| |
| সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধিতে হুমকির মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য |
| |
|
|
|
|
|
|
|
| |
| |
|
| |
| |
| মো: আসিফ ইকবাল: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সমুদ্রও এর উল্লেখযোগ্য অংশ শোষণ করছে। এর ফলে সমুদ্রের পানির রসায়নে পরিবর্তন ঘটছে এবং ধীরে ধীরে অম্লতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তন প্রবাল, ঝিনুক, শামুক এবং অন্যান্য খোলসযুক্ত প্রাণীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধির কারণে এককভাবে “লাখো জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে”-এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং অম্লতা বৃদ্ধি, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ এবং আবাসস্থল ধ্বংস-এসব কারণ মিলেই সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “সমুদ্র অতিরিক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করলে পানির রাসায়নিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। এতে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট দিয়ে খোলস বা কঙ্কাল তৈরি করে এমন প্রাণীদের বৃদ্ধি ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেতে পারে।” তাঁর মতে, এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। সমুদ্রবিজ্ঞানী ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “প্রবাল প্রাচীর পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি। অম্লতা বৃদ্ধি ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে প্রবাল দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অসংখ্য মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর আশ্রয়স্থল এবং প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।” বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবীরাও সমুদ্রের পরিবর্তিত পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কক্সবাজারের জেলে মো. ইলিয়াস বলেন, “আগের মতো সব ধরনের মাছ পাওয়া যায় না। সমুদ্রের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে বলে মনে হয়।” পটুয়াখালীর মৎস্যজীবী আব্দুল করিম বলেন, “সমুদ্রে যেতে এখন অনেক বেশি সময় লাগে, কিন্তু মাছের পরিমাণ সব সময় আগের মতো থাকে না।” মৎস্য গবেষক ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “সামুদ্রিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে কিছু মাছের বিস্তৃতি ও চলাচলের ধরণ বদলে যেতে পারে। এর প্রভাব মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকার ওপরও পড়তে পারে।” তিনি বলেন, এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে নিয়মিত গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পরিবেশবিদ ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি একক কোনো সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের মতো বিষয়ও যুক্ত রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।” উপকূলের বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “সমুদ্র আমাদের জীবিকার উৎস। সমুদ্রের পরিবেশ খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে উপকূলের মানুষ।” চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষা করা মানে শুধু মাছ রক্ষা করা নয়, পুরো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো, সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত মাছ আহরণ রোধ, সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সমুদ্রের অম্লতা, তাপমাত্রা এবং জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। পরিবেশ নীতিবিদ ডক্টর সায়মা রহমান বলেন, “সমুদ্র পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমুদ্রকে সুস্থ রাখতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পরিবেশ-সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।” বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যদিও এর প্রভাব সব প্রাণীর ওপর সমান নয়, তবুও জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট চাপের সম্মিলিত প্রভাবে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই সময়মতো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কার্যকর সংরক্ষণনীতি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
|
| |
|
|
|