মো: আসিফ ইকবাল: ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ধারাকে অতিক্রম করে বছরের বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এখন বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। একসময় নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকা তীব্র গরম এখন অনেক আগেই শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, শ্রম, বিদ্যুৎ, পানি এবং অর্থনীতির ওপর একযোগে চাপ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে চরম তাপপ্রবাহের ঘনত্ব, স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “তাপপ্রবাহ এখন শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় ধরে গরম অব্যাহত থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।” তাঁর মতে, নগরায়ন, সবুজায়নের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর নাজমা সুলতানা জানান, অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, “শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে হাসপাতালগুলোতে তাপজনিত অসুস্থতার রোগীর সংখ্যাও বাড়তে পারে।”
রাজধানীর নির্মাণশ্রমিক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “দুপুরে কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমে বারবার বিশ্রাম নিতে হয়, কিন্তু কাজ বন্ধ রাখলে আয় কমে যায়।” রাজশাহীর ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন বলেন, “আগে দুপুরে কিছুটা গরম থাকত, এখন সকাল থেকেই রোদ অসহনীয় লাগে। কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় মাথা ঘুরে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর সাইফুল ইসলাম বলেন, “অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধান, গম, ভুট্টা এবং সবজির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাওয়ায় সেচের প্রয়োজন বাড়ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
বিদ্যুৎ খাতেও তাপপ্রবাহের চাপ বাড়ছে। শক্তি বিশ্লেষক ডক্টর ফারহান কবীর বলেন, “গরম বাড়লে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।” তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
পানির সংকটও অনেক এলাকায় প্রকট হয়ে উঠছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহিণী রওশন আরা বলেন, “গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির ব্যবহারও বাড়ে, কিন্তু অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না।” নওগাঁর কৃষক আব্দুস সালাম জানান, “সেচের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি পানি তুলতে হচ্ছে। এতে খরচও বাড়ছে।”
তরুণদের মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “অস্বাভাবিক গরম এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।” খুলনার শিক্ষার্থী সাবিহা রহমান বলেন, “গাছপালা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণেও শহরগুলো আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, তাপসহনশীল নগর পরিকল্পনা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আগাম তাপপ্রবাহ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলায় বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তাঁরা।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এখন একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সময়মতো কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযোজন কৌশলই হতে পারে এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।