মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন : বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) ও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হলেও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন উৎপাদন ও রপ্তানির বহুমুখীকরণ।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। তবে অতিরিক্ত প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশ সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত আরও তিন বছর সময় দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে তা কেবল সময়ক্ষেপণের সুযোগ নয়; বরং অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। কারণ এলডিসি-পরবর্তী সময়ে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা কমে আসা, শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এর স্থায়ী সমাধান হলো একটি আধুনিক, বৈচিত্র্যময় ও টেকসই শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
দুর্ভাগ্যবশত, এই রূপান্তরের ঐতিহাসিক মুহূর্তেই দেশীয় উৎপাদন খাত অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপের মুখোমুখি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিশৃঙ্খলা, ডলারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট আজ উৎপাদনমুখী খাতের চাকা স্তব্ধ করে দেওয়ার উপক্রম করেছে। উৎপাদন খাত যদি অচল হয়ে পড়ে, তবে জাতীয় কর্মসংস্থান থমকে যাবে, সংকুচিত হবে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় এবং পুরো সামষ্টিক অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার গর্ভে নিপতিত হবে। এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে চারটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে সমন্বিত সংস্কার ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রথমত, যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME)। বাংলাদেশে গড়ে ওঠা মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ শতাংশই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা দেশের অকৃষি খাতের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান ক্ষেত্র এবং জিডিপিতে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রত্যক্ষ অবদান রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মহামারী, ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা ও লজিস্টিক খরচের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এদের গভীর সংকটে ফেলেছে।
বর্তমানে এসএমই খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চরম অপ্রাপ্তি ও মূলধনের অভাব। ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের বোঝা থাকলেও বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো অলিখিত সুবিধায় ঋণ পেয়ে যায়, অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যান। কঠোর জামানত নীতি (Collateral Policy) এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে প্রান্তিক ও নতুন উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। এর ওপর যোগ হয়েছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও কাঁচামালের চড়া দাম, যার ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় পণ্যের সামগ্রিক চাহিদা মারাত্মকভাবে কমেছে; ফলে বহু ক্ষুদ্র কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা লোকসান গুনে টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক নীতি ঘোষণা করলে চলবে না; বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ও জামানতহীন শর্তে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (TIN) সনদ ও ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া `সিঙ্গেল উইন্ডো` ডিজিটাল ব্যবস্থায় সহজ করতে হবে। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে এসএমই খাতকে সরাসরি যুক্ত করা দরকার। এছাড়া সরকারি কেনাকাটায় (Public Procurement) স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য অন্তত ২০-২৫ শতাংশ সুনির্দিষ্ট কোটা রাখা আবশ্যক। এসএমই খাত টিকে না থাকলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে, কারণ এটি কেবল অর্থনীতির চাকা সচল রাখে না, সম্পদের সামাজিক বণ্টনও নিশ্চিত করে।
দ্বিতীয়ত, শিল্পায়নের অপর মূল চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী শক্তি বা বিদ্যুৎ। সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া আধুনিক শিল্পায়ন অসম্ভব। গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও শিল্পের প্রাথমিক জ্বালানি—বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের টেকসই ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের বহু বস্ত্র ও টেক্সটাইল কারখানা, সিরামিক শিল্প এবং রি-রোলিং মিল প্রায়শই তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
বিশ্ববাজারে এলএনজি (LNG) মূল্যের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে সময়মতো জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা শিল্প খাতকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না পেয়ে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ফলে কারখানার স্থির খরচ (Fixed Cost) একই থাকলেও উৎপাদন কমে গিয়ে পণ্যের একক প্রতি উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় আমাদের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো ভিয়েতনাম বা ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জ্বালানি নীতির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানির আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশে দ্রুততম সময়ে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির প্রসারে কারখানার ছাদ বা খালি জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ (Rooftop Solar) স্থাপনে শিল্প মালিকদের শুল্ক ছাড় দেওয়া এবং ব্যাক-টু-ব্যাক সহজ ব্যাংক ঋণে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা দরকার। সবুজ অর্থায়নের (Green Financing) মাধ্যমে কারখানায় পরিবেশবান্ধব ও কম জ্বালানি-ব্যয়কারী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এছাড়া শিল্প উদ্যোক্তারা যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করতে পারেন, সেজন্য বারবার গ্যাসের দাম পরিবর্তন না করে অন্তত ৫ বছর মেয়াদি একটি স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য জ্বালানি মূল্যনীতি বজায় রাখা আবশ্যক।
তৃতীয়ত, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন পরিবেশ ও নগরায়ণের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশ দূষণ রোধ এবং টেকসই শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (Economic Zones) ও হাই-টেক পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট স্থানে আধুনিক অবকাঠামো, ইউটিলিটি সংযোগ, উন্নত লজিস্টিক সুবিধা এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস (OSS) দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ধীর।
অনেক জায়গায় জমি বরাদ্দ হলেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিলম্বিত হচ্ছে। দেশি ও বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা এবং কর নীতির অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। একই সাথে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সাথে বন্দর ও মহাসড়কের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ধীরগতিতে চলায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল বিনিয়োগ প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখছে না বা প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সফল করতে হলে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে বাস্তবে এক ছাদের নিচ থেকেই সব ছাড়পত্র ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব অঞ্চলে সংযোগ এখনো অসম্পূর্ণ, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। সেই সাথে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত কর অব্যাহতি (Tax Holiday) বা শুল্ক সুবিধাগুলোতে ঘন ঘন পরিবর্তন না এনে নীতিগত স্থায়িত্ব বজায় রাখা জরুরি।
চতুর্থত, যেকোনো বৈদেশিক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে দেশকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর বর্ম হলো `আমদানি বিকল্প শিল্প উন্নয়ন` (Import Substitution Industrialization)। ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, কৃষি যন্ত্রপাতি, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিশাল অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এই চাহিদার একটি বড় অংশ এখনো আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নির্ভর করে মিটাতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি ডলার সংকটের কারণে যখন ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র (LC) খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে যেসব পণ্য দেশে তৈরি সম্ভব, তার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং, ইলেকট্রিক্যাল ও ডিজিটাল যন্ত্রাংশ, ফার্নিচার এবং কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশের আমদানি বিকল্প শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এই শিল্পকে উৎসাহিত করতে দেশে প্রস্তুত করা সম্ভব এমন সমাপ্ত পণ্যের (Finished Goods) ওপর যৌক্তিক আমদানি শুল্ক বজায় রাখা এবং দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে বিএসটিআই-এর মান নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়িয়ে দেশীয় পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ করবে, তাদেরকে বিশেষ কর ছাড় ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।
শিল্পায়ন কেবল কারখানা ভবন বা যন্ত্রপাতির বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম বা পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের শিল্পায়নের এই দীর্ঘযাত্রায় সবচেয়ে বড় তিনটি বাধা হলো—নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। সরকার বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পূর্বের নিয়মকানুন হুট করে বদলে গেলে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি থাকা বাঞ্ছনীয়। ব্যাংক খাত, রাজস্ব বিভাগ এবং শিল্প প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে না।
একইসঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের এই যুগে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ বেশিদূর এগোতে পারবে না। আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক শিল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের চাহিদার (Industry-Academia Collaboration) যে সুগভীর ব্যবধান রয়েছে, তা অনতিবিলম্বে দূর করা জরুরি। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও শিল্প খাতগুলোতে উচ্চ পদের জন্য বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে কোটি কোটি ডলার দেশ থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা এসব পদের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিতে পারেন।
বাংলাদেশ একটি বিশাল সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরুণ জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্প্রসারণশীল অভ্যন্তরীণ বাজার আমাদের অনুকূলে রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের শিল্পায়নের কৌশলকে নতুন যুগের উপযোগী করে সাজাতে হবে। এসএমই খাতকে টিকিয়ে রেখে প্রান্তিক অর্থনীতিকে সচল করা, জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভরতার হাত থেকে বাঁচিয়ে আত্মনির্ভরশীল করা, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মাধ্যমে পরিকল্পিত পরিবেশ তৈরি করা এবং আমদানি বিকল্প শিল্পের মাধ্যমে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা—এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে আগামীর আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে, সমন্বিত নীতি গ্রহণ করে এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতি সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার মাধ্যমেই কেবল উৎপাদন খাতের গতি ধরে রাখা সম্ভব। সত্য ও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নীতি গ্রহণ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
Email : msislam.sumon@gmail.com