রবিবার, জুলাই ১২, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * ভারী বৃষ্টিতে কয়েক অঞ্চলে বন্যার শঙ্কা   * সাতক্ষীরা সীমান্তে গুলি ছুড়ল বিজিবি, পালালেন দুজন ভারতীয়   * সোমবার চট্টগ্রাম বাদে সব বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষা হবে   * নীলফামারীতে ট্রাকচাপায় মা ও দুই সন্তানসহ নিহত ৪   * ফের কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এলো মৃত ইরাবতী ডলফিন   * সরকার পারছে না, এখন দোষ দিয়ে লাভ নেই : বন্যা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম   * বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের আরও ১০ জেলা   * চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত   * ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসায় বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে: তারেক রহমান   * প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকার উদ্ধার-ত্রাণ-পুনর্বাসনের কাজ করে যাচ্ছে  

   মতামত
সংকটে সমাধান: এলামনাই শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
  Date : 12-07-2026

মনিরুজ্জামান তুহিন, ইবি প্রতিনিধি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সবুজ চত্বর, ডায়না চত্বর কিংবা মফিজ লেকের পাড়—প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর আবেগ, উচ্ছ্বাস আর সোনালী দিনগুলোর স্মৃতি। কিন্তু সময়ের আবর্তে প্রিয় এই বিদ্যাপীঠ যখনই কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বুক কেঁপে ওঠে এর প্রাক্তন বা এলামনাই শিক্ষার্থীদের। ক্যাম্পাস ছেড়ে সুদূর কর্মব্যস্ত জীবনে চলে গেলেও, নাড়ির টানে তারা বারবার ফিরে তাকান এই আঙিনায়। তাদের চোখে ইবি শুধু একটি সার্টিফিকেট অর্জনের স্থান নয়, বরং এক চিরন্তন আবেগ, যার প্রতিটি সংকটে সমাধানের পথ দেখাতে পারে এলামনাইদের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা আর দিকনির্দেশনা।

গবেষণা ও প্রশাসনিক সংস্কারই পারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন উচ্চতায় নিতে–

স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়—এটি আমাদের গর্ব, আমাদের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সম্ভাবনা ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো সেই গতিতে এগোতে পারেনি, যেভাবে তুলনামূলকভাবে নবীন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টি আমাকে সবসময় ভাবায়। আমি প্রায় সাত বছর বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ-এ অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার বিশ্বাস, এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।
বর্তমান বিশ্বে গবেষণাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আন্তরিকভাবে গবেষণা করতে আগ্রহী হলেও সে তুলনায় গবেষণাখাতে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত। তবুও অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন সরকারি ও বাহ্যিক ফান্ড সংগ্রহ করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত গবেষণা ফান্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে তারা আরও উন্নত গবেষণা করতে সক্ষম হবেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে এগিয়ে নিতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় গবেষণাগার থাকলেও পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে, যা গবেষণার পরিবেশকে ব্যাহত করছে। এ বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। এছাড়া কিছু বিভাগে সেশনজট শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে। সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমন্বিত ও একীভূত একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা গেলে—যেখানে একই সময়ে ভর্তি কার্যক্রম, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করা হবে—তাহলে শিক্ষার্থীরা অনেক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবে এবং শিক্ষা কার্যক্রমও গতিশীল হবে। প্রশাসনিক সেবার ক্ষেত্রেও আরও জবাবদিহিতা ও মনিটরিং প্রয়োজন। সনদপত্র উত্তোলনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই অযথা হয়রানি ও বিলম্বের মুখোমুখি হতে হয়। “লাঞ্চের পরে আসেন” ধরনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সময়মতো সেবা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। সবশেষে বলতে চাই, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে তার শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা অপরিসীম। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, এবং প্রত্যেকের মধ্যে দায়িত্বশীল ও সময়নিষ্ঠ কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা। তাহলেই আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে—এটাই প্রত্যাশা।

— আবু রেজা
সাবেক শিক্ষার্থী (২০১৭-১৮), বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। লেকচারার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

বিশ্বমঞ্চের মুখোমুখি হতে হলে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি–

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে হাজারো স্মৃতির ১৭৫ একরের এই ক্যাম্পাসের প্রতি সবসময় এক গভীর টান অনুভব করি। কিন্তু প্রাণের বিদ্যাপীঠের কোনো নেতিবাচক খবর অনলাইন বা সংবাদমাধ্যমে দেখলে বুকটা ব্যথিত হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাস ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে পদার্পণ করে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, যা প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে তাল মেলাতে দ্রুত সংস্কার করা উচিত বলে আমি মনে করি। সবচেয়ে বড় অভাবটি হলো আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনার সাথে আমাদের মেলবন্ধনের ঘাটতি, শিক্ষকদের পিএইচডি বা পোস্ট-ডক সংকট, গবেষণার পরিবেশের অভাব এবং পাঠ্যক্রমে বৈচিত্র্যের অনুপস্থিতি। এই অচলাবস্থা কাটাতে বার্ষিক বাজেটে গবেষণায় বড় বরাদ্দ দেওয়া, শিক্ষকদের পদোন্নতিতে আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করা এবং তাদের আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ অর্জনে লজিস্টিক সাপোর্ট সহজ করা প্রয়োজন। একই সাথে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ও দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সিলেবাসের আধুনিকায়ন করে বহির্বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ক্রেডিট ট্রান্সফার বা যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৭৫ একরকেই নিজেদের পৃথিবী ভাবার এক ধরনের অনিচ্ছাকৃত কূপমণ্ডূকতা কাজ করে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা বাইরের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সম্পর্কে কম ওয়াকিবহাল থাকায় ক্যারিয়ারের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধানে ক্যাম্পাসে একটি আধুনিক ‘ক্যারিয়ার সেন্টার’ গড়ে তুলতে হবে, যা প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের সিভি রাইটিং, ইন্টারভিউ স্কিল ও চাকরির প্রস্তুতিতে গাইড করবে। দেশ-বিদেশের সফল অ্যালামনাইদের সাথে শিক্ষার্থীদের সরাসরি কানেকশন তৈরি, নিয়মিত ক্যারিয়ার সেমিনারের আয়োজন এবং ডিবেট, লিডারশিপ ও কোডিং ক্লাবের মতো এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিসে তাদের উৎসাহিত করা জরুরি।
আবাসন সংকট ও হলের সিট কেন্দ্রিক রাজনীতি সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেসে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করছে। এই সংকট কাটাতে ছাত্ররাজনীতির প্রভাবমুক্ত হয়ে হল প্রভোস্টদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মেধা ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে অনলাইন প্রক্রিয়ায় সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে নতুন হল নির্মাণ এবং ডাইনিং ও রিডিং রুমের পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষকদের অতি-রাজনীতি এবং রেজাল্ট বা থিসিসের প্রলোভন দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করার মতো অনৈতিক প্রবণতা বন্ধে কঠোর ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, পাবলিকেশন ও ডেমো ক্লাসের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক হতে হবে এবং ফলাফলে পক্ষপাতিত্ব রোধে ‘থার্ড এক্সামিনার’ দ্বারা খাতা স্ক্রুটিনির ব্যবস্থা করা দরকার। সর্বোপরি, ক্যাম্পাসে অবাধে বহিরাগত প্রবেশ এবং আড্ডা পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করাসহ মাদকের ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই মূল গেটগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ও আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করা, বহিরাগতদের জন্য এন্ট্রি সিস্টেম চালু করা এবং পুরো ১৭৫ একরকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে সার্বক্ষণিক মনিটর করতে হবে। সন্ধ্যায় প্রক্টরিয়াল বডির নিয়মিত টহল জোরদার করার পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। উপাচার্যসহ বর্তমান প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তনদের সমন্বিত উদ্যোগই পারবে ইবি-কে তার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক গৌরবময় স্থানে পৌঁছে দিতে।

–মারিয়া সুলতানা
সাবেক শিক্ষার্থী (২০১৪-১৫)
আইন বিভাগ।
সিভিল জজ, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মাদারীপুর।

শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন–

বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুষদকে সময়োপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা-গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসনের দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি। বর্তমানে বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন অনুষদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করা জরুরী। Artificial Intelligence, Business Analytics, Data Science, Financial Technology, Digital Marketing, Supply Chain এবং Entrepreneurship এর মতো আধুনিক বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, গবেষণা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা এবং গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে (Industry-Academia Linkage) দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলে নিয়মিত ইন্টার্নশিপ, কর্পোরেট ট্রেনিং, সেমিনার, ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং জব প্লেসমেন্টের সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থ, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, Bloomberg/Financial Database, ডিজিটাল লাইব্রেরি, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এছাড়া সেশনজটমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ, দ্রুত ফলাফল প্রকাশ, স্বচ্ছ প্রশাসন, মেধাভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস, নতুন উপাচার্যের নেতৃত্বে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এর বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন অনুষদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাবে এবং দক্ষ, নৈতিক ও কর্মমুখী ব্যবসায়ের নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

–মো. তুহিন মিয়া
সাবেক শিক্ষার্থী (২০০৮-০৯)
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ।
যুগ্ম-পরিচালক,বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রধান কার্যালয়, ঢাকা।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে প্রয়োজন কার্যকর অ্যালামনাই-স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক–

আমি মনে করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল শক্তি শুধু তার অবকাঠামো বা ফলাফলে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, গবেষণামুখী মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যেই নিহিত থাকে। ক্যাম্পাসের প্রতি আমাদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই; বরং আমরা চাই ক্যাম্পাসটি আরও বেশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণামুখী হয়ে উঠুক। বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, গবেষণা কিংবা বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে আগ্রহী হলেও সঠিক দিকনির্দেশনা বা যোগাযোগের অভাবে পিছিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর Alumni–Student Networking Platform তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা সহজেই বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বা গবেষণায় যুক্ত এলামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। এতে শিক্ষার্থীরা গবেষণা, স্কলারশিপ, গ্র্যাজুয়েট স্কুল প্রস্তুতি ও ক্যারিয়ার নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।
আমার বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি এবং এলামনাইদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা গেলে ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারবে।

রুবাইয়া তাসমিন
সাবেক শিক্ষার্থী(২০১৭-১৮)
ফার্মেসি বিভাগ।
পিএইচডি শিক্ষার্থী, বায়োলজি বিভাগ,  টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি,যুক্তরাষ্ট্র

ছুটি হ্রাস ও একীভূত একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন জরুরি–

সূচনালগ্ন থেকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সমস্যায় জর্জরিত। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হল সেশন জট, হলের সিট সংকট, ক্লাসরুম সংকট, শিক্ষক সংকট। আমি মাস্টার্স শেষ করেছি দুই বছরে। অথচ কোনো ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ ছিলো না। ছিলো শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাব। বিগত সময়ে দেখেছি কোনো ধরণের সমীক্ষা ও সুযোগ সুবিধা দেয়া বাদেই কথায় কথায় বিভাগ খুলতো। একসময় মনে হত এসব বিভাগ কি আসলেই শিক্ষার উন্নয়নের জন্য খোলা হচ্ছে নাকি ব্যবসার উদ্দেশ্যে খোলা হচ্ছে! 
সাবেক ছাত্র হিসেবে স্যারের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সেশন জট দূরীকরণে ক্যাম্পাসের বার্ষিক ছুটি কমিয়ে আনুন, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এত একাডেমিক ছুটি হাস্যকর লাগে। পাশাপাশি ফ্যাকাল্টি ভিত্তিক বা পুরা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডারের আওতায় এনেন দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণ করা করুন। সব বিভাগ এই ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে বাধ্য থাকবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কিছু কিছু যৌক্তিক গণআবদার থাকে। যেমন, বর্তমানে বিশ্বকাপ ফুটবল বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা, ফেব্রুয়ারী মাসে নিয়মিত বই মেলার আয়োজন করা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের একটা আবদার থাকে। এসব আবদার পূরণে প্রশাসনকে আন্তরিক হতে হবে। এছাড়া ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ বাসের ফিটনেস নাই। অবিলম্বে ফিটনেসবিহীন সব বাসের রুট পার্মিট বাতিল করে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দরকার। সাবেক ছাত্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির স্বীকার হতে হয় সার্টিফিকেট উত্তোলনে। সার্টিফিকেট, মার্কশীট ইত্যাদি ডকুমেন্টস দেয়ার দায়িত্বে যারা থাকে উনাদের বেশিরভাগ টাইমেই অফিসে না পাওয়া, পাওয়া গেলেও মন্থরগতি, সার্টিফিকেট উত্তোলনের আবেদন রসিদ গায়েব হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ। এবিষয়ে অতীতের কোনো প্রশাসন সমাধান করতে পারেনি। কি এক অজানা কারণে সার্টিফিকেট দেয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের হাতে সাবেক ভিসি স্যার সহ প্রশাসন জিম্মি থাকতো জানিনা। এই বিষয় সমাধানে বর্তমান ভিসি স্যারের আন্তরিক সহযোগিতা ও পদক্ষেপ কামনা করছি।

সাবেক শিক্ষার্থী (২০১৭-১৮) 
আশহাদুল ইসলাম চৌধুরী। 
আইন বিভাগ।
অ্যাডভোকেট এবং ইনকাম ট্যাক্স প্র‍্যাক্টিশনার, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা

বৈশ্বিক বাস্তবতায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি–

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি তার একাডেমিক ও গবেষণার পরিবেশ। কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আজ তীব্র শিক্ষক সংকট, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, গবেষণার সুযোগের অভাব এবং ISSN, DOI বা Scopus ইনডেক্সড আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল না থাকার মতো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এছাড়া বিভাগীয় ওয়েবসাইটের আধুনিকায়ন না হওয়া, নতুন বিভাগের অকার্যকারিতা, শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তি ও আন্তর্জাতিক এনজিওর সাথে সহযোগিতার অভাব, আধুনিক কনফারেন্স রুম বা আইসিটি সমৃদ্ধ শ্রেণীকক্ষের ঘাটতি এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের অপর্যাপ্ততা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
সব সমস্যার সমাধান একসাথে সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ইসলামিক বিষয়গুলো মূলত আরবিতে রচিত হওয়ায় নিয়োগ পরীক্ষায় আরবি ও ইংরেজিতে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব ও ষড়যন্ত্র ছাড়া প্রার্থীদের গবেষণামূলক কাজ ও বিভাগের কৃতী অ্যালামনাইদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভাইভা নিতে হবে। অনুষদ ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শিক্ষকদের প্রোফাইল ও গবেষণা কাজের লিংকসহ একটি উন্নত ওয়েবসাইট তৈরি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্ম পিডিএফে সংরক্ষণ, Scopus ইনডেক্সড জার্নালে প্রকাশের জন্য পুরস্কৃত করা এবং একটি সক্রিয় অ্যালামনাই পোর্টাল চালু রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনজিওগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া, নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং সিলেবাসের বাইরে আকীদাহ, নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইসিটির মতো বিষয়ে ট্রেনিং গ্রুপ তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ষাণ্মাসিক গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করা সময়ের দাবি। পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার IIUM, অক্সফোর্ডের OCIS, আল-আজহার বা মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের মডেল অনুসরণ করে মানসম্মত কোর্স ডিজাইন করতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্যায়ে থিসিস বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি আরবি ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতায় জোর দেওয়া জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে কার্যকর করতে সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে হবে। এর জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ক্লাব (যেমন: DUMUNA, ওআইসি ইয়ুথ অর্গানাইজেশন), সিরাত স্টাডি, সাধারণ জ্ঞান, ল্যাঙ্গুয়েজ ও ডিবেটিং ক্লাব (আরবি, ইংরেজি, বাংলা) গঠন করে আরব ও ইউরোপের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাইটার, ক্যালিগ্রাফি, ড্রামা, সাংবাদিকতা, সিভিলাইজেশন রিসার্চ ও পিয়ার-রিভিউড রিসার্চ ক্লাবের মতো পেশা-ভিত্তিক ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং প্রতি বছর বাধ্যতামূলক শিক্ষাসফরের আয়োজন করা দরকার। বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে `স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ` ও ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের আলোচনা করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশে সহায়তা করা উচিত। সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির আদলে অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি থিসিস ডিফেন্স কনফারেন্সের আয়োজন করতে হবে এবং সব থিসিস বিভাগীয় লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুতই একটি বিশ্বমানের আদর্শ বিদ্যাপীঠে রূপান্তরিত হবে।

সাবেক শিক্ষার্থী (২০০৬-০৭)
মো: রিদওয়ান উল্লাহ
দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ (চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেলিস্ট)
প্রভাষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC), দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।



  
  সর্বশেষ
কুবিতে নানা আয়োজনে `জুলাই প্রতিরোধ দিবস` পালিত
গুলশান লেকের পানি সংযোগ সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত, ভেঙে যাচ্ছে সড়ক
আপ্লুত পূর্ণিমা, জানালেন কৃতজ্ঞতা
‘শেখ হাসিনার বিচার বাস্তবায়ন না হলে বিএনপির পতন ঘটাবো’



প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত ।
ফোন: ০২৪১০৭০৯৯৬ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪

Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com