বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * হরমুজে দুই মার্কিন যুদ্ধজাহাজসহ ১০টি জাহাজে হামলা ইরানের   * ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে জানালেন ট্রাম্প   * কারেন্ট জালের কারখানায় অভিযানে ৪২ হাজার রিল জব্দ   * এসএসসির খাতা পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, ফেল থেকে পাস ৪৫৮৫ শিক্ষার্থী   * ফিলিপাইনে ফেরিতে ভয়াবহ আগুনে ৫ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৮৭   * ছেলের বিয়ের বাজার করে বাড়ি ফিরছিলেন, সড়কে প্রাণ গেল বাবা-মায়ের   * জালিয়াতির অভিযোগের পর ডব্লিউএইচও’র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ   * আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক   * অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী   * নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন সম্পূর্ণ হবে না : রিজভী  

   মতামত
পশ্চিমা গণতন্ত্র বনাম ইসলামী গণতন্ত্র
  Date : 19-08-2026

ড. বি এম শহীদুল ইসলাম 
গণতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবহৃত শাসন ব্যবস্থার একটি পদ্ধতি। এটি মূলত জনগণের শাসন, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং জনগণের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বের বড় বড় দার্শনিকের চিন্তা-ভাবনা ও ব্যক্তিগত দর্শনের ফসল হিসেবে যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সেটিকে পশ্চিমা গণতন্ত্র বলা হয়। অর্থাৎ মানব রচিত গণতন্ত্রের নাম হচ্ছে- পশ্চিমা গণতন্ত্র। অন্যদিকে, ইসলামী গণতন্ত্র একটি অনন্য শাসন ব্যবস্থা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শরিয়াহর বিধান এবং শূরা বা পরামর্শ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও ইসলামী ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তথাপি উভয়ের মূলনীতির মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। এ প্রবন্ধে ইসলামী গণতন্ত্র ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করা হবে।
পশ্চিমা গণতন্ত্রের সংজ্ঞা: পশ্চিমা গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যেখানে জনগণই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার উৎস, এবং সরকার গঠিত হয় জনগণের ইচ্ছা ও নির্বাচনের মাধ্যমে। এখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সংক্ষেপে ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন ব্যবস্থা’। এভাবেই পশ্চিমা গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত উক্তি দ্বারা পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়।

পশ্চিমা গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা: পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভিত্তি মূলত ইউরোপের রেনেসাঁ, প্রাগৈতিহাসিক গ্রিক গণতন্ত্রের ধারণা এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকায় সংঘটিত রাজনৈতিক বিপ্লবের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। এখানে মানুষকেই শাসক হিসেবে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী মনে করা হয়। এ ধারণা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে প্রোমোট করে। পশ্চিমা গণতন্ত্র মানব রচিত গণতন্ত্রের দর্শন।

পশ্চিমা গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য: পশ্চিমা গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
১.জনগণের সার্বভৌমত্ব: জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উৎস।২. সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন: নীতিনির্ধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়। ৩. ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ: রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকে না। ৪. আইনের শাসন: প্রত্যেক নাগরিক আইনের চোখে সমান, রাষ্ট্রের শাসকও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ৫. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকার: মতপ্রকাশ, ধর্মাচরণ, সমাবেশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত। ৬. নির্বাচন ব্যবস্থা: নিয়মিত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। ৭. ক্ষমতার ভারসাম্য: শাসন ব্যবস্থায় নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগ আলাদা এবং একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে।
পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাস: গ্রীসের এথেন্সের সরাসরি গণতন্ত্র -খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে। ম্যাগনা কার্টা ১২১৫ খ্রি.। যেখানে রাজাকে আইনের অধীনে আনতে বাধ্য করা হয়। ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯ খ্রি. যেখানে ‘স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব’ স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমেরিকান সংবিধান ১৭৮৭ খ্রি, যেখানে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এগুলো পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাস।
পশ্চিমা গণতন্ত্রের বাস্তবচিত্র: বর্তমান পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি পশ্চিমা গণতন্ত্রের মডেল অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। যদিও আদর্শভাবে সবাই সমান, বাস্তবে নানা শ্রেণিভেদ, করপোরেট লবিং এবং গণমাধ্যমের প্রভাব পশ্চিমা গণতন্ত্রের চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সংক্ষেপে বলা যায়, পশ্চিমা গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যেখানে ধর্মীয় বিধানের প্রভাবমুক্ত জনগণের ইচ্ছাকে শাসন ব্যবস্থার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে এবং যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ নীতিরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকে। তবে পশ্চিমা গণতন্ত্রের মূল সমস্যা জণগণের সার্বভৌমত্বকে হাইলাইটস করতে গিয়ে জনগণকে হুমকির মুখে পড়তে হয়।এবার আসুন ইসলামী গণতন্ত্র কি বলে। একথা সত্য যে, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারক এবং বাহকরা বিশ্বব্যাপী তাদের পরিকল্পনা ও চেতনার আলোকে যখন যেখানে যেরূপ সুবিধা মনে করেছ সে ধরণের  গণতন্ত্র তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী গণতন্ত্রের সংজ্ঞা: ইসলামী গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসারে জনগণের পরামর্শ বা শুরা এবং অংশ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এতে শাসকের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং ধর্মীয় নীতিমালার প্রতি আনুগত্য আবশ্যিক। সংক্ষেপে ‘আল্লাহর আইন ও কুরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্যে জনগণের পরামর্শ ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা’-এটিই ইসলামী গণতন্ত্রের মূল ধারণা। এ ধারণা মূলত কুরআন প্রদত্ত ও রাসুল (সা) প্রদর্শিত বিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এখানে জনগণের মতামত থাকা সত্ত্বেও কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিবেচনা করতে হয়। কুরআন ও সুন্নাহ যদি অনুমোদন না করে তাহলে সেটি পাশ হবে না। তাই কোনো বিষয়ে জনগণের মতামত নেয়ার পর সেটি কুরআন ও সুন্নাহ সম্মত কিনা তা যাচাই বাছাই করার প্রয়োজন হয়। কুরআন ও সুন্নাহ অনুমোদন দেয় না, এমন কোনো বিষয় জনগণ সমর্থন করলেও তা টিকবে না।
ইসলামী গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা: ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সমাজে শান্তি- শৃঙ্খলা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলাম শাসকের ওপর জনগণের অধিকার রক্ষা ও জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব আরোপ করেছে। তাই এখনে খামখেয়ালিপনা ও স্বৈরতন্ত্র কায়েমের সুযোগ নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "তাদের কাজ পরস্পরের পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়"। [সূরা আশ-শুরা-৪২ আয়াত:৩৮]। এ থেকে বোঝা যায়, নেতৃত্ব নির্ধারণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামত ও অংশ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ অংশ গ্রহণ আল্লাহর বিধান ও শরিয়াহর সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে মানুষের ইচ্ছা স্বাধীন নয়; বরং তা আল্লাহর বিধানের অধীন। তাই ইসলামী গণতন্ত্রে যা ইচ্ছা তাই করা সম্ভব নয়। 
ইসলামি গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য: 
ইসলামী গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
১.আল্লাহর সার্বভৌমত্ব: অর্থাৎ চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর বিধানকে কেন্দ্র করে হয়। ২. শূরা বা পরামর্শ: নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত পরামর্শের ভিত্তিতে গৃহীত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "ওয়া আমরুহুম শুরা বায়নাহুম"[ সুরা আশ শুরা:৩৮ এবং সুরা আল ইমরান:১৫৯]। ৩. ন্যায়বিচার ও সাম্য: সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। ৪. শাসকের জবাবদিহিতা: ইসলামী গণতন্ত্রের নেতা জনগণের নিকট এবং আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকে। ৫. আইনের শাসন: ইসলামী গণতন্ত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও শরিয়াহর ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করা হয়। ৬. নৈতিকতা ও তাকওয়া: ইসলামী গণতন্ত্রে নেতৃত্বের যোগ্যতার অন্যতম শর্ত হচ্ছে আল্লাহ ভীতি ও নৈতিকতা। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগের বাস্তব দৃষ্টান্ত। মদীনা সনদ, শুরা ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে খলিফা নির্বাচনের প্রক্রিয়া। যেমন: আবু বকর (রা)-এর বাইয়াত ইসলামী গণতন্ত্রের উজ্জ্বল নিদর্শন। হযরত আবু বকর (রা)-র ইন্তেকালের পর সাহাবীদের মতামত ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সর্ব সম্মতিক্রমে হযরত ওমর (রা)-কে খলিফা নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতিতে খলিফা বা নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এটিই ইসলামী গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। অতএব, ইসলামের সকল খলিফা নির্বাচন, তাদের বাইয়াত গ্রহণ ও বাইয়াতের পদ্ধতি ইসলামী গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণযোগ্য। তবে তখন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল না বিধায়- হস্ত প্রদর্শনের মাধ্যমে মতামত যাচাই করা হত। সুতরাং যারা বলে ইসলামে কোনো গণতন্ত্র নেই অথবা "ইসলামে গণতন্ত্র হারাম" তাদেরকে খোলাফায়ে রাশেদীন- এর গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে। সঠিক ধারণা অর্জন না করে শুধু অসার মন্তব্য করা থেকে তাদের বিরত থাকা উচিত। তা নাহলে হয়তো তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তাই তাদের এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
পশ্চিমা ও ইসলামী গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ: 
১.সার্বভৌমত্বের ভিত্তি: ইসলামী গণতন্ত্রে আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মানবজাতি তার বিধান পালনে বাধ্য। কুরআন বলে ‘শাসন ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর’ [সূরা-১২, ইউসুফ:৪০]। অর্থাৎ কুরআন হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন।  পশ্চিমা গণতন্ত্রে মানুষই শাসনের মূল উৎস। জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন।  ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল ‘জনগণের শাসন, জনগণের জন্য।’ সেটি ছিল পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারণা। ২.আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তন: ইসলামী গণতন্ত্র কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক অপরিবর্তনীয় মূলনীতি রয়েছে। মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন দ্বারা শরিয়াহর সীমা লঙ্ঘন করা চলবে না। কেউ যদি শরিয়াহর কোনো মৌলিক হুকুম পরিবর্তন করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিমা গণতন্ত্রে আইন জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। সময়ের প্রয়োজন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইচ্ছা অনুযায়ী সংবিধান বা আইন সংশোধন সম্ভব।৩.ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক: ইসলামী গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও ধর্ম অভিন্ন। ধর্মীয় নীতিই রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তি। মদিনা সনদে ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পশ্চিমা গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত ব্যাপার; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ধর্মের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নেই। ৪.নেতৃত্ব ও প্রতিনিধি নির্বাচন: ইসলামিক গণতন্ত্র যোগ্যতা, তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ও আমানতদারিতার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও শরিয়াহর সীমাবদ্ধতার বাইরে কাউকে নেতৃত্বে আনা বৈধ নয়। অর্থাৎ শরিয়াহর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।পশ্চিমা গণতন্ত্রে ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা নৈতিক যোগ্যতা প্রাথমিক বিবেচ্য নয়, বরং জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক প্রভাব মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হলেও ইসলামী গণতন্ত্রে সেটি অনুসরণ করা হয় না। ৫.মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা: ইসলামিক গণতন্ত্রে মানবাধিকার নিশ্চিত, তবে তা আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে। যেমন: বাকস্বাধীনতা রয়েছে, কিন্তু তা অন্যের সম্মান বা ধর্মের অবমাননা করার অনুমতি দেয় না। ইসলামে গীবত, অপবাদ বা ধর্ম বিদ্বেষী উক্তি নিষিদ্ধ। পশ্চিমা গণতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিসর অনেক বিস্তৃত। তবে বাকস্বাধীনতার নামে ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেও বৈধতা পাওয়া যায়। যেমন: কটূক্তি, কার্টুন বিতর্ক ইত্যাদি।
৬.ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ধরণ: ইসলামিক গণতন্ত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাপকাঠি হলো শরিয়াহর নীতিমালা। ধনী-গরিব, মুসলিম-অমুসলিম সবাই সমান ন্যায়বিচার পায়। রাসুল (সা.) বলেছেন; ‘তোমার প্রিয়জন হলেও যদি অন্যায় করে, তবে তার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দাও।’ পশ্চিমা গণতন্ত্রে ন্যায়বিচার মানবিক চাহিদা ও সাংবিধানিক নীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত। তবে ন্যায়বিচারের  ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তি অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও বিচার প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিক সামর্থবান লোকদের পক্ষে চলে যায়। ইসলামী গণতন্ত্রে অপরাধী ব্যক্তির বিচারে প্রভাবশালী নেতা বা বিত্তশালী বিবচ্য বিষয় নয়। সুতরাং পশ্চিমা গণতন্ত্রের রীতি-নীতি অপেক্ষা ইসলামী গণতন্ত্র সাবলীল। 
সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ:বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে ইসলামী গণতন্ত্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। কারণ পশ্চিমা প্রভাব ও স্যেকুলার মতাদর্শের প্রসার, ইসলামী নেতৃত্বের কিছুটা দুর্বলতা ইসলামী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনৈক্য ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভাজন, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচার, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং এক শ্রেণির লোকেরা "ইসলামে গণতন্ত্র হারাম" বলে প্রচার করা বা ফতুয়া দেয়া। অন্যদিকে পশ্চিমা গণতন্ত্রও নানা সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত। যেমন: গণমাধ্যম ও করপোরেট প্রভাবের মাধ্যমে জনমত নিয়ন্ত্রণ, নীতিহীন রাজনীতি, চরিত্র ও কর্মে ভিন্নতা, আন্ত-বিভাজন, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য, সামাজিক ও নৈতিকতার অবক্ষয় এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির মহোৎসব। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা জরুরি।
ইসলামিক গণতন্ত্রের সম্ভাবনা: ইসলামী গণতন্ত্রের সম্ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি ও প্রতিষ্ঠিত  হয়, তাহলে ইসলামী গণতন্ত্র রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সমতার ভিত্তিতে শাসন নিশ্চিত করতে পারবে। রাষ্ট্রে দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবে। জনগণের অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে, জনগণের মানবিক মর্যাদা ও নৈতিকতা সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামী গণতন্ত্র ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য মূলত সার্বভৌমত্ব, আইন প্রণয়ন, ধর্মের ভূমিকা ও নৈতিকতার মানদণ্ডে নিহিত রয়েছে। ইসলামী গণতন্ত্র মানব কল্যাণের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। অপরদিকে পশ্চিমা গণতন্ত্র জনগণের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ মাপকাঠি মনে করে। যদিও তা অনৈতিক কাজ ও দুর্নীতির মহোৎসবকে প্রশ্রয় দেয়। ইসলামী গণতন্ত্র সততা, নৈতিকতা ও তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, যা দুর্নীতিকে ঘৃণা করে। তাই ইসলামী গণতন্ত্র যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা মানবজাতিকে প্রকৃত ন্যায়বিচার, সাধারণ মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন,
শান্তি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হবে। সুতরাং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মডেল গড়ে তোলা ইসলামী দর্শন বিজ্ঞানীদের সময়ের অনিবার্য দাবি। এ দাবি পূরণ করতে হলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। এক্ষেত্রে রাসুল (সা)-এর শিখানো পদ্ধতি সকল মুসলিম রাষ্ট্রকে অনুসরণ করতে হবে। বিপ্লব বা জিহাদ করতে হলে রাসুল (সা)-এর পদ্ধতিতে করতে হবে। যদিও চূড়ান্ত বিপ্লবের পূর্বের সকল প্রস্তুতিই বিপ্লব বা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা)-এর পদ্ধতি হচ্ছে: ১.কুরআন ও সুন্নাহর আহ্বান মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে, ২. যাদের মাঝে পৌঁছানো হবে তাদেরকে সুসংগঠিত করতে হবে, ৩. বিপ্লবের উপযোগী করে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং ৪. চূড়ান্ত পর্যায়ে বিপ্লবের ডাক দিয়ে বিজয় অনিবার্য করে তুলতে হবে। আর খোলাফায়ে রাশেদীন-এর রেখে যাওয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে ইসলামী গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করতে হবে। তাহলেই বিশ্বব্যাপী ইসলামী গণতন্ত্র সফল হবে।


লেখক : শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট। প্রাক্তন ফেলো: মারটিনবিল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র, ক্যান্টসবিল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য ও আলরাজী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
১৮/৮/২৬



সংবাদটি পড়া হয়েছে : 321        
  
  সর্বশেষ
হরমুজে দুই মার্কিন যুদ্ধজাহাজসহ ১০টি জাহাজে হামলা ইরানের
মহাখালীতে ভবনে আগুন
এসবিএসি ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ মাকছুদুর রহমান সরকার এফসিএমএ
ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে জানালেন ট্রাম্প



প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত ।
ফোন: ০২৪১০৭০৯৯৬ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪

Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com