নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে একটি বেশ আলোচিত বিষয় ছিল, চীন ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। তখন অনেকেই এটাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচনা করেননি। তবে অধুনাকালে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এ কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, সেই পূর্বাভাস মোটামুটি সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
আগামী পঞ্চাশ বছরের চিত্র তো আরও নাটকীয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির তালিকায় থাকবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং নাইজেরিয়া। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকার দিকে। বিশেষভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে উঠছে নতুন প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র।
এই পরিবর্তনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক সম্ভাবনাময় বাস্তবতার মুখোমুখি। আমাদের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, মধ্যম বয়স মাত্র ২৬—যা একটি বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই সুযোগ অনন্তকাল খোলা থাকবে না; আগামী দুই দশকের মধ্যেই এই জানালা সংকুচিত হতে শুরু করবে বলে অনেকের ধারণা।
সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি ছিল মূলত সস্তা শ্রমে তৈরি পোশাক শিল্পের আয় এবং প্রবাসী রেমিট্যান্স। এটি ছিল একধরনের “প্রথম রকেট স্টেজ”—যা অর্থনীতিকে প্রাথমিকভাবে উপরে তুলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে দ্বিতীয় ধাপ কী হতে পারে?
এই দ্বিতীয় ধাপই হলো আসল রূপান্তর—যেখানে একটি দেশ শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, উৎপাদন, এবং উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্পের দিকে যায়। অটোমেশন এবং রোবোটিক্সের যুগে এই ধাপ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি শুধু কঠিনই নয়; অসম্ভব ও বটে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাদের সস্তা শ্রমনির্ভর শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকতে পরামর্শ দিয়েছিল। তারা সে পরামর্শকে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুৎসই মনে করেননি। বরং তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিত শিল্পনীতি, শিক্ষা বিনিয়োগ এবং উৎপাদন খাতে কৌশলগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মাত্র দুই দশকের মধ্যে একটি শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পার্থক্য সম্পদের নয়—পার্থক্য কৌশল ও বাস্তবায়নের। উন্নয়নকে যদি শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা অনেক সময় দিকহীন প্রবৃদ্ধিতে পরিণত হয়। পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্র এখানে কেবল পর্যবেক্ষক ছিল না; বরং সক্রিয় পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী ছিল।
তাই মূল প্রশ্নটি আজ আর সম্ভাবনার নয়, বরং সক্ষমতার। বাংলাদেশ কি এই আঞ্চলিক রূপান্তরের অংশ হতে চেষ্টা করবে, নাকি দ্রুত এগিয়ে যাওয়া এশিয়ার মাঝখানে একটি স্থবির অর্থনীতি হয়ে থাকবে- এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেই নিতে হবে।
বাংলাদেশ যদি শিক্ষা সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শ্রমশক্তির পূর্ণ অংশগ্রহণ, এবং শিল্পায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে দেশের উন্নয়নের ধারায় তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশা করি।
সুযোগ একবার হারালে, তা যে দ্বিতীয়বার সহজে ফিরে আসে না- এটাই ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
মো: মুখলেছুর রহমান।
অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও কলামিস্ট