না জানিয়ে তাকে অতিক্রম করে পরবর্তী নিচের স্তরের মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পন্ন করা হয় অথবা কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এ ব্যাপারে নেতৃত্বকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে এ ধরণের ঘটনা কাম্য নয়।
৬. সাহসিকতা: ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-সাহসিকতা। তিনি একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবেন না। অসীম সাহসিকতা ছাড়া বিজয়ী হওয়া যায় না। আমাদের প্রিয় নবী করীম (সা) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে দুনিয়ার সব কিছু তাকে ভয় করে"। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা) অসাধারণ সাহসিকতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের অবশ্যই অসীম সাহসিকতার অধিকারী হতে হবে। ভীতু কাপুরুষের জন্য ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের নেতৃত্ব প্রদান করা সম্ভব নয়।
৭. সাংগঠনিক প্রজ্ঞা: প্রজ্ঞা মানে গভীর জ্ঞান ও দুরদর্শিতা। ইসলামী সংগঠনের নেতাকে অবশ্যই সাংগঠনিক প্রজ্ঞার অধিকারী হতে হবে। এছাড়া নেতৃত্বকে কর্মী পরিচালনার যোগ্যতা, নতুন নতুন
সংগঠন গড়ে তোলার যোগ্যতা, ময়দান বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা, জনশক্তির কর্মমুখর রাখার যোগ্যতা, কর্মীদের মান উন্নয়নের যোগ্যতা, কর্মপন্থা উদ্ভাবনের যোগ্যতা, কর্মীদের গ্যাপ অব ইনফরমেশন থেকে রক্ষা করার যোগ্যতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা থাকতে হবে।
৮. অনুপ্রেরণা সৃষ্টির যোগ্যতা: নেতৃত্ব বা নেতাকে কর্মী বাহিনীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টির উৎস হতে হবে। নেতার কথাবার্তা শুনে কর্মীরা মন খারাপ করার পরিবর্তে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। নেতৃত্ব হবেন কর্মীদের জন্য বটবৃক্ষ তুল্য, যেখান এসে কর্মীরা হৃদয়কে শীতল করতে পারবে। সমস্যা সঙ্কুল বৈরী পরিবেশে কর্মীরা যখন মনের ব্যথা প্রকাশের জন্য নেতার কাছে ছুটে আসেন তখন নেতার সহাস্য বদনে সান্ত্বনা ও অনুপ্রাণা তাদের মনের সকল অশান্তি প্রশমিত করে দেয়।
৯.সুবক্তা হতে হবে: ইসলামী আন্দোলনের নেতাকে সুবক্তা হওয়া অপরিহার্য। পয়েন্ট ভিত্তিক ধারাবাহিক বক্তৃতা করা নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো সভায়, সেমিনারে, টিসি ,টিএস, দারসুল কুরআনে, আলোচনা সভায় অথবা কোনো তাফসীর মাহফিলে বক্তব্য দানের পূর্বে নেতৃত্বকে অধ্যয়ন করে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বক্তব্য দানের সময় রেফারেন্সসহ সহজ-সরল, চমৎকার ও প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তব্য দিতে হবে। যাতে বক্তব্যের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব শ্রোতারা সহজে উপলব্ধি ও হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। বক্তব্য দানের সময় কর্মীদের ধমকের সুরে কথা না বলে মার্জিত ও মোলায়েম ভাষায় কথা বলতে হবে, যাতে কর্মীরা মনোকষ্ট না পায়। বক্তব্যের মধ্যে সূচনা পর্ব, মধ্য ভাগ ও সমাপনী পার্ট থাকতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বক্তব্য দিলেই তিনি ভালো বক্তা এটি মনে করার কোনো সুযোগ নেই। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাব প্রকাশ করা সত্যিকার নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। এজন্য বক্তব্য যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত ও ধারাবাহিক হতে হবে। নেতৃত্বকে সবসময় দীর্ঘ বক্তৃতা পরিহার করতে হবে। রাসুল (স)-এর বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ বক্তা। ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের উচিত হবে রাসুল (সা)-কে অনুসরণ করা।
১০. উখওয়াত সৃষ্টি করা: উখওয়াত শব্দের অর্থ ভ্রাতৃত্ব। ইসলামী আন্দোলনের নেতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা। কারণ মুমিনরা পরস্পর পরস্পরের ভাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন; "নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমার ভাইদের মাঝে মিমাংসা করে দাও, আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহ পাবে"। [ সুরা- হুজুরাত:১০ আয়াত]। রাসুল (স) বলেন; মুসলিমরা পরস্পরের ভাই । ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কারণে যুদ্ধের ময়দানে প্রচন্ড পিপাসায় কাতর হয়েও অন্য ভাইকে নিজের প্রাপ্য পানিটুকু দিয়ে পিপাসিত অবস্থায় অনেক মুমিন শাহাদাত বরণ করেছেন। একেই বলে উখওয়াত। উখওয়াত হচ্ছে-সাংগঠনিক শক্তির প্রাণ। তাই সকল স্তরে উখওয়াত সৃষ্টি করা অপরিহার্য।
১১.ত্যাগের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি: ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি হচ্ছে-ত্যাগের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি। ইসলামী নেতৃত্বকে আগে ত্যাগ ও কুরবানীর দৃষ্টান্ত পেশ করতে হয়। নেতৃত্বের ত্যাগই কর্মী বাহিনীর আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা) ছিলেন ত্যাগের বিমূর্ত প্রতীক। সাহাবায়ে কেরামগণও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাসুলের (সা)-এর ইন্তেকালের পর আয়েশা (রা) বলেন; "রাসুল (সা) দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, কিন্তু কখনো দুবেলা পেটপুরে খেতে পারেননি"। এটিই ছিল মিল্লাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার জীবনধারা, যা মানবতার জন্য ত্যাগের অনুপ্রেরণা।
১২.কর্মীদের মাঝে ইনসাফ কায়েম: একটি সংগঠনে বিভিন্ন ধরণের মানুষ থাকে। কর্ম ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা, দৈহিক অবকাঠামো ও সৌন্দর্যের দিক দিয়ে তাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির দিক বিবেচনায় সবার অধিকার সমান। এখানে সাদা-কালো, বিত্তশালী-বিত্তহীন, মালিক-শ্রমিক বড়কর্তা, ছোটকর্তা, দুর্বল-মাজুর সবাই অধিকারের দিক দিয়ে সমান অংশীদার। কারো সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলে তিনি নেতার দৃষ্টিতে যোগ্য আর সম্পর্ক ভালো না থাকলে তাকে অযোগ্য মনে করা নেতৃত্বের কাজ নয়। বরং ইসলামী নেতৃত্বের কাজ হচ্ছে সকলের প্রতি ইনসাফ কায়েম করা। অন্যথায় ইসলামী সংগঠনের অপমৃত্যু ঘটবে। নেতার দায়িত্ব হচ্ছে সবাইকে সমানভাবে ভালোবাসা। কারণ সকলের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইনসাফের দাবি হচ্ছে-নেতা সকল কর্মীকে সমান চোখে দেখবেন। প্রত্যেকের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দেবেন এবং আদায় করে নেবেন। নেতার আচরণে যদি কিছু লোকের প্রতি অনুরাগ ও কিছু লোকের প্রতি বিরাগ প্রকাশ পায় তাহলে ঐ নেতৃত্ব সংগঠন, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতি ডেকে আনে। আল্লাহ তায়ালা বলেন; "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ইনসাফ ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন"। [সুরা- নাহল: ৯০ আয়াত]। সুতরাং সংগঠন ও রাষ্ট্রের হেফাজতে জন্য নেতাকে অবশ্যই ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে হবে।
১৩.নথিপত্র ও হিসাব সংরক্ষণের যোগ্যতা: নেতৃত্বকে অবশ্যই নথিপত্র সংরক্ষণের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। পাশাপাশি নেতাকে একজন দক্ষ হিসাব রক্ষক হতে হবে। যাতে করে সংগঠনের আয়-ব্যয়ের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা নেতার অযোগ্যতা প্রমাণ করে।
উপসংহার: সুতরাং ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অবশ্যই ওপরে বর্ণিত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। অন্যথায় ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক ও কলামিস্ট।