ফিরোজ মাহবুব কামাল
বাঙালির নৈতিক রোগ ও চেতনার অসুস্থতা
বাংলাদেশে প্রচুর বিতণ্ডা যেমন স্বাধীনতা ও পরাধীনতার সংজ্ঞায়ন নিয়ে, তেমনি চরম বিতণ্ডা স্বাধীনতা দিবস নিয়েও। অনেক বাঙালি মুসলিমের কাছে যা স্বাধীনতা, অনেকের কাছে সেটিই নিরেট পরাধীনতা। যারা জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট, হিন্দুত্ববাদী ও ইসলামী চেতনাশূণ্য, তাদের কাছে ১৯০ বছরের গোলামীর পর যে স্বাধীনতা অর্জিত হলো ১৯৪৭’য়ের ১৪ আগস্ট -তার কোন উল্লেখ নাই। সে স্বাধীনতার কোন মূল্যায়নও নাই। যেন বাঙালির স্বাধীনতার শুরু ১৯৭১ থেকে। বাঙালির মুসলিম ইতিহাসে পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর যে প্রকৃত স্বাধীনতার যুগ -তাদের লেখালেখি ও আলোচনায় তারও কোন উল্লেখ নাই। অথচ পাকিস্তানের ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, ২ জন রাষ্ট্র প্রধান, ৩ জন স্পীকারসহ বহু মন্ত্রী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানী। এ থেকে সুস্পষ্ট হয় তাদের চেতনার অসুস্থতা ও ইসলাম বিদ্বেষ। এসব বাঙালিরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও চিন্তা চেতনায় ভারতপন্থী; ভারতের বয়ানই তাদের বয়ান। এবং ভারতের এজেন্ডাই তাদের এজেন্ডা; এবং ভারতের যুদ্ধই তাদের যুদ্ধ।
ভারতের কাছে পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং তার স্বাধীন অস্তিত্ব যেমন শুরু থেকেই স্বীকৃতি পায়নি, তেমনি স্বীকৃতি পায়নি ভারতপন্থী এসব সেক্যুলার ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও বামধারার বাঙালিদের কাছেও। রাজনীতির অঙ্গণে ইসলাম যেমন তাদের কাছে অতি অসহ্য, তেমনি অসহ্যকর হলো ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত কোন রাষ্ট্র। তাই মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র হওয়াতে পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল তাদের কাছে অতি অসহ্যকর। তাই দেশটির ধ্বংসে তারা কোয়ালিশন গড়েছিল ভারতীয় পৌত্তলিকদের সাথে। বস্তুত তাদের এজেন্ডাই ছিল ভারতের এজেন্ডা, এবং ভারতের এজেন্ডা ছিল তাদের এজেন্ডা। তাই ভারতের সাথে তাদের কোয়ালিশন আজও এতো অটুট। খুনি হাসিনা এবং তার শত শত সহযোগী খুনি তাই ভারতে নিরাপদ আশ্রয় পায়। ভারত সরকার ভারতীয় মুসলিমদের বাংলাদেশী বলে পুশ ইন করতে ব্যস্ত। কিন্তু এসব বাংলাদেশীদের পুশ ইন না করে জামাই আদরে রাখছে।
১৯৭১’য়ের পরও পাকিস্তান যে বেঁচে আছে, দেশটি পারমানবিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্-সেটি যেমন ভারতের কাছে অসহ্য বেদনার, তেমনি অসহ্য বেদনার হলো বাংলাদেশী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীদের কাছে। এমন চেতনাধারীদের যুদ্ধ শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামী চেতনাধারী বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধেও। ইসলামের এ শত্রুপক্ষ একাত্তরে ইন্দিরা গান্ধির সাথে এ শর্তে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে তারা ইসলামের পক্ষের শিবিরে যুক্ত হতে দিবে না। এবং দেশটিতে ইসলামের উত্থানও হতে দিবে না। ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে সে নীতিকে তারা দেশটির ১৯৭২’য়ের সংবিধানে সংযুক্ত করেছিল। সেটি বুঝা যায়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধ থেকে। তাই বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধো যুদ্ধ বৈধ হলেও ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেয়াটি সংবিধান বিরোধী। মুজিব সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করেছিল। হাসিনা নিষিদ্ধ করেছিল জামায়াতে ইসলামীকে। তাই সহজেই ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের ইসলামের উত্থান ঘটলে ভারতকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শুধু যুদ্ধ করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের পক্ষ থেকে রেড লাইন তথা নিষিদ্ধ সীমা রেখা রয়েছে। সেটি হলো বাংলাদেশে ইসলামের উত্থান। সে অভিন্ন রেড লাইনটি হলো বাংলাদেশী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীদের কাছেও। যেমন ইসরাইলের রাজনীতিতে রেড লাইন হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র।
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস হয় কি করে?
যারা ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদী, তাদের কাছে সমগ্র পাকিস্তান আমলটি গণ্য হয় পরাধীনতার যুগ রূপে। তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবস হলো ১৯৭১’য়ের ২৬শে মার্চ; এবং বিজয় দিবস হলো ১৯৭১’য়ের ১৬ই ডিসেম্বর। অথচ দারুন মিথ্যাচার হয়েছে এ দুটি দিবস নিয়ে। ইতিহাসের বইয়ে এমন মিথ্যা ঢুকলে সে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না, সেটি তখন বিষাক্ত বর্জে পরিণত হয়। সে বিষাক্ত মিথ্যা তখন চেতনায় পচন ঘটায়। দৈহিক অসুস্থতার ন্যায় নৈতিক রোগ ও চেতনার অসুস্থতাও গোপন থাকে না। বাংলাদেশীদের গভীর নৈতিক অসুস্থতা তখনই বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পেয়েছে যখন দুর্বৃত্তিতে তারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। অপর দিকে তাদের চেতনার অসুস্থতাটি প্রকট ভাবে প্রকাশ পায় তখন, যখন ২৬শে মার্চকে তারা স্বাধীনতা দিবস এবং একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস বলে।
প্রশ্ন হলো, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস হয় কিরূপে? ঐদিন পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয়নি; তখনও সেটি ছিল পাকিস্তানের অংশ। তখন প্রশাসন ছিল পাকিস্তান সরকারের। মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও স্বাধীনতার যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। ২৬শে মার্চ কোন সরকারও গঠিত হয়নি। তাজুদ্দীনর নেতৃত্ব অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় ১৯৭১’য়ের ১০ এপ্রিল এবং শপথ নেয় ১৭ এপ্রিল। তখন পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীও গঠিত হয়নি। তখন পাকিস্তান সরকারের যেসব ক্যান্টনমেন্ট পূর্ব পাকিস্তানে ছিল, এগুলির একটিরও পতন হয়নি। কোন বিদেশী সরকার -এমনকি খোদ ভারতও, বাংলাদেশ নামক কোন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। বিশ্ববাসী তখনও জানতো পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে ভারতের অর্থ ও অস্ত্রে একটি গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে সফল হয়েছে - বিশ্বের কোথাও সে খবর প্রচার পায়নি। স্বাধীনতা দিবস রূপে গণ্য হতে হলো সে দিনটিতে দৃশ্যমান কিছু ভূ-রাজনৈতিক অর্জন থাকতে হয়। ১৯৭১’য়ের ২৬শে মার্চে সেরূপ কিছুই অর্জিত হয়নি। বিদ্রোহের ঘোষণা দিলেই স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা পায়না। তাই ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস বলাটি ভারতসেবী বাঙালিদের গাজাখুরি মিথ্যাচার মাত্র; কোন বিবেকবান মানুষের কাছে সেটি স্বীকৃতি পেতে পারে না।
প্রথম স্বাধীনতা দিবস: ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগস্ট
২৬শে মার্চের বিপরীতে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগস্টের চিত্রটি ছিল ভিন্নতর। ১৯০ বছরের ব্রিটিশের গোলামীর পর এটিই ছিল বাঙালি মুসলিমের প্রথম স্বাধীনতা। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশীরা সে স্বাধীনতা উদযাপন করে না। এখানেই ধরা পড়ে বাঙালি মুসলিমের চেতনার গভীর রোগটি। রোগটির মূলে রয়েঠে প্রচণ্ড পাকিস্তান বিদ্বেষ ও ইসলাম বিদ্বেষ। স্বাধীনতা কি এবং কাকে বলে -তা নিয়েই রয়েছে তাদের চরম বিভ্রান্তি। গায়ে প্রচণ্ড জ্বরে রোগী যখন বিকারগ্রস্ত হয়, তখন নিজ ঘরে শুয়ে বাড়ি যাবো, বাড়ি যাবো বলে চিৎকার করে। ১৯৭১’য়ে তেমন এক বিকারগ্রস্ততা দেখা গেছে বাঙালি ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের মাঝে। ফলে স্বাধীন পাকিস্তানে বাস করেও স্বাধীনতার আওয়াজ তুলেছে। ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা তাদের কাছে পরাধীনতা গণ্য হয়েছে।
১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতা ছিল প্রতিটি বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা। অপর দিকে ১৯৭১’য়ের ন্যায় স্বাধীনতা ছিল শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় ভারতসেবীদের স্বাধীনতা। কেড়ে নেয়া হয় ইসলামপন্থী ও অবাঙালিদের স্বাধীনতা। কেড়ে নেয়া হয় প্রায় তিন লাখ বিহারির জীবন, দখলে নেয়া হয় তাদের ঘর বাড়ি ও ব্যবসা বাণিজ্য। গণতন্ত্রকে মুজিব কবরে পাঠিয়ে দেয়। বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে মুজিব কেড়ে নেয় কথা বলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নিষিদ্ধ করে সকল দল ও সকল বেসরকারি পত্রিকা। ২৬শে মার্চের ন্যায় ১৪ই আগস্টের স্বাধীনতার ঘোষণাটি কোন অখ্যাত মেজরের ঘোষণা ছিল না, বরং সেটি এসেছিল ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটনের পক্ষ থেকে। ঐদিনই পাকিস্তানের নতুন গভর্নর জেনারেল তথা রাষ্ট্রপ্রধান রূপে শপথ নেন এবং ভাষণ দেন কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ। ঐদিনই বিলুপ্ত হয় ব্রিটিশ শাসন এবং প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীন ও সার্বভৌম পাকিস্তান। একদিনও দেরি হয়নি সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে স্বাধীন পাকিস্তান সরকারের প্রতিষ্ঠিত দিতে।
২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে, ১৪ ই আগস্ট যেরূপ ঘটেছিল ঐদিনও অবিকল সেরূপ হওয়াটিই কাঙ্খিত ছিল। কিন্তু ২৬শে মার্চ সেরূপ কিছুই ঘটেনি। ফলে ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস বলাটি নিতান্তই সত্য বিবর্জিত মিথ্যাচার; এর পিছনে কোন যুক্তি নাই। এটি বস্তুত ভারতসেবী বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টদের কল্পনা প্রসূত নিজস্ব বিষয়। বস্তুত ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস বলাটি হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার এবং সবচেয়ে বড় প্রতারণার কাণ্ড। স্বাধীনতা দিবসটি যে কোন জাতির জীবনে অতি গর্বের ও স্মরণীয় বিষয়; সে দিবস নিয়ে এরূপ মিথ্যাচার ও জালিয়াতি হওয়াটি অতি কলংকের বিষয়। বিশ্বের অন্য কোন দেশেই স্বাধীনতা দিবস নিয়ে এরূপ মিথ্যাচার হয়নি। দুর্বৃত্তিতে যারা বার বার বিশ্বে শীর্ষে স্থান পায়, একমাত্র তাদের দ্বারাই স্বাধীনতা দিবসের নামে এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার এবং প্রতারণাও সম্ভব। বিবেচনায় সততা ও সুস্থ বিবেক স্থান পেলে এমন মিথ্যাচার কখনো ইতিহাসে স্থান পায়না।
ইতিহাসের প্রকৃত সত্য হলো, বাঙালি মুসলিমের প্রথম স্বাধীনতা দিবস হলো ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগস্ট। ঐদিনে বাঙালি মুসলমানরা ১৯০ বছরের ব্রিটিশের গোলামি থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সে মুক্তির লড়াই কোন বিদেশী শক্তির ভূমিকা ছিল না -যেমনটি দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে। তাই বাঙালি মুসলিমের জীবনে স্বাধীনতা দিবস বলে যদি কিছু থাকে, তবে সেটি হতে হবে ১৪ই আগস্ট, ২৬শে মার্চ নয়। ১৪ই আগস্ট তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে কোন বিদেশী সৈন্য ছিল না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাথে সাথে বিশ্বের নানা দেশ থেকে স্বীকৃতির জোয়ার ছুটেছিল, সে জোয়ার ২৬শে মার্চে যেমন দেখা যায়নি, তেমনি ১৬ই ডিসেম্বরও দেখা যায়নি। পাকিস্তানের স্বাধীন লাভে বিশ্বের সকল মুসলিম দেশে আনন্দের জোয়ার বয়েছিল। সে মুসলিম ভূমি ভারতীয় পৌত্তলিক সৈন্যদের দ্বারা অধিকৃত হওয়ার এবং উম্মাহর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি ভেঙে যাওয়ার বিশ্বজড়ে মুসলিমগণ শোকাহত হয়েছিল। অথচ পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে খুশি হয়েছিল কেবল মাত্র বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট এবং তাদের পৌত্তলিক দোসররা।
১৯৪৭’য়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বাঙালি মুসলিমদের। মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকায়। বস্তুত পাকিস্তানের সৃষ্টিই হলো বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসের সর্বশ্রষ্ঠ কীর্তি। কিন্তু বাঙালি মুসলিমরা এতোটাই আত্মধ্বংসী যে তারা তাদের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মকেই ভুলে গেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে বাঙালিরা এমনকি বাংলাকে কখনো নিজেরা শাসন করেনি। শাসিত হয়েছে পাল, সেন, তুর্কি, মোগল ইত্যাদি অবাঙালিদের দ্বারা। অথচ পাকিস্তানের ন্যায় সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটির ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, ২ জন রাষ্ট্রপ্রধান, ৩ জন স্পীকার, কয়েকজন প্রধানবিচারপতি, প্রধান নির্বাচনি কমিশনারের আসনে বাঙালি বসার সুযোগ পেয়েছিল। এরপরও যখন বলা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে দেয়নি এবং মুজিবকে ক্ষমতা না দেয়াতেই যুদ্ধের শুরু - তখন তার চেয়ে বড় মিথ্যাচার আর কি হতে পারে? এটি অবাঙালি পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন দোষারোপ। বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টদের দ্বারা তো লাগাতর সে মিথ্যাচারটিই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এমন মিথ্যাচার কি কোন সভ্য জাতির রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি হতে পারে? প্রশ্ন হলো, ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড যদি না হতো, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যদি ফিরেশতাদের বাহিনী হতো তবুও বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টগণ কি পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্প থেকে দূরে থাকতো? পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পটি ভারত হাতে নিয়েছিল ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই। তারা শুধু সুযোগ খুজছিল। মুজিব পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে ১৯৭২’য়ের ১০ জানুয়ারিতে সোহরোওয়ার্দী ময়দানের ভাষনে বলেন স্বাধীনতার লড়াই একাত্তর থেকে নয় ১৯৪৭ থেকে শুরু করেছিলাম। সে ভাষন এ নিবন্ধের লেখক নিজ কানে শুনেছিল। লেখকের কাছে মুজিবকে সেদিন চরম প্রতারক মনে হয়েছিল। বাঙালি মুসলিমের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো, পাকিস্তান আমলকে বাঙালির পরাধীনতার আমল বলা এবং ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস বলা।
ঈমানী দায় এবং বাঙালি মুসলিমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের বাইরেও প্রতিটি মুসলিমকে অবশ্যই রাজনৈতিক দায় নিয়ে বাঁচতে হয়। পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রকে ইসলামের শক্তিবৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সুরক্ষার হাতিয়ার রূপে গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হয় প্রতিটি ঈমানদারকে। এ পবিত্র কাজটিই হলো ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত -যাকে জিহাদ বলা হয়। খোদ নবীজী (সা:) এবং তাঁর প্রতিটি সাহাবী সে কাজে নিজের অর্থ, শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগ করেছেন। সে বিনিয়োগের বদৌলতে মুসলিম উম্মাহ পরিণত হয়েছে বিশ্বশক্তিতে। অর্ধেকের বেশী সাহাবা সে জিহাদ শহীদ হয়েছেন।
প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে ঈমানের ফাইনাল পরীক্ষাটি হয় ইসলামী রাষ্ট্রনির্মাণের জিহাদে নিজ অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। নামাজ রোজা ও হজ্জ তো বহু সূদ খোর, ঘুষখোর, মদখোর দুর্বৃত্তও পালন করে। কিন্তু তারা সে ফাইনাল পরীক্ষায় প্রবেশের যোগ্যতা বা সামর্থ্য তাদের থাকেনা। সে ফাইনাল পরীক্ষায় যারা পাশ করে একমাত্রই সত্যিকার ঈমানদার রূপে স্বীকৃতি পায়। জান্নাত একমাত্র তাদের জন্যই। যারা সে ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করে তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেয়ার প্রক্রিয়ায় অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। অপর দিকে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের নেতৃত্বে ৩ শতের বেশী ব্যক্তি নবীজী (সা:)’য়ের পিছনে নামাজ পড়েও সে পরীক্ষায় ফেল করেছে এবং মুনাফিক রূপে চিহ্নিত হয়েছে। যারা পৌত্তলিকদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদেরই কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করে, তারা কি সে পরীক্ষায় পাশ করতে পারে? সেটি তো শুরু থেকেই মুনাফিকি এবং ইসলামের সাথে গাদ্দারী।
মুসলিম নামধারী বাঙালি কাপালিক জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ হলো, ১৯৭১’য়ে তারা পাকিস্তানের ইসলামী রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার বদলে সে রাষ্টকে খণ্ডিত করার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। এবং সে যুদ্ধে পৌত্তলিক কাফিরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে -যা মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা মুমতাহানার ১ নম্বর আয়াতে হারাম ঘোষণা করেছেন। ১৯৭১’য়ে পৌত্তলিকদের সাথে এরূপ হারাম কোয়ালিশন গড়াই হলো বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে ইসলামের সাথে সবচেয়ে বড় গাদ্দারী। সে সাথে সবচেয়ে বড় বেঈমানীও। এ গাদ্দারী ও বেঈমানীর অপরাধে শত শত বছর পরও ঈমানদারেরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের আসামীর কাঠগড়ায় তুলবে এবং তাদের উপর লালত পাঠ করবে।
ইসলামপন্থীদের অনৈসলামী কাণ্ড
তবে গাদ্দারী ও বেঈমানী তথাকথিত সেসব ইসলামপন্থীদের কি কম, যারা ১৯৭১’য়ের পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধকে মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে? বুঝতে হবে, মুসলিমের প্রতিটি যুদ্ধকে হালাল যুদ্ধ হালাল যুদ্ধ হতে হয়। আরো বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালা জালেম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে ফরজ করেছেন, কিন্তু হারাম করেছেন মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করাকে। তথাকথিত এসব ইসলামপন্থীরা ইসলামের অতি মৌলিক বিষয়টি বুঝতে ভুল করে যে, পৌত্তলিকদের পার্টনার রূপে পাকিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশ খণ্ডিত করার যুদ্ধটি কখনোই কোন মুক্তিযুদ্ধ হতে পারে না, সেটি বরং বেঈমানীর সুস্পষ্ট দলিল। তাই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান হলো ইসলামের সাথে বেঈমানী এবং মুসলিম উম্মাহর সাথে গাদ্দারীর সনদ। পাকিস্তান ভাঙার হারাম যুদ্ধকে মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে এসব ক্ষমতালোভী ইসলামপন্থীরা বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট শিবিরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়াতে পারবে -সেটি বিতর্কের বিষয়। কিন্তু সেটি যে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বেঈমানী এবং মুসলিম উম্মাহর সাথে গাদ্দারী রূপে চিত্রিত হবে -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?
বঙ্গীয় এ মুসলিম ভূমিতে ১৭৫৭’য়ের মীর জাফরই একমাত্র মীর জাফর নয়, হাজার হাজার মীরজাফর ময়দানে দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে। তাদের অনেকে এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে সক্রিয়। তাদের মাঝে শীর্ষ মীর জাফর ছিল শেখ মুজিব। বাঙালি ইতিহাসের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাঙালি মুসলিমগণ যদি অতীতের এ কদর্য ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে তারা বার বার বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস গড়বে। তখন বিপুল রক্ত ব্যয়ে অর্জিত স্বাধীনতা বার বার পরাধীনতায় পর্যবসিত হবে। তখন ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতাই শুধু হারিয়ে যাবে না, হারিয়ে যাবে ২০২৪’য়ের ৫ আগস্টে অর্জিত স্বাধীনতাও। ক্ষুধার্ত শকুনেরা সে স্বাধীনতা ভক্ষণের জন্য দেশের ভিতরে ও বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ,
মিথ্যাচার বিজয় দিবস নিয়ে
অপরদিকে আরেক গাঁজাখুরি মিথ্যাচার হলো, ১৬ই ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস বলা। প্রশ্ন হলো, ৯ মাসের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রকৃত অর্জনটি কোথায়? পূর্ব পাকিস্তানের সবটুকু ভূমি দূরে থাক, কোন একটি জেলা, কোন একটি মহকুমা এবং কোন একটি থানাও মুক্তিবাহিনী নিজ শক্তিতে স্বাধীন করতে পারেনি। তারা বড় জোর কিছু নিরস্ত্র পাকিস্তানপন্থীকে তাদের নিজ বাড়িতে হত্যা করেছে এবং কিছু ব্রিজ ও বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার বোমা মের উড়িয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার কাজটি তো করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১০ ডিভিশন সৈন্য। তাই ১৬ ডিসেম্বর হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় দিবস। ঐদিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান অধিকৃত হয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা। প্রতিটি জেলা, মহাকুমা ও প্রতিটি থানার শাসনভার নিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী; মুক্তি বাহনী নয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে, মুক্তিবাহিনীর কাছে নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের যে আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বক্ষরিত হয় -সেখানে কোন বাংলাদেশীর ও মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না। এ থেকে বুঝা যায় যুদ্ধ হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে পাক সেনাবাহিনীর। তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বলে কোন সেনাবাহিনী ছিল ন। তাই যে কোন নিরপেক্ষ বিচারে ১৬ই ডিসেম্বর হলো নিরঙ্কুশ ভারতের বিজয় দিবস; বাংলাদেশের নয়। তাই ১৬ই ডিসেম্বরকে বাংলাদেশীদের বিজয় দিবস বলাটি ইতিহাসের আরেক মিথ্যাচার। প্রশ্ন হলো, এতো মিথ্যাচার দিয়ে কি কখনো সভ্য রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ নির্মিত হয়?
১৬ ডিসেম্বর হলো বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ণ দখলদারির দিবস। তাই বাঙালি মুসলিমদের জন্য সেটি অতি কলঙ্কের দিবস। সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের বুকে স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারত এবং ভারতসেবী আওয়ামী দুর্বৃত্তরা -যারা সেদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে তাদের দখলদারি ও লুটপাটে সহায়তা করেছিল। বাঙালি মুসলিমের ইতিহাসে সে দিনটি ছিল বিদেশী কাফিরদের দ্বিতীয়বার দখলদারির দিবস। বাংলার বুকে কাফির শক্তি প্রথমবার দখলদারি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাতে। সেটি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুল পলাশীর ময়দানে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর।
১৬ই ডিসেম্বরে ভারতীয় দখলদারি প্রতিষ্ঠার আগেই তাজুদ্দিন ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। সে চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতালোী আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমতা বসতে চেয়েছিল স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে এবং ভারতের সহায়তা নিয়ে। ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগস্ট যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বাঙালি মুসলিমরা অর্জন করেছিল, সে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিল মুজিব ও তার আওয়ামী সাথীরা। মুজিব সে আত্মসমর্পণকে ২৫ বছর বাড়িয়েছিল ২৫ সালা চুক্তি করে।
দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস: ২০২৪’য়ের ৫ই আগস্ট
বাঙালি মুসলিমদের লুণ্ঠিত স্বাধীনতার পুনরুদ্ধার ঘটে ২০২৪’য়ের ৫ আগস্ট ভারতের সেবাদাস হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে। হাসিনার শাসন ছিল ভারতের শাসন। ভারতের এজেন্ডাই ছিল হাসিনার এজেন্ডা। ৫ আগস্টের পর জনগণ আবার পায় স্বাধীনভাবে কথা বলা ও মত প্রকাশের অধিকার। তাই বাঙালি মুসলিমের দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবসটি হলো ২০২৪’য়ের পাঁচই আগস্ট। কিন্তু যে ভারতসেবীরা ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতার বিরোধী, তারা বিরোধী ২০২৪’য়ের স্বাধীনতারও বিরোধী।
বাংলাদেশীদের ১৯৭১’য়ের ভাবনা ও যুদ্ধ নিয়ে অবশ্যই নতুন ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, সে বিবেচনার মানদণ্ড কি হবে? বিচারের রায় নির্ভর করে বিচারের মানদণ্ডের উপর। বাংলাদেশ একাত্তরের রাজনীতি, যুদ্ধ ও অর্জন নিয়ে এ যাবত যত বিচার বিবেচনা হয়েছে, তা হয়েছে চেতনার সেকুলার মডেল (secular paradigm)’য়ের আলোকে। বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট, সেকুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা এ সেক্যুলার চেতনার বাইরে যেতে রাজি নয়। বাংলাদেশের সেকুলার আইনে জ্বিনা, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সুদী কারবার -এগুলি ব্যক্তির বৈধ নাগরিক অধিকার স্বীকৃত। ইচ্ছা করলে যে ব্যক্তি প্রতিদিন পতিতাপল্লীতে যেতে পারে। ইচ্ছা করলে সে নিজ গৃহকে জ্বিনার আস্তানায় পরিণত করতে পারে। ইচ্ছামত সে সূদ খেতে পারে। দুই পক্ষের সম্মতিতে এরূপ পাপ কর্মগুলি করলে বাংলাদেশের কোন আদালত কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। এটিই হলো সেক্যুলার বিধি। বাংলাদেশের সরকার পতিতাবৃত্তি ও সুদের ন্যায় পাপ কর্ম বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত পুলিশ বসিয়ে পাহারাদারির ব্যবস্থা করে। সেটি সরকার সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করে।
চেতনার সে সেকুলার মডেলের ভিত্তিতে পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গা এবং সে ভাঙার কাজে মুসলিম ভূখণ্ডের উপর পৌত্তলিক ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশের সেনাবাহিনী ডেকে আনার মতো একটা গুরুতর অপরাধ কর্মও বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টদের কাছে প্রশংসনীয় ও উৎসবযোগ্য কর্ম রূপে গণ্য হয়। ১৯৭১’য়ে তো সেটি হয়েছে। এখানেই বাঙালি মুসলিমের আদর্শিক পচন এবং সেটি ইসলাম থেকে বিশাল বিচ্যুতি নমুনা। পরিতাপের বিষয় হলো, চেতনায় দূষণ ঘটেছে অনেক ইসলামপন্থী নেতাকর্মীদের মাঝেও। ফলে পাকিস্তান ভাঙা নিয়ে তাদের বয়ানও ফ্যাসিস্ট, সেকুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীদের মতই। তারাও পাকিস্তান ভাঙাকে মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে এবং ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতের বিজয় নিয়ে রাজপথে মিছিল করে। অথচ বিচারের মানদণ্ডটি ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক হলে রায়টি ভিন্নতর হতো। তখন জ্বিনার অপরাধে প্রতিটি বিবাহিতকে পাথর মেরে হত্যা করা হতো। এবং মুসলিম দেশভাঙার যুদ্ধটি প্রাণদণ্ডের অপরাধ রুপে গণ্য হতো।
মুসলিমদের উপর ফরজ শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন নয়; বরং তাকে কর্ম, রাজনীতি, যুদ্ধ বিগ্রহসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচারের মানদণ্ড রূপে গ্রহণ করতে হয় কুরআনী বিধানকে। কুরআনের বিধানকে বাদ দিয়ে যারা নিজেদের কর্ম, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধ বিগ্রহের বিচার বিবেচনা ও মূল্যায়ন করে -পবিত্র কুর’আনের সূরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে। অথচ ১৯৭১য়ের পাকিস্তান ভাঙার রাজনীতি ও যুদ্ধ বিগ্রহের মূল্যায়নে কুরআনী বিধানকে আদৌ স্থান দেয়া হয়নি। বিচার হয়েছে সেক্যুলার মানদণ্ডে। ইসলামী বিধানের সাথে এটি হলো বিশাল গাদ্দারী। মহান রব’য়ের সামনের বিচারে দাঁড়ানোর আগে তাদের উচিত পবিত্র কুর’আনের এই বিধানের আলোকে তাদের একাত্তরের অপরাধের বিচার করা। উল্লেখ্য যে, সূরা আল ইমরানের ১০৩ নাম্বার আয়াতে বিভক্তিকে হারাম এবং একতাকে ফরজ করা হয়েছে। তাই শাসক জালেম হলে বা শাসকের হাতে গণহত্যার কাণ্ড ঘটলেই দেশ ভাঙা জায়েজ হয়ে যায় না। শাসকের কোন অপরাধই মুসলিম দেশ ভাঙাকে জায়েজ করেনা। উমাইয়া, আব্বাসী ও উসমানিয়া শাসকদের হাতে বহু হত্যাকাণ্ড ও জুলুম হয়েছে, কিন্তু সেগুলিকে বাহানা বানিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করার অপরাধ ঘটেনি। বুঝতে হবে, শাসকের কোন অপরাধই দেশভাঙার ন্যায় আরেকটি অপরাধকে জায়েজ করেনা। সূরা আল ইমরানের সুরার ১০৫ নম্বর আয়াতে ভয়ানক আযাবের হুশিয়ারি শুনানো হয়েছে তাদের জন্য যারা বিভক্তির পথ বেছে নেয়।
বাঙালি মুসলিমে সবচেয়ে বড় নাশকতা
মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয়টি মজহাবী বা ফিরকাগত বিভক্তি নয়; বরং সেটি হলো মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি তথা মুসলিম দেশ ভাঙা। ৪ মজহাবের জায়গায় ১০ মজহাব হলেও মুসলিম উম্মাহর এতো ক্ষতি হতো না, যত ক্ষতি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের বিভক্তির কারণে। তাই যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা নিজ দেশের জালেম সরকারের নির্মূলে লড়াই করে, কারণ সেটি ফরজ। কিন্তু কখনোই তারা দেশ ভাঙার যুদ্ধ করেনা। কারণ, সেটি হারাম। তাই যারা হারাম হালাল বিধান নিয়ে যাদের জ্ঞান আছে তাদের কেউই ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার পক্ষ নেয়নি। তাই কোন ইসলামপন্থী দল, কোন মুফতি, কোন ইমাম, কোন আলেম বা পীর সাহের পাকিস্তান ভাঙাকে সমর্থন করেনি। পাকিস্তান ভাঙার কাজটি ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরা আওয়ামী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও বামধারার কাপালিকদের। তাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভেঙে মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করা এবং সে সাথে তাদের প্রভুরাষ্ট্র পৌত্তলিক ভারতকে শক্তিশালী করা। তাই ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলিমের সবচেয়ে বড় নাশকতার কর্মটি হলো পাকিস্তান ভাঙা।
ইসলামের শত্রুপক্ষ আরেকটি ক্ষেত্র ইতিহাস গড়েছে। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন কোন নজির নাই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজ দেশ ভেঙে সংখ্যালঘিষ্টদের থেকে পৃথক হয়েছে। এ অভিনব ইতিহাস একমাত্র ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট বাঙালিদের। অথচ মুসলিম হওয়ার নূন্যতম শর্ত হলো, তাকে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে হয়। তাদেরকে একত্রে পবিত্র ক্বাবার তোয়াফ করতে হয় ও আরাফতে হাজির হতে হয়। একই ভাবে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ ভাবে এক রাষ্ট্রে বসবাসের সামর্থ্য নিয়ে বাঁচতে হয়। একতা হলো ঈমানের লক্ষণ, আর বিভক্তি হলো বেঈমনীর লক্ষণ। নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তাই আরব, ইরানি, তুর্কি,কুর্দি, মুর, হাবশি ইত্যাদি নানা ভাষার মুসলিমগণ একত্রে এক রাষ্ট্রে বসবাস করেছে। কিন্তু সে ঈমানী তাড়না ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট বাঙালিদের মাঝে একাত্তরে দেখা যায়নি। বরং দৃশ্যমান হয়েছে চরম বেঈমানী ও গাদ্দারী।
অথচ ১৯৪৭ সালে সে অভিন্ন প্যান ইসলামী চেতনা নিয়েই বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ, গুজরাতি, বিহারি, অসমীয় ইত্যাদি পরিচয়ের মুসলিমগণ পাকিস্তান নির্মাণ করে। কোন জাতীয় বা গোত্রীয় রাষ্ট্রের নির্মাণ নয়, বরং লক্ষ্য ছিল ইসলামী চেতনা ও সভ্যতার পতাকাবাহী civilisational state’য়ের নির্মাণ। আজও সে চেতনা নিয়ে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ মুসলিমগণ এক অখণ্ড পাকিস্তানে বসবাস করছে। সে একতার কারণে পাকিস্তান এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম দেশ। এবং পাকিস্তানই হলো মুসলিম বিশ্বে একমাত্র এদেশটি পারমানবিক শক্তি। পাকিস্তানের সে মর্যাদার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে যুদ্ধ থামাতে ইসলামাবাদের কাছে করুণা ভিক্ষা করতে হয়। পাকিস্তানকে নিজ পক্ষে রাখতে বিশ্বের আরেক মোড়ল চীন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে পাকিস্তানে। কাছে রাখতে চায় রাশিয়াও। এখন ভারত এক ঘরে এবং প্রতিদিন বাঁচছে পাকিস্তান ভীতি নিয়ে।|
কিন্তু ইসলাম বিবর্জিত বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট কাপালিকদের কাছে সেরূপ একটি শক্তিশালী পাকিস্তান ভাল লাগেনি। কিন্তু একাত্তরে বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টদের উপর বিজয়ী হয় শয়তান। শয়তান ও তার পৌত্তলিক খলিফা ভারত সর্ববৃহৎ এ মুসলিম দেশটির ধ্বংসে ১৯৪৭ থেকেই চেষ্টায় অবিরাম লেগেছিল। অপর দিকে ইসলামের বাঙালি শত্রুগণ পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্প নিয়ে ভারতীয় পৌত্তলিক শিবিবে ভিক্ষুকের বেশে হাজির হয়; এবং ভারতের আশ্রয় শিবিরে ভারতীয় অর্থ, অন্ন, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান ভাঙার হারাম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বাঙালি মুসলিম ইতিহাসের এটিই সবচে|য়ে বড় কদর্যতা।
হাতছাড়া হলো সে সুযোগ
কুয়ার ব্যাঙ যেমন সাগরে নামতে ভয় পায়, তেমন ক্ষুদ্র মনের বাঙালি সেক্যুলারিস্টদেরও বৃহৎ পাকিস্তান ভাল লাগেনি। তারা বরং ১৯৭১’য়ে ক্ষুদ্রতর বাঙালি পরিচয় খুঁজেছে। তাদের সে স্বপ্ন সফল হয় ১৬ই ডিসেম্বরে ভারতের বিজয়ে । ফলে এ দিনটি শয়তান ও তার পৌত্তলিক খলিফাদেরই বিজয়ের দিন হতে পারে, কোন ঈমানদার মুসলিমের নয়। বরং পরাজয়ের দিন হলো সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। যার মধ্যে শরিষার দান পরিমাণ ঈমান আছে -সে কি কখনো ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে উৎসব করতে পারে?
বাঙালি মুসলিমের সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে, ৫ বার প্রথম হওয়া নয়, বরং সেটি হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নানা ভাষার মুসলিমগণ বিশ্বের রাজনীতিতে যে প্রভাব ফেলার স্বপ্ন দেখেছিল সে স্বপ্নকে তারা ভেঙে দিয়েছে। বাঙালি মুসলিম যদি দুর্বৃত্তিতে ৫ বারের বদলে ১০ বার প্রথম হতো তবুও মুসলিম উম্মাহ এতোটা ক্ষতি হতো না, যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াতে|। অথচ একাত্তরে খণ্ডিত না হলে দেশটি তার ৪৪ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে চীন ও ভারতের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হতে পারতো। এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালিরাই বসতে চালকের আসনে -যেমন ৪ জন বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার সুযোগ পেয়েছিল প্রথম ২৪ বছরে। তখন মুসলিম উম্মাহ পেত একটি বহুভাষী সিভিলাইজেশ