মানুষের সভ্যতার ইতিহাস একদিকে যেমন অগ্রগতির ইতিহাস, অন্যদিকে তেমনি সীমাহীন আকাঙ্ক্ষারও ইতিহাস। মানুষ জ্ঞান অর্জন করেছে, প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে, জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেও একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—এই দৌড়ের শেষ কোথায়?
কতটা অর্জন করলে মানুষ সন্তুষ্ট হবে? কত সম্পদ, কত পরিচিতি, কত ক্ষমতা মানুষকে সত্যিকারের শান্তি দেবে?
পবিত্র কুরআনের ছোট একটি সূরা—সূরা তাকাসুর—মানবজীবনের এই গভীর সংকটকে কয়েকটি আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক বাস্তবতা এবং জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে এক গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরসমূহে উপস্থিত হও।”
(সূরা তাকাসুর: ১–২)
এই আয়াতের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—মানুষের সমস্যা সম্পদ অর্জনে নয়, বরং সম্পদের প্রতিযোগিতায় এমনভাবে ডুবে যাওয়া, যাতে সে নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যায়।
প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা: আধুনিক জীবনের এক অদৃশ্য সংকট
“তাকাসুর” শব্দটি আমাদের সামনে একটি মানসিকতার ছবি তুলে ধরে—আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার চেষ্টা, সংখ্যার অহংকার।
আজকের পৃথিবীতে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত অন্যের সাফল্যের ছবি তুলে ধরে। ফলে অনেক মানুষ নিজের জীবনের নেয়ামত উপভোগ করার বদলে অন্যের সঙ্গে তুলনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
কারও আয় বেশি, তাই আমারও আরও বেশি প্রয়োজন।
কারও বাড়ি বড়, তাই আমারটিও বড় হতে হবে।
কারও সামাজিক অবস্থান বেশি, তাই আমাকেও সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
এই প্রতিযোগিতা কখনো শেষ হয় না। কারণ মানুষের চাহিদা পূরণ হলেও “আরও চাই”–এর মানসিকতা তাকে আবার নতুন দৌড়ে ঠেলে দেয়।
ইসলাম উন্নতি নয়, উদ্দেশ্যহীন দৌড়কে প্রশ্ন করে
অনেক সময় ভুলভাবে মনে করা হয়, ধর্ম মানুষকে দুনিয়ার উন্নতি থেকে দূরে রাখে। বাস্তবে ইসলাম পরিশ্রম, জ্ঞান, ব্যবসা, উন্নয়ন ও বৈধ উপার্জনকে উৎসাহিত করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—উন্নতির লক্ষ্য কী?
যদি সম্পদ মানুষের দায়িত্ব পালনের মাধ্যম হয়, তবে তা কল্যাণের কারণ। কিন্তু যদি সম্পদ মানুষের অহংকার, অবহেলা ও আত্মবিস্মৃতির কারণ হয়, তবে সেই সম্পদই পরীক্ষায় পরিণত হয়।
সমস্যা টাকা নয়; সমস্যা হলো টাকা যখন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে যায়।
“কবর” স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের অস্থায়িত্ব
সূরা তাকাসুরের দ্বিতীয় আয়াতে কবরের কথা এসেছে। এটি মানুষের সামনে একটি চূড়ান্ত বাস্তবতা তুলে ধরে—এই জীবন স্থায়ী নয়।
মানুষ যত বড় অবস্থানে থাকুক, যত সম্পদ জমাক, একদিন তাকে থামতে হবে।
যে পদমর্যাদা নিয়ে অহংকার করেছি, তা থাকবে না।
যে সম্পদ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি, তা সঙ্গে যাবে না।
যে পরিচয় নিয়ে গর্ব করেছি, তা একসময় পিছনে পড়ে থাকবে।
মানুষের সঙ্গে থাকবে তার কর্ম, তার দায়িত্ববোধ এবং তার চরিত্র।
আসল হিসাব: আমরা কী পেয়েছি নয়, কী করেছি
সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন—
“অতঃপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(সূরা তাকাসুর: ৮)
এই আয়াত মানুষকে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
আমাদের সময় কি শুধু দুনিয়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে?
আমাদের জ্ঞান, অর্থ ও সামর্থ্য কি শুধু নিজের জন্য ছিল?
আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি?
জীবনের সাফল্য শুধু অর্জনের পরিমাণে মাপা যায় না; বরং অর্জনের ব্যবহারেই তার মূল্য নির্ধারিত হয়।
বর্তমান সমাজে সূরা তাকাসুরের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের ভোগবাদী সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো—অসন্তুষ্টি।
অনেক কিছু পাওয়ার পরও মানুষ মনে করে, আরও কিছু প্রয়োজন। কারণ সে নিজের প্রয়োজন দিয়ে নয়, তুলনা দিয়ে নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করছে।
এই জায়গায় সূরা তাকাসুর আমাদের থামতে শেখায়। প্রশ্ন করতে শেখায়—
আমি কি জীবনের প্রয়োজন পূরণ করছি, নাকি অন্তহীন প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে গেছি?
দুনিয়ার পথে চলা, কিন্তু লক্ষ্য ভুলে নয়।
জীবনে উন্নতি প্রয়োজন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নতি যদি মানুষকে তার নৈতিকতা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে সেই উন্নতি অসম্পূর্ণ।
সূরা তাকাসুরের শিক্ষা হলো—দুনিয়াকে গ্রহণ করো, কিন্তু দুনিয়ার মোহে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।
কারণ একদিন সব দৌড় থেমে যাবে। তখন প্রশ্ন হবে না—কত বেশি জমিয়েছিলে; প্রশ্ন হবে—যা পেয়েছিলে, তা দিয়ে কী করেছিলে।
এই উপলব্ধিই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন, প্রকৃত অর্থে সফল করে তুলতে পারে একজন মানুষকে।
মো: মুখলেছুর রহমান।
ইসলামী চিন্তাবিদ, সমাজচিন্তক, ও মানবাধিকার কর্মী।
সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল, সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ।