মো. সহিদুল ইসলাম সুমন : বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় কোনো দেশের নিরাপত্তা আর কেবল সীমান্ত পাহারা, সামরিক শক্তি কিংবা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ—সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই বাস্তবতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত চুক্তিতে একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। চুক্তিটিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ এবং অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের নামও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের স্বার্থ, অর্থনীতি ও জনগণের জন্য সম্ভাব্য সুবিধা-ঝুঁকি পর্যালোচনা করা হবে।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দেবে কি না—তা নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণ থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে? অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জ্বালানি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা আদায় করা সম্ভব? আর বিপরীতে কী ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাটি হতে পারে অর্থনৈতিক কূটনীতি। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত এবং সৌদি আরব বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিশাল উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বন্ধনে সীমাবদ্ধ রাখেনি; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
এই সম্পর্ককে এখন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশকে সৌদি শ্রমবাজারে শুধু বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর দেশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষ ও উচ্চদক্ষ মানবসম্পদ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। চিকিৎসা, নার্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, হসপিটালিটি, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কারিগরি খাতে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। মক্কা চুক্তিকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হলে দক্ষ কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে নতুন দ্বিপক্ষীয় কাঠামো তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এখানে বাংলাদেশের একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত—শ্রমবাজারের পরিমাণ নয়, গুণগত মান ও শ্রমিকের আয় বাড়ানো। একই সংখ্যক কর্মী যদি আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ আয় করতে পারেন, তবে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে তার প্রভাব হবে বহুগুণ বেশি। তাই মক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতির জন্যও একটি নতুন দর-কষাকষির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় এবং আরও বড় সম্ভাবনা সৌদি বিনিয়োগ। সৌদি আরব তার Vision 2030-এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বহুমুখী ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। এর ফলে সৌদি পুঁজির জন্য নতুন বাজার ও নতুন বিনিয়োগক্ষেত্র প্রয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশ এখানে একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বন্দর, লজিস্টিকস, কৃষি, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, আবাসন, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্প খাতে সৌদি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা গেলে সম্পর্কটি নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি পেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শুধু ‘বিনিয়োগ চাই’ বললে চলবে না। বরং নির্দিষ্ট প্রকল্পের তালিকা নিয়ে সৌদি বিনিয়োগকারীদের সামনে যেতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন, ওষুধ শিল্প, হাসপাতাল, পর্যটন অবকাঠামো এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য পৃথক ‘বাংলাদেশ-সৌদি স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট প্যাকেজ’ তৈরি করা যেতে পারে।
বিশেষ করে খাদ্যনিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। সৌদি আরব বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চুক্তিভিত্তিক কৃষি, কৃষিপণ্য উৎপাদন, মৎস্য, হিমায়িত খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রে সৌদি বাজারকে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অন্যতম প্রধান গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।
এখানে হালাল অর্থনীতি হতে পারে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নতুন খাতগুলোর একটি। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন, পরীক্ষাগার ও উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সৌদি আরবের বাজার ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও অন্যান্য হালাল পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ সৌদি বাজার শুধু একটি বাজার নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের বাজারে প্রবেশের সেতু হতে পারে।
তৃতীয় বড় সম্ভাবনা বাণিজ্য সম্প্রসারণ। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও তৈরি পোশাকনির্ভর। অথচ সৌদি বাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, সিরামিক, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালাল খাদ্য, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইসিটি সেবা রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য কৌশলগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, পণ্য অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, হালাল সার্টিফিকেশন স্বীকৃতি, কাস্টমস সহযোগিতা, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি তেল সরবরাহ, জ্বালানি অবকাঠামো, পেট্রোকেমিক্যাল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি বিনিয়োগকে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আনা গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংরক্ষণ, গ্রিড উন্নয়ন ও সবুজ প্রযুক্তিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করা যেতে পারে।
তবে মক্কা চুক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক নিরাপত্তা সহযোগিতা। বাংলাদেশ তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা থেকে লাভবান হতে পারে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সামরিক প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামুদ্রিক নিরাপত্তার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশপথ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি এবং জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে মক্কা চুক্তির মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষায় সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল পেমেন্ট, সরকারি তথ্যভান্ডার, বন্দর, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এখন সাইবার হামলার ঝুঁকিতে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সৌদি আরবের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন কর্মসূচির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রযুক্তি সহযোগিতা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নতুন দরজা খুলতে পারে।
তবে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে। মক্কা চুক্তিতে যোগদান করলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও সতর্ক করা হয়েছে যে প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ভারসাম্য ও জোটনিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত আন্তঃনির্ভরতা রয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশ যুক্ত হলে নয়াদিল্লির উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে ঢাকাকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রতিবেশী সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন হতে হবে, যাতে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
এখানেই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে, তাহলে কয়েকটি বিষয়কে জাতীয় স্বার্থের পূর্বশর্ত হিসেবে সামনে আনা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেন বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে সীমাবদ্ধ না করে। দ্বিতীয়ত, কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বাংলাদেশের স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের সুস্পষ্ট কাঠামো থাকতে হবে। চতুর্থত, সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশকে চুক্তির সদস্য হওয়ার আগে লাভের সুনির্দিষ্ট হিসাব করতে হবে।
শুধু আবেগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হয় না। মক্কা মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম শহরগুলোর একটি—এটি সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিবেচনায়। তাই মক্কা চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাব থাকা স্বাভাবিক হলেও সিদ্ধান্তটি হতে হবে বাস্তববাদী।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বিরল সুযোগ রয়েছে—সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের সামরিক ও কৌশলগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের মানবসম্পদ, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থানকে যুক্ত করা। এই সমন্বয় যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে মক্কা চুক্তি শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো থাকবে না; এটি বাংলাদেশকে নতুন বিনিয়োগ, নতুন বাজার, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দিতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে আগে থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মক্কা চুক্তি জাতীয় স্বার্থ কাঠামো’ তৈরি করতে হবে। কোন খাতে কত বিনিয়োগ চাই, কোন পণ্যের বাজার চাই, কতজন দক্ষ কর্মীর জন্য সুযোগ চাই, কী ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রয়োজন, কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো হবে—সবকিছুর সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকতে হবে।
বাংলাদেশের উচিত হবে না কেবল কোনো জোটের সদস্য হওয়ার গৌরব খোঁজা। বরং সদস্যপদকে ব্যবহার করতে হবে অর্থনৈতিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে।
বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, আগামী দিনের শক্তি শুধু সেনাবাহিনীর আকারে নয়; শক্তিশালী অর্থনীতি, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বয়েই রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হবে।
মক্কা চুক্তি তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনা, আবার একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা। আবেগ দিয়ে নয়, জাতীয় স্বার্থের কঠিন হিসাব দিয়ে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অংশ হওয়া নয়; বরং এমন একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করা, যেখানে নিরাপত্তা সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ে।
মক্কা চুক্তিকে যদি সেই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কাঠামোয় কাজে লাগানো যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়—বরং নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com