| |
| মহানবী (সা) এর আদর্শই সর্বোত্তম আদর্শ |
| |
|
|
|
|
|
|
|
| |
| |
|
| |
| |
| ড. বি এম শহীদুল ইসলাম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আদর্শই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম আদর্শ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন; "তোমাদের জন্য রাসুলের চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ"। [সুরা আহযাব:২১ আয়াত, সুরা মুমতাহিনা:৬]।পৃথিবীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও মহান ব্যক্তিত্ব ও মহামানব হযরত মুহাম্মাদ (স)। তার আদর্শ, রীতি-নীতি ও সীরাত সম্পর্কে আলোচনা করে শেষ করা কঠিন। কারণ রাসুল (সা)-এর সমগ্র জীবনটায় উত্তম আদর্শ। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও আল্লাহর প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী ও রাসুল। আরবের জাহেলি যুগের অবসান ঘটিয়ে উন্নত যুগের অবতরণা ও মানবতার মুক্তির দিশারি। মহানবী বিশ্ববাসীর জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। মহান আল্লাহ তায়ালার ভাষায় তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন। অর্থাৎ গোটা বিশ্বের জন্য তিনি রহমতস্বরূপ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "হে মুহাম্মাদ! আমি তোমাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি"।[সুরা-২১ আম্বিয়া:১০৭ আয়াত]। আল্লাহ তায়ালা প্রিয় নবী করীম (সা)-কে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে পাঠিয়েছেন। গোটা পৃথিবীকে আলোকিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন; "হে নবী! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে। এবং আল্লাহর নির্দেশে তার প্রতি আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে"। [সুরা আহযাব:৪৫-৪৬]। সুতরাং নবী করীম (সা)-এর প্রতি আমারা সম্মান, মর্যাদা, সশ্রদ্ধ সালাম ও কোটি কোটি দরূদ প্রেরণ করা অপরিহার্য।। জন্ম ও বংশ পরিচয়: মুহাম্মদ (সা) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে সোমবার প্রত্যুষে পৃথিবীর কোল আলোকিত করে আরবের মক্কা নগরীতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তবে নবী করীম (সা)- এর জন্ম তারিখ নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ৯ রবিউল আউয়াল এবং কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী ১১ রবিউল আউয়াল জন্ম গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। মহানবী (স)-এর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মমতাময়ী মাতার নাম আমিনা। নবী করীম (সা)-এর জন্মের প্রায় দুই মাস পূর্বে তাঁর পিতা মারা যান। আর মাত্র ৬ মাস বয়সে তার মা ইন্তেকাল করেন। তখন থেকে তিনি দুধ মা হালিমার কোলে লালিত পালিত হন। পাশাপাশি পিতা-মাতার অবর্তমানে শৈশবে তাঁকে দেখাশোনা করেন তাঁর দাদা আব্দুল মুতালিব ও চাচা আবু তালিব। দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন বিখ্যাত কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী নেতা। শৈশব থেকেই মুহাম্মদ (সা) ছিলেন শান্ত-শিষ্ট, ভদ্র, বিনয়ী সত্যের অন্বেষণকারী ও জাহেলিয়াতের কালিমামুক্ত। কৈশোরে তাঁর হৃদয়ে সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ে ভাবাগের উদ্ভব হয়। সমকালীন আরব সমাজের মারামারি, হানাহানি, খুনখারাবি ও বিশৃঙ্খলা দেখে তাঁর কোমল হৃদয় ব্যথিত হয়। তিনি চিন্তা করলেন কিভাবে হানাহানি বন্ধ করা যায় এবং আর্ত-পীড়িতদের সেবা করা যায়। এ জন্য সমবয়সী তরুণদেরকে ঐক্যবদ্ধ করলেন। আর গঠন করলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সামাজিক শান্তি সংঘ। চলমান অন্যায়যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল তাদের লক্ষ্য, যা সে যুগের তরুণ-যুবকদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাদের এ উদ্যোগে অন্যায়যুদ্ধ বন্ধ হলেও সমাজের অন্ধকার-কুসংস্কার দূর হলো না। এতে মুহাম্মদ (সা)-এর কোমল হৃদয় আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন মানবমুক্তির অন্বেষায়। চলে যান মক্কার অদূরে নির্জন হেরা গুহায়। সেখানে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন তিনি। খুঁজতে থাকেন মানবতার মুক্তির আলোকবর্তিকা। এমতাবস্থায় মুক্তির দিকনির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা জিবরাইল ফিরেশতাকে পাঠান তাঁর কাছে। জিবরাইল (আ) এসে মহান আল্লাহর বাণী পড়তে বললেন মুহাম্মদ (স)-কে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় তিনি পড়তে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। মূলত তখন থেকেই তার শিক্ষা জীবনের সূত্রপাত হয়। অনেকে মহানবী (সা)-কে নিরক্ষর বলে থাকেন। আসলে তিনি শুধু শিক্ষিতই নন, বিশ্ব জগতের একজন মহান শিক্ষক। জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহর ওহি নাযিলের পর তিনি শিক্ষা লাভ করেন। তার ওপর কুরআন নাযিলের ঘটনা নিচে প্রদত্ত হল। আর মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসেবে মনোনীত করেন। অধিকন্তু মানবতার মুক্তির পথনির্দেশ দিয়ে তাঁর ওপর আল কুরআন অবতীর্ণ করেন। কুরআন নাযিলের ঘটনা: হযরত মুহাম্মাদ (সা) প্রায়ই হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান মগ্ন থকতেন। হযরত খাদিজা (রা) তাকে কয়েক দিনের খাবার প্রস্তুত করে দিতেন। তারপর তিনি বাড়িতে ফিরে আবার কয়েক দিনের খাবার নিয়ে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান মগ্ন থকতেন।পূর্বের ন্যায় একদিন নবী করীম (সা) তখন হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ তার ওপর অহি নাযিল হলো। জিবরাঈল ফেরেশতা তার নিকট এসে বললেন; "পড়"। তারপর হযরত আয়েশা (রা) নিজেই রাসুল (সা)-এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। রাসুল (সা) বললেন; আমি বললাম, `আমি তো পড়তে জানি না`। তারপর জিবরাঈল আমাকে ধরে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন। এমনকি আমি তা সহ্য করার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেললাম। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন; "পড়"! আমি বললাম, `আমি তো পড়তে জানি না`। জিবরাঈল দ্বিতীয় বার আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ভয়ানক চাপ দিলেন। তখন আমার সহ্য করার শক্তি প্রায় শেষ হতে লাগলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, `পড়"! আমি আবার বললাম, "আমি তো পড়তে জানি না"। তিনি তৃতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন। তখন আমার সহ্য করার শক্তি খতম হবার উপক্রম হলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, "পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন"। তারপর নবী করীম (সা)-এর কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে পবিত্র কুরআনের এ মহান বাণী "ইক্বরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খলাক্ব..... থেকে পাঁচটি আয়াত। সুরা-৯৬, `আলাক -এর প্রথম থেকে পঞ্চম আয়াত পর্যন্ত। কুরআনের এ মহান বাণী আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর অবতীর্ণ শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এ নিয়ামত গোটা পৃথিবীর শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েতের গ্রন্থ। রাসুলের (সা) প্রতি অবতীর্ণ এ গ্রন্থে আল্লাহ তায়ালা বলেন; "তোমাদের জন্য রাসুলের চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ"। [সুরা আহযাব:২১ আয়াত]। মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ: তারপর তিনি মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। তাওহীদের বাণী ও মুক্তির প্রদীপ হাতে নিয়ে ছুটে চলেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। মুক্তিকামী মানুষ তাঁকে সহজে গ্রহণ করলেও অন্ধকার-কুসংস্কারাচ্ছন্নে নিমজ্জিত পাপাচারী ব্যক্তিরা বাধা সৃষ্টি করে। তারা অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে, ষড়যন্ত্র করে, লোভ দেখিয়ে, যুদ্ধ-সংঘর্ষ বাধিয়ে মুহাম্মদ (সা)- এর অগ্রযাত্রাকে প্রতিরোধ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু সত্যনিষ্ঠ ও দৃঢ়প্রত্যয়ী মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর সাহায্যে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকেন। আর মহান আল্লাহর নির্দেশনা ও নিজের চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে তিনি মানুষের মন জয় করেন। ফলে জাহেলিয়াতের সকল অন্ধকার দূরীভূত হয়ে সত্য-ন্যায়ের আলো উদ্ভাসিত হয় সমগ্র আরব বিশ্বে। ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় অর্ধ পৃথিবী জুড়ে। মদিনা আল মুনাওয়ারায় মসজিদে নববী থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন মুহাম্মদ (সা)। দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সে রাষ্ট্রে সকল ধর্মের লোকেরা শান্তিতে বসবাস করার অবারিত সুযোগ পায়। অবশেষে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আওয়াল তারিখে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে মদিনা আল মুনাওয়ারায় তিনি ইন্তেকাল করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা) ইন্তেকাল করলেও বিশ্ব ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। সততা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতাসহ সব ধরণের সৎ ও নৈতিক গুণাবলির সমন্বয় ঘটেছিল মহানবী (সা) এর জীবনে। লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষসহ মানবিক কোনো দুর্বলতা তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। সারা জীবন কাটিয়েছেন সত্য ও ন্যায়ের পথে। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন ইস্পাত কঠিন বিপদ আর প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে। তাঁর অনুসৃত নীতি ও আদর্শ সারা বিশ্বের প্রায় একশত নব্বই কোটি মানুষ পালন করেন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতিসহ জীবনের সামগ্রিক ক্ষেত্রে মহানবী (সা) এর অনুপম আদর্শ অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ। মহান আল্লাহর বাণী ‘আল্লাহর রাসুল (সা)- এর জীবনাদর্শে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ [আল কুরআন]। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন; "তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে রাসুলের (সা) আদর্শ"।[সুরা ফাতহ:২৭ আয়াত]। পারিবারিক জীবন: পারিবারিক জীবনে মহানবী (সা) ছিলেন একজন আদর্শ অভিভাবক। শত ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবারের প্রতি ছিলেন যথাযথ দায়িত্বশীল। হযরত মুহাম্মদ (সা) আদর্শ স্বামী ছিলেন। তিনি স্ত্রীদের অধিকার যথাযথভাবে পালন করেছেন। এ কারণে একাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে স্ত্রীদের কোনো অভিযোগ ছিল না। স্ত্রীদের যথাযথ অধিকার আদায় ও তাঁদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে তিনি বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন; ‘তোমরা মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমাদের স্ত্রীদের গ্রহণ করেছ; সুতরাং তোমরা তাদের সাথে সদাচরণ করবে। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে’। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ করতে তিনি উল্লেখ করেছেন; `তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’[আবু দাউদ ও তিরমিযি]। মহানবী (সা) ছিলেন একজন স্নেহপরায়ণ পিতা। তিনি সন্তানদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেননি এবং অন্যরাও যেন বৈষম্য না করেন সে জন্য তিনি সন্তানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা)- এর ভূমিকা অনন্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে ও রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত ছিল। শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে তাঁর আদর্শ অনুকরণীয়। আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি তিনি ছিলেন যথাযথ দায়িত্বশীল। তাদের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন আন্তরিক ও যত্নশীল। তিনি নিজে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সবসময় সদাচরণ করেছেন এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন; ‘আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ [বুখারি ও মুসলিম]। এমনিভাবে প্রতিবেশীদের প্রতি সদাচরণ ও সহানুভূতিতে তাঁর তুলনা অনস্বীকার্য। প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। প্রতিবেশীদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যার প্রতিবেশী তাঁর নির্যাতন থেকে নিরাপদ নয়।’ [বুখারি ও মুসলিম]। অধিকন্তু গরিব-অসহায় প্রতিবেশীকে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে উল্লেখ করেছেন; ‘সে ব্যক্তি মুসলিম নয়, যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তাঁর প্রতিবেশী অভুক্ত অবস্থায় রাত কাটায়।’ [বায়হাকি]। এ ছাড়া নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, দাস প্রথা উচ্ছেদ ও কৌলিন্য প্রথা বিলোপ করে সাম্য ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা) অনুকরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাসুল (সা): রাষ্ট্র ব্যবস্থায় হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন উদার ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ নীতি। এ কারণে মদিনায় প্রতিষ্ঠিত শাসন ব্যবস্থায় ইহুদি খ্রিস্টান পৌত্তলিকসহ সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। ধর্ম-বর্ণের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার করাই ছিল তাঁর বিচার পদ্ধতি। এ জন্য তিনি সম্ভ্রান্ত কিংবা নিকৃষ্ট, উঁচু অথবা নীচু হিসেবে জাতিকে বিভাজিত করেননি। রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ন্যায়বিচারে অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন; ‘ন্যায়বিচারে তোমরা সাবধান হবে! অতীতে অনেক জাতি ন্যায়বিচার না করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমার কন্যা ফাতেমার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারও হাত কাটা হবে।’ [বুখারি ও মুসলিম]। মহানবী (সা) এর এমন কঠোর ন্যায়বিচারে জাহেলি আরব সমাজেও শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। মহানবী (সা) ভিন্ন ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী ছিলেন। এ জন্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে তিনি সদাচরণ করেছেন। পৌত্তলিক তায়েফবাসী প্রতিনিধিদলকে তিনি মদিনার মসজিদে স্থান দিয়েছেন। একইভাবে নাজরানের খ্রিস্টানদের জন্য মসজিদে নববীতেই উপাসনার ব্যবস্থা করেছেন। ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে তিনি মদিনায় আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এমনিভাবে ভিন্ন ধর্মের প্রতি তিনি উদারতা দেখিয়েছেন। মহানবী ছিলেন দয়া ও ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। যাদের অত্যাচারে তিনি বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। যারা তাঁকে মাতৃভূমি মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছে তাদের জন্য বিজয়ের পর তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। চরম শত্রুকেও পরম মমতায় তিনি কাছে টেনে নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) অনুপম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। মহান আল্লাহর ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আপনি মুহাম্মদ (সা) উত্তম চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।’ [ সুরা আল কালাম: ৪]। মানব রচিত কোনো চিন্তা-চেতনা, ধ্যান- ধারণা ও মতাদর্শ প্রচার ও অনুসরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে কোনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পরকালীন জীবনেও মুক্তি পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। এক সময় কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ গোটা বিশ্বের জয়জয়কার মতবাদ হিসেবে গণ্য হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও কিউবাসহ বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরিশেষে বলতে চাই, সারা বিশ্বে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে মহানবী (সা)- এর আদর্শ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে ইরান ও ফিলিস্তিনসহ গোটা পৃথিবীকে যেভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বৈরী নীতির মাধ্যমে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং পার্শ্ববর্তী হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র যেভাবে মুসলিমদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে মুসলিম নিধন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, রাসুল (স)-এর আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলে আমদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং আসুন, রাসুল (সা)-এর আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে গণজাগরণ সৃষ্টি করি। লেখক: শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট। ২০/০৮/২৬
|
| |
|
|
|