| মো: আসিফ ইকবাল: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকাল ক্রমেই দীর্ঘ ও উষ্ণ হয়ে উঠছে। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়ম বনাঞ্চলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা তীব্র গরমের কারণে বনভূমির মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে একসময় ঘন সবুজে আচ্ছাদিত বনাঞ্চলগুলো এখন নানা ধরনের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পরিবেশবিজ্ঞানী ডক্টর মাহমুদুল হাসান বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বনাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অতিরিক্ত গরম ও পানির ঘাটতির কারণে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, নতুন চারা গজানোর হার কমে যায় এবং অনেক উদ্ভিদ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।” তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বনভূমির বাস্তুতন্ত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চলও এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের কারণে জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ছে। বন গবেষক ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গাছপালা, বন্যপ্রাণী, পাখি এবং ক্ষুদ্র জীব-সবাই এর প্রভাব অনুভব করে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী গরমে দাবানলের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। যদিও বাংলাদেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে বড় আকারের দাবানল তুলনামূলক বিরল, তবুও শুষ্ক আবহাওয়া আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাশেদ করিম বলেন, “শুকনো পাতা ও ডালপালা জমে থাকলে সামান্য অসাবধানতা থেকেও আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বন পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।” খুলনার বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, “আগের মতো বন এখন সব সময় সজীব লাগে না। গরমে অনেক গাছের পাতা দ্রুত শুকিয়ে যায়।” পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা লালথাংগা চাকমা জানান, “দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে পাহাড়ি বনেও গাছপালা শুকিয়ে যেতে শুরু করে, ছোট ঝরনাগুলোর পানিও কমে যায়।” বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “বনাঞ্চলের পরিবেশ বদলে গেলে প্রাণীদের খাদ্য ও আবাসস্থলও সংকুচিত হয়। অনেক প্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়, আবার কিছু প্রজাতির জন্য নতুন পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।” সাধারণ মানুষের মধ্যেও বন সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। সিলেটের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “বন শুধু অক্সিজেন দেয় না, জলবায়ুর ভারসাম্যও রক্ষা করে। বন রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।” কক্সবাজারের কলেজশিক্ষার্থী মেহেদী হোসেন বলেন, “গাছ কাটার প্রবণতা কমাতে হবে এবং নতুন করে বন সৃষ্টি করতে হবে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চল রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, অবৈধ বন উজাড় বন্ধ, বন ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু সহনশীল সংরক্ষণ কৌশল বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তাঁরা। পরিবেশ নীতিবিদ ডক্টর সাইমা রহমান বলেন, “বন পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বন যত সুস্থ থাকবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার সক্ষমতাও তত বাড়বে। তাই বন সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহে বনাঞ্চলের এই পরিবর্তিত চিত্র শুধু পরিবেশগত উদ্বেগ নয়, এটি জীববৈচিত্র্য, পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু এবং মানবজীবনের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সময়মতো কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে বনভূমির ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়বে। তাই প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
|