টানা বর্ষণ ও ভারী বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে যশোরের ভবদহ অঞ্চল। গত ১০ জুলাই রাতভর বৃষ্টির পর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় ভোগা এই জনপদে। ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে মাছের ঘের ও আবাদি জমি।
অভয়নগর উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে উপজেলার ৫০৩ হেক্টর আয়তনের ২২০টি মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৭ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা লিপটন সরদার বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে অনেক ঘেরের পাড় পানির নিচে চলে গেছে। পানি আরও বাড়লে মাছ ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন জানান, টানা বৃষ্টিতে ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ৩৭ হেক্টর আবাদি জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পায়রা, চলিশিয়া, শ্রীধরপুর, সিদ্ধিপাশা ও প্রেমবাগ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এতে চলতি মৌসুমে আমন চাষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবদহ অঞ্চলের অধিকাংশ মাছের ঘেরের পাড় পানিতে প্লাবিত। অনেক ঘেরে মাছ রক্ষায় উঁচু করে নেট ও বাঁশের পাটা বসানো হয়েছে। মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামে বাড়ির উঠানে পানি উঠতে শুরু করেছে। ঘেরের পাড়ে চাষ করা বিভিন্ন ধরনের সবজিও নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে বিল ও খাল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘেরের পাড় উপচে পানি প্রবেশ করছে। আবার বৃষ্টি হলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
মশিয়াহাটি গ্রামের মাছচাষি রনি মণ্ডল বলেন, আগাম প্রস্তুতি হিসেবে মাছ রক্ষার জন্য নেট কিনেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো নেট বসানো সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীরা নেটের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পাল বলেন, আগের জলাবদ্ধতার চেয়েও এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এবার সিজনের প্রথমেই ভারী বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের পথে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নদী খননের কাজ শেষ হলেও বাঁধের মুখ দিয়ে পর্যাপ্ত পানি সরানো হচ্ছে না। এছাড়া ভবদহের দ্বিতীয় পানি নিষ্কাশন পথ হিসেবে পরিচিত আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কাজও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, দ্রুত আমডাঙ্গা খালের সংস্কার কাজ শুরু না হলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। একই সঙ্গে ভবদহের সব স্লুইচগেট সচল রেখে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি উজানের কোনো উপযুক্ত বিলে দ্রুত টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু না করলে ভবদহ সংস্কারের সুফল মিলবে না। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা স্থানীয় মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষি ও মৎস্য নির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ এবারও একই সংকটের পুনরাবৃত্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন।