- প্রফেসার ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক
সমকালীন বৈশ্বিক সংকট ও রাষ্ট্রের দ্বি-মুখী কৌশলগত সাড়াদানঃ
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি মানব নিরাপত্তা (Human Security) এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম প্রধান কাঠামোগত হুমকি। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) সাম্প্রতিক `গ্রাউন্ডসওয়েল` (Groundswell) প্রতিবেদনের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের অভাব ঘটলে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুরক্ষাকে পরস্পরবিরোধী না ভেবে, এদের সমন্বিত রূপায়ণই আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সম্প্রতি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নে নবখননকৃত সরিকল-বাটাজোর খালের পাড়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির সশরীরে উদ্বোধন কেবল একটি পরিবেশগত ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে গ্রামীণ নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের এক অনন্য নব্য-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশল। অপরাধ বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির (IPE) দৃষ্টিকোণ থেকে এই সমন্বিত উদ্যোগ মূলত রাষ্ট্রের কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা (Structural Resilience) বৃদ্ধির একটি দূরদর্শী প্রয়াস।
বৃক্ষরোপণের অর্থনৈতিক রাজনীতি: ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’ ও গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারঃ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসগুলোতে ক্রমাগত জোর দেওয়া হচ্ছে যে, জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে `গ্রিন গ্রোথ` বা সবুজ প্রবৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষরোপণ এবং জলাশয় খননের মতো পরিবেশগত অবকাঠামো (Green Infrastructure) প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মাটির উর্বরতা ও কৃষি-সুরক্ষা:
নদী ও খাল পাড়ে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ মাটির ক্ষয়রোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করে, যা কৃষি-উৎপাদনশীলতা টেকসই রাখার পূর্বশর্ত।
কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি:
গ্রিন ক্রাইমিনোলজির (Green Criminology) তাত্ত্বিক রূপরেখা অনুযায়ী, পরিবেশগত বিপর্যয় যখন গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে, তখন জলবায়ু-উদ্বাস্তু মানুষেরা জীবিকার তাগিদে অপরাধমূলক অর্থনীতি বা অনানুষ্ঠানিক ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ে। বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ ও খাল খনন গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই অপরাধমূলক রূপান্তরকে রুখে দেয়।
এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং সম্পদের সুষম বণ্টন এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অপরাধের পরিবেশগত উৎসগুলোকে উৎখাত করার একটি শাসনতান্ত্রিক কৌশল।
ফ্যামিলি কার্ড: নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অপরাধ প্রতিরোধে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাঃ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) সহ বিভিন্ন সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো সব সময়ই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নীতিটি নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বে প্রমাণিত যে, সম্পদ বা নগদ অর্থ যখন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের চেয়ে নারী সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তার `মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট` বা গুণিতক প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নারীরা এই অর্থ সরাসরি পারিবারিক পুষ্টি, স্বাস্থ্য, সন্তানদের শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে বিনিয়োগ করেন।
ক্রাইম প্রিভেনশন বা অপরাধ প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে, মুদ্রাস্ফীতির এই কঠিন সময়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছে এই কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা পৌঁছানোর ফলে অর্থনৈতিক চাপজনিত পারিবারিক সহিংসতা এবং ক্ষুদ্র অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর আওতাভুক্ত করে স্থানীয় বাজারে তারল্য প্রবাহ সচল রাখছে, যা ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সুশাসন, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য `গভর্নেন্স` বা সুশাসনকে প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। টিআইবি (TIB)-র বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায়শই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার তাগিদ দেওয়া হয়। `ফ্যামিলি কার্ড`-এর মতো ডিজিটাল বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক রূপান্তরগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কাঠামোগত দুর্নীতি হ্রাসে সহায়ক।
একইভাবে, পরিবেশগত প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। যখন একটি দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান স্বশরীরে প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে এই ধরনের কর্মসূচির সূচনা করেন, তখন তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করে এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের জবাবদিহিতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
টেকসই ভবিষ্যৎ ও একীভূত সমাজ বিনির্মাণঃ
জলবায়ু সংকট মোকাবেলা, পরিবেশের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই দ্বি-মুখী নীতি (Dual-track Policy) বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার গ্রিন ডিফেন্স, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সামাজিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের একটি শক্তিশালী সামাজিক ঢাল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই ধরনের সমন্বিত নীতি কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির টেকসইকরণ নিশ্চিত করে না, বরং তা একটি অপরাধমুক্ত, সমতাভিত্তিক ও জলবায়ু-সহনশীল রাষ্ট্র গঠনে দীর্ঘমেয়াদী অবদান রাখে। পরিবেশগত সুশাসন এবং সামাজিক সুরক্ষার এই মেলবন্ধনই হোক আগামী দিনের বৈশ্বিক রোল মডেল।