ফিরোজ মাহবুব কামাল
অপরাধ বিদ্রোহ ও গাদ্দারীর
মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে গাদ্দারীটি শুধু তাঁর ইবাদত বর্জন করার মধ্য দিয়ে ঘটে না; বরং সেটি ঘটে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। গাদ্দারীর কাণ্ড ঘটে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে নিজ দেশে পরাজিত রাখার মধ্য দিয়েও। প্রশ্ন হলো, মহান রব‘য়ের সে এজেন্ডাটি কি? ক’জন মুসলিম খবর রাখে সে এজেন্ডার? ক’জন একাত্ম সে এজেন্ডার সাথে? অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসলের উপর বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়া এবং সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার সৈনিক হওয়া। তাই ঈমানদারকে শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত নিয়ে বাঁচলে চলে না, সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়েও বাঁচতে হয়। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে ঈমানের দাবীতে একমাত্র তাদেরকেই সত্যবাদী বলা হয়েছে যাদের জীবনে জিহাদ আছে এবং সে জিহাদে জান ও মালের কুরবানী আছে। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহর বহুল ঘোষিত সে এজেন্ডাটি হলো, আ‘মিরু বিল মারুফ তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং নেহী আনিল মুনকার তথা দুর্বৃত্তদের নির্মূল। বস্তুত মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটানোর মূল কারণ হলো এ এজেন্ডার -যার উল্লেখ এসেছে সুরা আল ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে।
যে কোন মুসলিম দেশে মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে গাদ্দারীর সঠিক চিত্রটি দেখা যায় তাঁর ঘোষিত এজেন্ডাকে পরাজিত রাখার মাঝে। বাংলাদেশে সে পরাজয়টি বিশাল। দেশটিতে প্রতিষ্ঠা পায়নি তাঁর সার্বভৌমত্ব ও আইন, নির্মূল করা হয়নি দুর্বৃত্তি, প্রতিষ্ঠা পায়নি সুবিচার। সংবিধানে সার্বভৌম বলা হয়েছে আল্লাহ তায়ালার বদলে জনগণকে। এটি তো বিশুদ্ধ শিরক। সে সাথে জনগণের সাথে করা হয়েছে বিশাল প্রতারণা। জনগণের নাম ভাঙিয়ে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী -যেমনটি করেছে ফ্যাসিস্ট মুজিব ও হাসিনা। তারা জনগণকে দেয়নি কথা বলা, প্রতিবাদ করা, মিটিং মিছিল করা এবং ভোট দেয়ার স্বাধীনতা। শরিয়ার স্থান নাই আদালতে, সেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কুফুরি আইন -তাতে জ্বিনাও হালাল যদি সম্মতিতে হয়।
ব্যক্তির ঈমান ও বেঈমানী স্পষ্ট দেখা যায় কাকে সে ভালবাসে, কাকে সে ঘৃণা করে এবং কার পক্ষে সে ভোট দেয় বা কোন পক্ষে যুদ্ধ করে -সেগুলি দেখে। বিবেক ও ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় এখানেই। রোজ হাশরের বিচার দিনে এ বিষয়গুলি গুরুত্ব পাবে। যুগে যুগে মহান রব মানুষের সামনে নমরুদ, ফিরাউন, আবু জেহেল, আবু লাহাবের ন্যায় শয়তানের পক্ষের শীর্ষ দুর্বৃত্তদেরকে যেমন খাড়া করেছেন, তেমনি খাড়া করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আ:), হযরত মূসা (আ:), হযুরত মহম্মদ (সা:)‘য়ের ন্যায় মহান রব‘য়ের পক্ষের শীর্ষ নেতাদেরও। ফলে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগেই মানুষ জানতে পারে সে কোন পক্ষের সৈনিক বা সমর্থক ছিল। পরীক্ষার সে প্রক্রিয়া এ যুগেও চালু রয়েছে। আগামীতেও থাকবে। তাই এ যুগেও দেখা যায় শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাদের ন্যায় শীর্ষ ফ্যাসিস্ট ও শীর্ষ দুর্বৃত্তদের। ঈমানদার তো তারাই যারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর এ শত্রুদের চিনতে ভুল করে না। এবং তারা ভুল করেনা তাদের চিনতেও যারা ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট এবং পৌত্তলিক পক্ষের। তখনই চরম বেঈমানী হয় এবং বিবেকের মৃত্যু ঘটে যখন ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তকে খোদার আসনে বসানো হয় এবং মুজিবের ন্যায় ফ্যাসিস্ট, প্রতারক, ভারতের এজেন্ট এবং পাকিস্তান ভাঙার নায়ককে একটি মুসলিম দেশের নেতা, পিতা ও বন্ধুর আসনে বসানো হয়। বেঈমানী শুধু মূর্তিপূজায় ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে মুজিবের ন্যায় এক শীর্ষ অপরাধীক এভাবে সম্মানিত করার মধ্য দিয়। বরং এটিই হলো সবচেয়ে চরম বেঈমানী ও বিবেকহীনতা। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে এরূপ বেঈমানী ও বিবেকহীনতার কারণে, -চুরি ডাকাতি, খুন জ্বিনার কারণে নয়। প্রতিটি ঈমানদারের উপর ঈমানী দায় তো এমন দুর্বৃত্তেদের নির্মূল -যেমন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ নির্মূল করেছিলেন আবু জেহল ও আবু লাহাবদের । একটি দেশে দুর্বৃত্তদের শাসন ও দুর্বৃত্তির প্লাবন দেখেই বলা যায় দেশটিতে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদ হয়নি।
পাপ শুধু খুন, ধর্ষণ, চুরি ডাকাতি, প্রতারণা ও সন্ত্রাস নয়, বরং গুরুতর বড় পাপ হলো মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে গাদ্দারী ও বিদ্রোহ। বহু পৌত্তলিক এবং নাস্তিকও খুন, ধর্ষণ, চুরি ডাকাতি, প্রতারণা ও সন্ত্রাসের ন্যায় অপরাধগুলি করে না। কিন্তু সে জন্য তারা জান্নাত পাবে না। মুসলিমদের কাজ তাই শুধু এ ধরণের অপরাধ থেকে বাঁচা নয়, বরং বাঁচতে হয় তাদের উপর অর্পিত মূল দায়িত্বটি পালন করে। সে প্রধান দায়িত্বটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার জিহাদ। এবং সে পবিত্র জিহাদে নিজের অর্থ, মেধা, শ্রম, রক্তসহ সর্ববিধ সামর্থ্যের বিনিয়োগ। ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় এখানেই। যারা মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে বাঁচে – একমাত্র তাদেরকেই আখেরাতে পুরস্কৃত করা হয় জান্নাত দিয়ে। এজন্যই মুমিনের জীবন নিছক নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়না, শেষ হয় না স্রেফ মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে; বরং তাকে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়। নবীজী (সা:) তো সেটিই করেছিলেন। তাছাড়া সেরূপ একটি রাষ্ট্র না গড়লে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া শুধু কিতাবেই থেকে যায়। এবং কিতাবে থেকে যায় ইসলামের শিক্ষা নীতি, জনকল্যাণ নীতি, সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তি নির্মূলের ন্যায় মহান আল্লাহ তায়ালার মূল এজেন্ডা। কারণ এগুলি মসজিদ মাদ্রসায় প্রতিষ্ঠা দেয়ার বিষয় নয়, সে জন্য রাষ্ট্র লাগে। তাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে পবিত্র কুর’আন যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে -সেটিই ব্যর্থ হয়ে যায়। তখন বিজয় পায় শয়তান ও তার অনুসারীদের এজেন্ডা। আর তাতে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে। কোন সুস্থ ঈমানদার কি ইসলামের এ পরাজয় কি মেনে নিতে পারে? পরিতাপের বিষয় হলো, সে গাদ্দারী নিয়ে বাঁচাই মুসলিম জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র গড়েছে। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে খণ্ডিত করার অপরাধ দিয়ে। বস্তুত সেটি ছিল ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। সে অপরাধের সাথে জড়িত ছিল মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা। তবে তারা সেটি নিজ শক্তিতে গড়েনি; ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে নিজ শক্তিতে একটি থানাও স্বাধীন করতে পারিনি। বরং গড়েছে ভারতের ন্যায় হিন্দুত্ববাদী শক্তির রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক সাহায্য নিয়ে। ভারত কোন সেবা সংস্থা নয়, বরং দেশটির রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডা। আছে আগ্রাসী এজেন্ডাও। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের বিনিয়োগ এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় এজেন্ডার প্রতিষ্ঠা দেয়া, বাঙালি মুসলিমদের কল্যাণ দেয়া নয়। বাঙালি মুসলিমদের একাত্তরের অপরাধ, তারা ভারতের ন্যায় ইসলাম ও মুসলিমের শত্রু রাষ্ট্রকে বিজয়ী করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বুকে তাদের দাপট বাড়িয়েছে। একাত্তরের এ অপরাধ কর্মে নেতৃত্ব দিয়েছিল ইসলাম বিবর্জিত ফ্যাসিবাদী মুজিব এবং তার দুর্বৃত্ত সাঙ্গপাঙ্গরা। ১৯৭১‘য়ে ভারতকে বিজয়ী না করলে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে আজ ভারতের দিকে তাক করা পারমানবিক বোমা ও মিজাইল থাকতো। তখন ভারত পেত না সীমান্তে বাঙালি মুসলিম হত্যা, ৫৪ নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে পানি কেড়ে নেয়ার সুযোগ।
অপরাধের রাজনীতিই ছিল মুজিবের রাজনীতি
মুসলিমের প্রতিটি কর্মের মধ্য পবিত্র নিয়ত থাকতে হয়। তার প্রতিটি কর্মের মূল্যায়ন হয় সে নিয়তের ভিত্তিতে -যেমনটি বলা হয়েছে বোখারী শরিফের প্রথম হাদীসে। নিয়তটি হতে হয় আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করা। ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্যই মহান রব’য়ের দেয়া। ফলে সে সামর্থ্যের ব্যবহারে ও প্রয়োগে লক্ষ্য হতে হয় মহান রব’য়ের এজেন্ডা পূরণ। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের এটিই হলো একমাত্র পথ। একমাত্র তখনই ঈমানদারের প্রতিটি কর্ম ইবাদতে পরিণত হয়। তাঁর নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের মাঝে যেমন মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার নিয়েত থাকে, সেরূপ নিয়েত থাকে তাঁর রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধ বিগ্রহে। তখন তাঁর রাজনীতি কখনোই জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, রাজতন্ত্রী বা কোন মতবাদী এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়না। বরং পরিচালিত হয় মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের ভাবনা থেকে। তখন সে রাজনীতিতে ভিন ভাষা ও ভিন বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে নির্মূল, ধর্ষণ ও ঘর-বাড়ি দখলের এজেন্ডা থাকে না -যেমনটি দেখা গেছে বাঙালি ফ্যাসিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদবর বিহারি বিরোধী গণহত্যার রাজনীতিতে।
মুমিনের নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের ন্যায় ইবাদতের মাঝে যেমন নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতের পূর্ণ অনুসরণ দেখা যায়, তেমনি পূর্ণ অনুসরণ দেখা যায় তাঁর রাজনীতিতেও। তখন দৃশ্যমান হয় মহান রব‘য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করায় মুমিনের তাড়না। এজন্যই ঈমানদার কখনোই কোন রাজতন্ত্রী, ফ্যাসিবাদী বা জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার রাষ্ট্রের সৈনিক হয়না, বরং তাঁর জিহাদটি হয় নবীজী (সা:)’য়ের ন্যায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা নিয়ে। জিহাদের রাজনীতি এজন্যই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের ন্যায় ইবাদত যতই করা হোক, সে ইবাদত মহান রব’য়ের এজেন্ডার সে বিজয়টি দেয়না। এজন্যই মহান রব তাঁর প্রিয় শহীদদের নির্বাচন করেন জিহাদের ময়দান থেকে -যারা ঘোষণা এসেছে সুরা আল ইমরানের ১৪০ নম্বর আয়াত থেকে। রাজনীতি যদি জিহাদের রাজনীতি না হয়, তবে সেটি অবশ্যই অপরাধের হারাম রাজনীতিতে পরিণত হয় -যেমনটি হয়েছিল মুজিব-হাসিনার ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। এ রাজনীতির যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে। মুসলিমের প্রতিটি কর্ম যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি হালাল হতে হয় তার রাজনীতিও। নইলে মূর্তি পূজা যেমন জাহান্নামে নেয়, তেমনি জাহান্নামে নেয় হারাম রাজনীতিও। পরিতাপের বিষয় হলো মুসলিমগণ জ্বিনা,মদ্য পান ও শুকরের মাংস খাওয়াকে যতটা ঘৃনা করে, ততটা ঘৃণা করে না রাজতন্ত্রী, জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী ও সেক্যুলারিজমের হারাম রাজনীতিকে। অথচ মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি, পরাজয় ও গোলামীর ন্যায় সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতিগুলি হারাম পানাহারের কারণে হয়নি, হয়েছে হারাম রাজনীতির কারণে। হারাম পানাহার ও জ্বিনা কিছু মানুষকে জাহান্নামের নেয়, অথচ হারাম রাজনীতি পুরা রাষ্ট্রকে জাহান্নামের বাহনে পরিণত করে। সেটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশাসন, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আইন আদালত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে।
মুজিব ও তার অনুসারীদের বেশির ভাগ নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও তারা আদৌ নবীজী (সা:)’য়ের অনুসারী ছিল না। ফলে তাদের লক্ষ্য ছিল না, নবীজী (সা:) যেরূপ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিলেন সেরূপ একটি রাষ্ট্রের নির্মাণ। বরং তারা বেছে নিয়েছিল কাফিরদের ন্যায় ইসলামী চেতনাশূণ্য এক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের নির্মাণ। রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকে ইসলাম থেকে দূরে রাখাই ছিল তাদের রচিত সংবিধানের মূল নীতি। সে ইসলামবিরোধী নীতিকে তারা বলে সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে পেশ করা হলেও তথাকথিত সেক্যুলার রাষ্ট্রের যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে -যেমনটি দেখা গেছে মুজিব ও হাসিনার শাসনামলে। মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলিমের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ ও সবচেয়ে বড় গাদ্দারী। গাদ্দারী এখানে নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতের সাথেও। নবীজী (সা:) যে রাষ্ট্রটি নির্মাণ করেছিলেন এবং ১০টি বছর যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসে যে সূন্নত তিনি রেখে যান -সেটির অনুসরণ প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। এ প্রসঙ্গে সুরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াতে মহান রব’য়ের ঘোষণা: যারা রাসূলকে অনুসরণ করে, তারাই অনুসরণ করে আল্লাহকে। তাই নবীজী (সা)‘য়ের রাজনীতির সূন্নতের অনুসরণ না করলে চরম বেঈমানী হয়। কারণ, মুসলিম হওয়ার জন্য ফরজ শুধু মহান আল্লাহ তায়ালাকে বিশ্বাস করা নয়, পদে পদে অনুসরণ করতে হয় নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতকেও। নইলে প্রচণ্ড বেঈমানী হয়। সে বেঈমানী ব্যক্তিকে মুনাফিকে পরিণত করে। যেসব বাঙালি মুসলিম শেখ মুজিবকে নেতা, পিতা ও বন্ধুর আসনে বসিয়েছে, তাদের গাদ্দারীটি মূলত তাদের সে ঈমানী দায়বদ্ধতার সাথে। ইসলামচ্যুত সেক্যুলারিস্ট নেতাদের অনুসরণের এটিই বিপদ, ইসলামের সাথে গাদ্দারী তখন সহজাত হয়ে যায়। আল্লাহর দ্বীনের শত্রুগণ দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলে মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে গাদ্দারী তখন জনগণের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। তখন মুজিব ও হাসিনার পতন হলেও ইসলামের বিজয় আসে না। তখন অন্য নামে ইসলামের অন্য শত্রুরা জনগণের ভোটে ক্ষমতা আসে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তো সটিই হয়েছে। ফলে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার বিচারের বিরুদ্ধে শাসক দলের সে একই বয়ান শোনা যাচ্ছে -যা শোনা গেছে মুজিব ও হাসিনার মুখে ।
এমন কি পবিত্র ক্বাবার ইমামের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রের ইমাম। নামাজে ইমাম ভূল করলে সে নামাজ পুণরায় পড়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের ইমাম ভূল করলে সমগ্র জাতিকে শত্রুর হাতে পরাজিত ও পরাধীন হতে হয়। তখন সে নাশকতার কোন প্রতিকার থাকে না। যুগ যুগ বাঁচতে হয় সে নাশকতার আযাব বহন করে। ১৯৭১’য়ে তো সেটিই হয়েছে। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারতীয় অধীনত এক গোলাম রাষ্ট্রে। সেরূপ এক বিপর্যয় এসেছির ১৭৫৭ সালে পলাশীর ময়দানে, তখন ব্রিটেশের হাতে বাংলার স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছিল ১৯০ বছরের জন্য।
মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ইমামের আসনে বসেছিলন খোদ নবীজী (সা:)। তাঁর ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন হযরত আবু বকর (রা:), হযরত উমর (রা:), হযরত উসমান (রা:) ও হযরত আলী (রা:)’র ন্যায় জান্নাতের সার্টিফিকেটধারী শ্রেষ্ঠ সাহাবী। তাই সে পবিত্র আসনে কি মুজিবের ন্যায় ইসলামচ্যুত খুনি, দুর্বৃত্ত, ফ্যাসিস্ট ও হিন্দুত্ববাদী ভারতের এজেন্টকে বসানো যায়? অথচ বাংলাদেশে তো সে অপরাধের কাণ্ডটিই ঘটেছে। এজিদের ন্যায় কোন দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের ইমামের আসনে বসলে কি করতে হবে -সে সূন্নত নবীজী (সা:) দেখিয়ে যাননি। কিন্তু সে সূন্নত রেখে যান তাঁর মহান নাতি এবং জান্নাতের যুবনেতা ইমাম হোসেন (রা:)।
মুসলিমের ঈমানী দায়টি বিশাল। প্রতিটি মুসলিম হলো ধর্মচর্চা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ জীবন ও জগতের সর্বক্ষেত্রে মহান রব’য়ের খলিফা তথা প্রতিনিধ। তাই তাকে শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ-যাকাতে ঈমানের পরিচয় রাখলে চলে না, ঈমানের প্রবল প্রকাশ ঘটাতে হয় রাষ্ট্র-নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনাতেও। এটিই হলো ইবাদতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাত। সমাজে ইসলাম তথা আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে সেটি নির্ভর করে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প কতটা সফল হলো তার উপর। এটিই পবিত্র জিহাদের খাত। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি সফল হলে রাষ্ট্রের বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও তার জনশক্তি তখন নেক আমলের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্র জুড়ে নেক আমলের জোয়ার আসে। আসে শান্তি ও সমৃদ্ধি। রাষ্ট্র তখন জান্নাতের বাহনে পরিণত হয়। নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের শাসনামলে তো তাই হয়েছিল। ৪/৭/২০২৬