ফিরোজ মাহবুব কামাল
ব্যর্থতা ঈমানদার হওয়ায়
ঈমানদার ও বেঈমান -সবাই পানাহার ও আলো বাতাস নিয়ে বাঁচে। তবে একই দেশের অভিন্ন আলো বাতাসে বাস করলেও সবাই একই ভাবে এবং একই উদ্দেশ্যে বাঁচে না। কে কিভাবে বাঁচে এবং কিভাবে প্রাণ দেয় -তা থেকে বুঝা যায় ব্যক্তির ঈমানদারি ও বেঈমানি। ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো, একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত খেলাফতের তথা প্রতিনিধির দায় নিয়ে বাঁচা। একমাত্র সে উদ্দেশ্যেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। ফলে আল্লাহ তায়ালার সে খলিফা অন্য কোন রাজশক্তি বা ব্যক্তির খলিফা হতে পারেনা। ঈমানদারির এটিই হলো মূল কমুসলিমের জ্ঞানার্জনের শুরুটি এখান থেকেই হতে হয়। শুরুটি হতে হয় নিজেকে জানা নিয়ে। সে যে মহান সৃষ্টিকর্তার খলিফা তথা সম্মানিত প্রতিনিধি -ঈমানদারকে সেটি চেতনার ভুবনে বদ্ধমূল করতে হয়। এ জগতের নানা সৃষ্টির পরিচয় জানার আগে নিজের পরিচয়টি প্রথমে জানতে হয়। সে পরিচয়টি না জানাই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা তথা সবচেয়ে বড় জাহিলিয়াত। এ জাহিলিয়াত থেকে মুক্তি না জুটলে সারা জীবন জাহিলিয়াতের স্রোতে হাবুডুবু খেতে হয়। এরই ভয়ানক পরিণাম হলো, আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে যাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল তারাই শয়তানের খলিফায় পরিণত হয়। ইসলামকে বাদ দিয়ে তারা ফ্যাসিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, রাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের পক্ষের সৈনিকে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যাটি বিশাল; রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতির অঙ্গণে তারাই বিজয়ী শক্তি।
প্রশ্ন হলো, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে, তারা কি কখনো কোন কাফির শক্তি, রাজশক্তি বা স্বৈরাচারী শাসক শক্তির সৈনিক হতে পারে? সেটি তো হারাম। ঈমানদারির অর্থ, মহান রব’য়ের খলিফা রূপে বাঁচা; সেরূপ বাঁচার পুরষ্কার হলো জান্নাত। যারা ঈমানদার হতে ব্যর্থ হয়, তারাই কাফির হয়। তারাই আল্লাহ ভিন্ন অন্য সত্ত্বা তথা শয়তান ও তার অনুসারীদের খলিফা হয়। তাদের জন্য প্রতিশ্রুত স্থানটি হলো জাহান্নাম। মহান রব’য়ের হিসাবটি এক্ষেত্রে সহজ। প্রকৃত ঈমানদার তো তারাই যারা প্রতিমুহুর্ত সে সহজ হিসাবটি মগজে রেখে কর্মে ও রাজনীতিতে নামে এবং নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। এ দুনিয়ায় কে কার খলিফা রূপে বেঁচেছে এবং কাকে বিজয়ী করতে সে তার সামর্থ্যের বিনিয়োগ করেছে -আখেরাতে সেটিরও হিসাব দিতে হবে।
ঈমানদারি নিয়ে বাঁচার অর্থ হলো, সকল নেক আমলের পূর্ণ প্যাকেজ নিয়ে বাঁচা। এর মধ্যে সকল নেক আমল দেখা যায়। এর মধ্যে পবিত্র কুর’আন শেখা ও শেখানো, নামাজ রোজা, হ্জ্জ যাকাত, তাসবিহ তাহলিল এবং জিহাদও এসে যায়। এর মধ্যে যেমন তাঁর বাঁচার নিয়ত দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় সে কোন পক্ষকে বিজয়ী করার যুদ্ধ নিয়ে বাঁচলো সেটিও। ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো, মহান আল্লাহর পথে সার্বক্ষণিক জিহাদে লিপ্ত মুজাহিদ হওয়া। সে জিহাদ যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র। ঈমানদার হওয়া ও আল্লাহর পথে মুজাহিদ হওয়া তাই সমার্থক। এর অর্থ: যে ব্যক্তি ঈমানদার, সে ব্যক্তিই মুজাহিদ। সে কথার প্রতিধ্বনি এসেছে সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে। সুরা হুজরাতের সে আয়াতে মহান রব একমাত্র তাদেরকেই ঈমানদার বলেছেন, যাদের জীবনে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাসের সাথে জিহাদ আছে। এবং সে জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগ আছে। ঈমানদারদের জন্য আরো সুখবর এসেছে নিচের আয়াতটিতে। আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর যাদের উপর ঈমান আছে তাদেরকে করুণাময় মহান রব নিচের আয়াতে সিদ্দিক ও শহীদ বলেছেন। নবী-রাসূলদের পরই এ বিশেষ পদমর্যাদা। সে মর্যাদার ঘোষণা এসেছে এভাবে:
وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ أُولَـٰئِكَ هُمُ الصِّدِّيقُونَ ۖ وَالشُّهَدَاءُ عِندَ رَبِّهِمْ لَهُمْ أَجْرُهُمْ وَنُورُهُمْ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَـٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
অর্থ: “আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনলো তারাই হলো তাদের রব’য়ের দরবারে সিদ্দীক ও শহীদ। তাদের জন্যে রয়েছে পুরস্কার ও নূর এবং যারা কাফের ও আমার নিদর্শন অস্বীকারকারী -তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।” –(সুরা হাদীদ, আয়াত ১৯)।
স্রেফ ঈমানের কারণে ঈমানদারের এতো বড় সম্মান? ঈমানদার মাত্রই সিদ্দীক ও শহীদদের সমান? উপরিউক্ত আয়াতে অন্য কোন নেক আমলের কথা বলা হয়নি। বিষয়টি শুধু ভাববার বিষয় নয়, বিস্ময়ের বিষয়ও। কিন্তু সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারের যে সংজ্ঞাটি পেশ করেছেন, সে সংজ্ঞাটি স্মরণে রাখলে সুরা হাদীদের ১৯ আয়াতের বয়ান বুঝা সহজ হয়ে যায়। অনেক সময় কুর’আনের এক আয়াতের ব্যাখা আরেক আয়াতের মধ্যে পাওয়া যায়। সেটি বুঝা যায় সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে এবং সুরা হাদীদের ১৯ আয়াত -এ দুটি আয়াত একত্রে পড়লে। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে ঈমানদার একমাত্র তাদেরই বলা হয়েছে যাদের রয়েছে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমানের সাথে জিহাদের জান ও মালের বিনিয়োগ এবং রয়েছে শহীদ হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি। অর্থাৎ ঈমানদার মাত্রই জিন্দা শহীদ।
নিরেট বেঈমানি শুধু আল্লাহ তায়ালাকে অবিশ্বাস করা নয়, বরং তার নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও দায়িত্বহীন হওয়া। অভিশপ্ত ইবলিসও আল্লাহ তায়ালাকে অবিশ্বাস করতো না। কিন্তু তার অপরাধ, সে বিদ্রোহ করেছিল তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে। তার ছিল মানবের বিরুদ্ধে অবজ্ঞা। তাই ঈমানদার হওয়ার শর্ত হলো তাকে ঈমানদারির পরিচয় দিতে হয় নিত্য দিনের প্রতিটি কর্মে, ভাবনায় ও তাড়নায়। কোন চাকুরিতে যোগ দিলে প্রথমেই জানতে হয়, সে প্রতিষ্ঠানে তার মূল দায়িত্বটি কি? দায়িত্বের সে কথাটি না জানলে দায়িত্বপালনের কাজটি সঠিক ভাবে হয় না। তখন চাকুরিও থাকে না। তেমনি মু’মিনের প্রথম দায়িত্ব হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তার উপর অর্পিত দায়িত্বটি সঠিক ভাবে জানা। ব্যক্তির মুসলিমত্ব নির্ভর করে সে অর্পিত দায়িত্বের কথাটি জেনে সঠিক ভাবে সে দায়িত্ব পালনের উপর। প্রতিটি ঈমানদারের উপর পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত সে অর্পিত দায়টি হলো, এ জমিনে মহান আল্লাহ তায়ালার খেলাফতের তথা প্রতিনিধিত্বের।
কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারির বেতন কোটি টাকা নয়। কিন্তু সে নির্ধারিত বেতন পেতে তাকে অর্পিত দায়িত্বটি সঠিক ভাবে পালন করতে হয়। সে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা লাগে। সে কাজটি কখনোই নিরক্ষর, অশিক্ষিত ও দায়িত্বহীন ব্যক্তির দ্বারা হয়না। দায়িত্ব পালনে অবহেলা দেখালে চাকুরি হারাতে হয়। অপর দিকে মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফার পুরস্কারটি বিশাল। সেটি অনন্তকালের জন্য অফুরন্ত নিয়ামত-ভরা জান্নাত। জান্নাতের এক বর্গহাত ভূমিও হিমালয় সমান স্বর্ণ দিয়ে কেনা যাবে না। ফলে যারা জান্নাতে যেতে চায় তাদের দায়িত্বটিও বিশাল। সে দায়িত্ব পালনে অপরিহার্য হলো ঈমানী বল এবং সঠিক আকিদা। থাকতে হয় মহান রব’য়ের পথে জান-মাল কুর’বানীর পূর্ণ প্রস্তুতি। ঈমানী বলটি দুর্বল হলে দৈহিক বল, অর্থের বল, অস্ত্রের বল ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল কোন কল্যাণই দেয় না। সেগুলি বরং ক্ষতির অঙ্ক বাড়ায় এবং জাহান্নামে হাজির করে।
মুসলিমদের মূল ব্যর্থতাটি হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে বাঁচায়। বিষয়টি গুরুতর। যে জন্য মানবের সৃষ্টি, তারা ব্যর্থ হয়েছে সে লক্ষ্য অর্জনে। বস্তুত এ ব্যর্থতাই মুসলিম উম্মাহর সকল ব্যর্থতার জনক। নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দান-খয়রাত নিয়ে বাঁচছে বহু কোটি মুসলিম, বহু লক্ষ মুসলিম সমগ্র কুর’আন শরিফ মুখস্থ করেছে। কিন্তু তাদের মাঝে ক’জন বাঁচছে মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে? নামাজী, হাজী ও কুর’আনের হাফিজ হওয়া এবং আল্লাহ তায়ালার খলিফা হওয়া এক কথা নয়। খলিফা হওয়ার দায়টি বিশাল। তখন মহান আল্লাহ তায়ালার ধর্মীয়, ভূ-রাজনৈতিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক এবং বৈচারিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করার দায় নিতে হয়। তখন জিহাদে নামতে হয় এবং সে জিহাদে নিজের সর্বসামর্থ্যের বিনিয়োগ করতে হয়। স্রেফ নামাজী, হাজী ও হাফিজ হতে এরূপ কুরবানী দিতে হয়না। পরিতাপের বিষয় হলো, যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় তাদের অধিকাংশই ব্যর্থ হয়েছে আল্লাহ তায়ালার খলিফা হতে। তারা পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়। বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে তারাই মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও শরিয়াসহ সকল এজেন্ডা পরাজিত করে রেখেছে; এবং বিজয়ী করেছে জাতীয়তাবাদ, দলীয় ফ্যাসিবাদ, সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম মতবাদকে।
ব্যর্থতা আল্লাহ তায়ালার সৈনিক হওয়ায়
মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহর দলের সৈনিক তথা আনসার হওয়া। কারণ সে নির্দেশটি খোদ মহান আল্লাহর। ইসলামের মৌলিক নীতি হলো, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যখন কোন নির্দেশ আসে তখন সেটি পালন করা ফরজ হয়ে যায়। বিদ্রোহ করলে কাফির হতে হয়। সে নির্দেশটি এসেছে এভাবে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنصَارَ اللَّهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّينَ مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ ۖ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ ۖ فَآمَنَت طَّائِفَةٌ مِّن بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَت طَّائِفَةٌ ۖ فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَىٰ عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ
অর্থ: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনসার তথা সাহায্যকারী হয়ে যাও, যেমন ঈসা ইবনে-মরিয়ম তাঁর শিষ্যগণকে বলেছিল, আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে? শিষ্যগণ বলেছিল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। অতঃপর বনী-ইসরাঈলের একদল বিশ্বাস স্থাপন করলো এবং এক দল কাফের হয়ে গেল। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, আমি তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবেলায় শক্তি জুগালাম, ফলে তারা বিজয়ী হল।”।
উপরিউক্ত আয়াতে প্রতিটি ঈমানদারের উপর মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশ হলো, তারা যেন তাঁর আনসার তথা সাহায্যকারী হয়। কারণ, মহান রব তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার যুদ্ধে সৈনিক চান। তিনি চান, সে সৈনিক আসবে মানবদের মধ্য থেকে, ফিরেশতাদের থেকে নয়। অতীতে নবী-রাসূলগণও তাঁদের অনুসারীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন আল্লাহ তায়ালার আনসার তথা সাহায্যকারী হয়। সেরূপ নির্দেশ যেমন হযরত ঈসা (আ:) ও হযরত মূসা (আ:) দিয়েছেন, তেমনি হযরত মহম্মদ (সা:)ও দিয়েছেন। যারা সে নির্দেশ পালন করেছে তারাই মুসলিম গণ্য হয়েছে। যারা বিদ্রোহ করেছে, তারাই কাফির গণ্য হয়েছে। উপরের আয়াতে সেটি পুণরায় সুস্পষ্ট করা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে শয়তানী শক্তির যুদ্ধ প্রতিক্ষণ। শয়তানের প্রতিরোধে মুসলিম জীবনেও তাই প্রতিক্ষণ যুদ্ধ থাকে -কখনো সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো রাজনৈতিক, আবার কখনো সশস্ত্র। প্রতিটি ঈমানদার হলো সে যুদ্ধের সৈনিক।
কুর’আন শিক্ষা, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, তাসবিহ তাহলিল হলো মুসলিম জীবনের প্রতিদিনের প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ যেমন ঈমানদারের জীবনে পরিশুদ্ধি আনে, তেমনি তাঁর চেতনায় জিহাদী জজবাকে বাঁচিয়ে রাখা। তবে সৈনিক জীবনের মূল মিশনটি শুধু প্রতিদিন প্রশিক্ষণ নেয়া নয়, বরং সেটি হলো দেশের প্রতিরক্ষায় রণাঙ্গণে হাজির হওয়া। প্রয়োজনে সে কাজে প্রাণ দেয়া। এটিই তো সৈনিকের মূল কাজ। দেশ যখন শত্রুর আগ্রাসনের শিকার, তখন যদি কোন সৈনিক যুদ্ধে না নেমে শুধু প্রশিক্ষণের কাজে ব্যস্ততা দেখায় -তবে কি তাকে আদৌ সৈনিক বলা যায়? সে তো ফাঁকিবাজ বিশ্বাসঘাতক। দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য তার কোর্টমার্শাল হয়। বিচারে তাকে শাস্তি পেত হয়। তেমনি মুসলিম জীবনের মূল মিশনটি হতে হয় মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফার দায়িত্ব পালন। সে অর্পিত দায়িত্বটি হলো, সকল মিথ্যা ধর্ম ও সকল মিথ্যা মতবাদের উপর মহান আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের বিজয়। দায়িত্ব হলো, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া আইনের প্রতিষ্ঠা। দায়িত্ব হলো, অবিচার ও জুলুমের নির্মূল (নেহী আনিল মুনকার) এবং সুবিচার ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা (আ’মিরু বিল মারুফ)।
ব্যর্থতা ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে
মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বপালনের কাজটি কখনো একাকী হয়না, শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন এবং মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা দিলেও হয়না। সে জন্য জরুরি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ, একমাত্র রাষ্ট্রের হাতে থাকে অবিচারের নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আইনসম্মত নির্বাহী অধিকার, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো; থাকে জনবল এবং থাকে আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার কাজটি বিশাল ও ব্যয়বহুল। একাজে অবিরাম জিহাদ আছে; জান ও মালের বিশাল কুরবানী আছে। সে কাজের সামর্থ্য আসে গভীর তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় বা আল্লাহ-সচেতনতা থেকে। নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও কুর’আন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো সে তাকওয়া সৃষ্টি। প্রশ্ন হলো, দেশ যদি ইসলামের শত্রু পক্ষের হাতে অধিকৃত হয়, যদি বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া বিধান -তখন কি কোন মুসলিম স্রেফ নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে? শুধু দ্বীনের তাবলিগ ও দান খয়রাত কি জুলুম-নির্যাতন নির্মূল করে? এমন মুসলিমকে কি সত্যিকার মুসলিম বলা যায়? সে তো সে গাদ্দার সৈনিকের ন্যায় যে শত্রুর হামলার মুখে যুদ্ধে না নেমে শুধু ট্রেনিংয়ে সময় কাটায়।
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির যে মর্যাদা সেটি এজন্য নয় যে, তারা বেশি বেশি নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও যিকির পালন করে। বরং এজন্য যে তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয়, নির্মূল করে দুর্বৃ্ত্তির এবং পূর্ণ বিশ্বাস করে মহান আল্লাহ তায়ালার উপর -যার উল্লেখ এসেছে সুরা আল ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে। লক্ষাধিক নবী রাসূল প্রেরণ ও আসমানী কিতাব নাজিলের মূল উদ্দেশ্যও ছিল এই সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। যেমন বলা হয়েছে,
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِٱلْبَيِّنَـٰتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ ٱلْكِتَـٰبَ وَٱلْمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا ٱلْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌۭ شَدِيدٌۭ وَمَنَـٰفِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥ وَرُسُلَهُۥ بِٱلْغَيْبِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ قَوِىٌّ عَزِيزٌۭ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ; এবং তাদের সাথে প্রেরণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি -যাতে মানুষ প্রতিষ্ঠা দিতে পারে ন্যায় বিচার। এবং নাযিল করেছি লৌহকে যার মধ্য রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং তাতে রয়েছে মানুষের জন্য কল্যাণ। এবং এভাবে আল্লাহ প্রকাশ করে দেন তাদেরকে যারা নিজ চোখে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। আল্লাহ অবশ্যই শক্তিমান ও পরাক্রমশালী।”–(সুরা হাদীদ, আয়াত ২৫)।
সুরা হাদীদের উপরিউক্ত আয়াতে সুস্পষ্ট করা হয়েছে নবী রাসূল প্রেরণ ও কিতাব নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তায়ালার মূল এজেন্ডা হলো, সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যা ও দুর্বৃত্তির নির্মূল। সে এজেন্ডাকে কীভাবে বিজয়ী করতে হয় - নবীজী (সা:) সেটিই হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন। নবীজী (সা:)’য়ের পক্ষ থেকে সেটিই হলো ইসলামী রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের মূল পাঠ। মুসলিম রূপে দায়িত্ব পালনের জন্য নবীজী (সা:)’য়ের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া প্রত্যেক মুসলিম নারী পুরুষের জন্যই জরুরি। ইসলামের কাঙ্খিত বিপ্লবটিকে সফল করতে চাই শক্তিশালী রাষ্ট্র । সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরক্ষা দিতে চাই বিরামহীন জিহাদ। সে জিহাদের মুজাহিদ হতে হয় প্রতিটি নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তিকে। কারণ, রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, মিডিয়া, সেনা বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়া ন্যায় ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা দেয়া এবং অবিচার ও দুর্বৃত্তির নির্মূলের কাজটি অসম্ভব। তখন বিফল হয় ইসলামী রাষ্ট্রের মিশন। নবীজী (সা:)কে তাই সকল ঈমানদারদের সাথে নিয়ে শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিতে হয়েছে। সে রাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বড়। তিনি ১০টি বছর সে রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। এটিই হলো নবীজী (সা:)’য়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। নবীজী (সা:)’য়ের নেতৃত্বে সে রাষ্ট্র নির্মিত হওয়াতে পৃথিবীর বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে বিজয়ী হওয়ায়র সুযোগ মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা।
অথচ আজ সেরূপ একটি ইসলামী রাষ্ট্র না থাকায় মুসলিমগণ বাঁচছে জাতীয়তাবাদী, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী এজেন্ডার ন্যায় শয়তানী এজেন্ডাকে বিজয়ী করে। কারণ মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তাদের হাতে অধিকৃত। অনৈসলামী রাষ্ট্রের শাসকগণ শুধু নিজেদের নয়, সাথেীদের এবং অনুসারীদেরও প্রস্তুত করেছে জাহান্নামের যোগ্য রূপে। বাংলাদেশের মত দেশে যারা বাঁচে গুম, খুন, গণহত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির জোয়ারে ভেসে - তাদের স্পষ্ট বেঈমানি ও বিদ্রোহ তো মহান আল্লাহ তায়ালার কুর’আনে ঘোষিত এজেন্ডার সাথে। সেক্যুলারিস্টদের শাসনে সেটিই তো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রশ্ন হলো, যেসব মোল্লা মৌলভী ও আলেম আল্লামা নিজেদেরকে আশেকে রাসূল (সা:) রূপে জাহির করেন, তাদের জীবনে নবীজী (সা:)’য়ের সে সূন্নত কই? তারা কেন নবীজী (সা:)’য়ের সে ভূ-রাজনীতির প্রতিষ্ঠায় ময়দানে নেই? প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের যে ড্রাইভিং সিটে খোদ নবীজী (সা:) বসেছিলেন এবং বসেছিলেন সেসব মহান সাহাবাগণ -সে আসনে কি কোন দুর্বৃ্ত্ত ভোটডাকাত, নৃশংস ফ্যাসিস্ট ও খুনিকে বসানো যায়?
নৃশংস অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ার বিপদ তো ভয়ানক। তখন ক্ষমতাসীন অপরাধী ব্যক্তিটি দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন বাহিনী, আদালতের বিচারক বাহিনী ও নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদেরকে নিজের চুরি ডাকাতি, ভোটডাকাতি, জুলুমবাজী ও নানাবিধ দুর্বৃত্তির সহযোগী করে। বাংলাদেশে ভোটডাকাত খুনি হাসিনা তো সেটিই করেছে। ফলে শত শত নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশীকে নিছক রাজনৈতিক কারণে পুলিশ, RAB, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর হাতে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এমন কি নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত করা হয় আদালতের বিচারকদেরও; সেটি বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলায় শাস্তি দিয়ে। স্বৈরাচারী শাসকের এজেন্ডা পূরণে মেরুদন্ডহীন বিচারকগণ পরিণত হয় সরকারবিরোধীদের নির্মূলে বৈচারিক খুনিতে। হাসিনার আমলে বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতার ফাঁসি হয়েছে তো এসব আদালতের বিচারক নামধারী খুনিদের হাতে।
বাস্তবতা হলো, জালেম স্বৈরশাসকদের তুলনায় ডাকাত পল্লীতে বসবাসকারী চোর ডাকাত, সন্ত্রাসী ও খুনিদের হাতে সেরূপ অপরাধের সামর্থ্য থাকে না। কারণ, তাদের হাতে থাকে না পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, প্রশাসন বাহিনী ও বিচারক বাহিনী। এজন্যই গণহত্যা, বর্ণবাদী নির্মূল, বিশ্বযুদ্ধ ও পারিমানবিক বোমার ব্যবহারের ন্যায় মানব ইতিহাসের অতি ভয়ানক অপরাধগুলি কখনোই বনের হিংস্র পশু বা ডাকাতপল্লীর ডাকাতদের হাতে সংঘটিত হয়নি, সেগুলি হয়েছে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা নৃশংস অপরাধীদের হাতে যাওয়াতে। তাই বাংলাদেশে তাই যত মানুষ সংক্রামক জীবাণু, বিষাক্ত পোকা মাকড় বা হিংস্র পশুর নখরে মারা যায় -তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মারা যায় সরকারি বাহিনীর গুলিতে। তাই বিষাক্ত সাপ বা হিংস্র বাঘ ভালুক হত্যায় এতো সওয়াব নাই -যা রয়েছে জালেম শাসকের নির্মূলে। এজন্যই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদ হলো জালেম শাসক নির্মূলের জিহাদ। এমন রক্তাক্ত জিহাদের ময়দানে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালা সরাসরি জান্নাতে উঠার সিঁড়ি নামিয়ে দেন। কারণ জিহাদের মালিকানাটি খোদ মহান রব’যের। সে সিঁড়িটি শাহাদতের। এ শাহাদতের স্বাদ কখনোই খানকায় বন্দী সুফি দরবেশ, পীর, ইমাম, মোহাদ্দেস ও তাবলিগী হুজুরগণ পায় না।
বুঝতে হবে, নামাজী, হাজী, সুফি দরবেশ, পীর, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার মোহাদ্দেস ও তাবলিগী হুজুর হওয়াটি সহজ; ততটা সহজ নয় ঈমানদার হওয়া। প্রকৃত ঈমানদার তো তারাই যাদের থাকে জিহাদের এবং জিহাদে শহীদ হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি -যা বার বার বলা হয়েছে পবিত্র কুর’আনে। প্রকৃত ঈমানদারের প্রতিটি কথা ও কর্মই ইবাদত এবং প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। তাঁর বাঁচার মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার প্রচণ্ড তাড়না দেখা যায়। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতার মূল কারণ কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে ব্যর্থতা নয়; বরং সেটি হলো প্রকৃত ঈমানদার হতে ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতাই সকল ব্যর্থতার জননী। মুসলিম জীবনী নামাজী, রোজাদার ও হাজী হওয়া যত গুরুত্ব পেয়েছে, ততটা গুরুত্ব পায়নি ঈমানদার হওয়া। যে পথে চলাটি পূর্ণ ঈমানদার হওয়ার জন্য অপরিহার্য সে পথে চলার কাজটিও হয়নি। পানি ছাড়া কোন প্রাণীই বাঁচে না, তেমনি কুর’আনী জ্ঞান ছাড়া ঈমান বাঁচে না। কুর’আনী জ্ঞান যে ঈমান বাঁচাতে পুষ্টি জুগায় -সে কথাটি এসেছে সুরা আনফালের ২ নম্বর আয়াতে। এজন্যই নামাজ রোজা ফরজ করার আগে সর্বজ্ঞানী মহান রাব্বুল আলামীন কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে সর্বপ্রথম ফরজ করেছিলেন। কিন্তু মুসলিমগণ আজ সেটিকেই প্রথমে পরিত্যাগ করেছে। বড় জোর তারা কুর’আন তেলাওয়াত করে, তবে কুর’আন বুঝার চেষ্টা করে না। ফলে তারা জ্ঞানার্জনের ফরজ পালনে নাই। এতে অসম্ভব হচ্ছে ঈমানদার হওয়া। আর এখান থেকেই মুসলিম উম্মাহর সকল ব্যর্থতার শুরু। ৮/৯/২০২৬