শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * বৈষম্যহীন বিচার প্রতিষ্ঠাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশা: ছাত্র জমিয়ত   * মাশহাদে ইমাম রেজা মাজারে সমাহিত হলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি   * কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা: পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ, ২২ জনের মৃত্যু   * পুরান ঢাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত ১   * চীনের ‘জুতার রাজধানী’ জিনজিয়াংয়ে কারখানায় আগুনে নিহত ২৮   * চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে চার লাখ মানুষ   * কুয়েত, বাহরাইনে আবার হামলা চালাল ইরান   * কক্সবাজারে প্রস্তুত ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র, চালু কন্ট্রোল রুম   * বিশ্ববাজারে ফের বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম   * মোহাম্মদপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুজনের মৃত্যু  

   মতামত
গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও তৃণমূলের ম্যান্ডেট: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি
  Date : 10-07-2026

- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

গণতন্ত্রের আদি এবং অন্তিম সার্থকতা কেবল রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী উচ্চমহলে নিহিত থাকে না, বরং এর প্রাণস্পন্দন আবর্তিত হয় সমাজের প্রান্তিক স্তরে, তৃণমূলের সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে। ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’-তে যথার্থই উল্লেখ করেছিলেন, “পৌরসভা বা স্থানীয় সংস্থাসমূহ হলো স্বাধীনতার পাঠশালা।” এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে যখন আমরা বাংলাদেশের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন তা কেবল কয়েকজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্বাস্থ্য, অপরাধতাত্ত্বিক গতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার এক নিখুঁত লিটমাস টেস্ট। জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মহাজাগতিক পরিমণ্ডলে নিমগ্ন থেকেও একজন অপরাধ বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই তৃণমূলের আগামী নির্বাচনই আসলে ভূ-রাজনীতি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তিপ্রস্তর হতে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গণমাধ্যম, প্রথম সারির দৈনিক এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও টকশো’র আলোচনা থেকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে নির্যাসটি বেরিয়ে এসেছে, তা অত্যন্ত sudoorprasari এবং বহুমাত্রিক। মিডিয়ার প্রাক-নির্বাচনী আলোচনা এবং রাজনৈতিক গতিধারা পর্যবেক্ষণ করলে আসন্ন এই নির্বাচনের রূপরেখা ও সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতির প্রধান কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক দিক উন্মোচিত হয়।

কাঠামোগত রূপান্তর ও বহুদলীয় অংশগ্রহণের রসায়নঃ
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন পূর্ববর্তী কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় কাঠামোগতভাবে বেশ ভিন্নমাত্রার আমেজ ছড়াতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত অবস্থান, জোট-মহাজোটের সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নির্বাচনী মাঠে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টলাইন তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির "গেম থিওরি" (Game Theory) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক পক্ষ এখানে এমন এক যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই হবে মূল লক্ষ্য। গণমাধ্যমের সূত্রগুলো ইঙ্গিত করছে, আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের সচেতন বিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রথাগত vote bank-এর ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

অপরাধতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি: পেশীশক্তি বনাম জনম্যান্ডেটঃ
একজন অপরাধ বিজ্ঞানী (Criminologist) হিসেবে যেকোনো নির্বাচনের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো সম্ভাব্য নির্বাচনী সহিংসতা, কালোটাকার অননুমোদিত বিস্তার এবং পেশীশক্তির প্রভাব। অপরাধবিজ্ঞানের ‘র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি’ (Rational Choice Theory) অনুযায়ী, অপরাধী চক্র বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল তখনই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কলুষিত করার চেষ্টা করে, যখন তারা দেখে যে অপরাধের মাধ্যমে প্রাপ্ত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা, ধরা পড়ার বা শাস্তির ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি। বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের এক নীরব প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতীয় দৈনিকগুলোর আশঙ্কা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে বিক্ষিপ্ত প্রবণতা দেখা দিতে পারে, তা যদি শুরুতেই কঠোর হস্তে দমন করা না হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্থানীয় সুশাসনকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেবে।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ ও সুশাসনের বৈশ্বিক মানদণ্ডঃ
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন সম্পূর্ণ তার নিজস্ব এখতিয়ার হলেও, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে স্থানীয় সুশাসন এবং মানবাধিকারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকার সুবাদে আমি লক্ষ্য করেছি, উন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বে ‘সাব-ন্যাশনাল গভর্নেন্স’ (Sub-national governance) বা স্থানীয় শাসনকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক অংশীদাররা বাংলাদেশের এই আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে এদেশের গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি বড় সূচক হিসেবে মূল্যায়ন করবেন। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথকে সুগম করতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরীক্ষাঃ
গণমাধ্যমের আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো নির্বাচন কমিশনের (EC) নিরপেক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নির্ভর করে তার কাজের স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থার ওপর। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্তমান কমিশনের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। মিডিয়া টকশোগুলোতে বিদগ্ধ আলোচকদের অভিমত হলো, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, প্রযুক্তির সঠিক ও বিতর্কহীন ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের জালিয়াতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করার মানসিকতা দেখানোর মাধ্যমেই কেবল এই কমিশন ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের সামনে এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ হতে যাচ্ছে। এটি কেবল ক্ষমতার বিকেন্দ্রেীকরণের উৎসব নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অবারিত সুযোগ। এই নির্বাচনকে সফল ও অর্থবহ করতে হলে আমাদের প্রথাগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। পেশীশক্তি ও অর্থবিত্তের দাপটকে পরাস্ত করে সততা, যোগ্যতা এবং জনকল্যাণের আদর্শকে ব্যালটের মাধ্যমে জয়যুক্ত করতে হবে।

রাজনীতি হোক জনগণের কল্যাণে, সমাজ হোক অপরাধমুক্ত এবং স্থানীয় সরকার হোক স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী—আসন্ন নির্বাচনে এটাই হোক আমাদের পরম প্রত্যাশা। আমরা যদি একটি আদর্শ, অহিংস এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, তবেই কেবল বিশ্বমানচিত্রে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সার্থক হবে।



  
  সর্বশেষ
মাশহাদে ইমাম রেজা মাজারে সমাহিত হলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি
আষাঢ়ের শেষ ভাগে চেনা রূপে ফিরেছে বর্ষা
ইসলামের সহজতার সৌন্দর্য
পানছড়িতে পাহাড়ি ঢলে সড়ক বিলীন



প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত ।
ফোন: ০২৪১০৭০৯৯৬ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪

Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com