ড. বি এম শহীদুল ইসলাম : শিক্ষকগণ পরিশীলিত মানুষ তৈরির রিসোর্স পার্সন। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক শিক্ষকগণ জাতির দর্পণ। জাতিকে সুষ্ঠু সাবলিল ও পরিশীলিত মানুষরূপে গড়ে তোলার কাজে জীবন পানি করে স্বার্থহীনভাবে পরিশ্রম করেন। তাই মানুষ গড়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শিক্ষকের ভূমিকা মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরকালই অনন্য এক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবে। শিক্ষকতাকে অনেকেই মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে ট্টিট করে থাকেন। আমি বললাম মানুষ গড়ার ইঞ্জিনিয়ার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কক্ষের চার দেয়ালের ভেতরে বেত-বাঁশের সমাহার থাকুক অথবা না থাকুক বর্তমান সময়ের হোয়াইট বোর্ড-মার্কার আর অতীতের শ্লেট এবং চক, ডাস্টার আর ব্ল্যাক বোর্ড হাতে করে যারা শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে তাদের মানসপটে নতুন জগতের উদ্ভব ঘটান, তাদের চিন্তা-ভাবনা, এক্সপ্লোর আর গবেষণার পরিধি কেবল পাঠ্য পুস্তকের বাঁধাধরা নিয়ম-নীতির গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমানা পেরিয়ে সমাজ বিনির্মাণ, জাতির বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা, নীতি-দর্শন এবং সামগ্রিক জাতি গঠনের যে দৃষ্টি বহির্ভূত অথচ গভীর দায়িত্ব শিক্ষকরা পালন করেন, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসার ফল্গুধারা প্রবাহিত করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসের পাতাগুলোতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে অগণন অনুপ্রেরণাদায়ক ও উৎসাহ ব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত আমাদের নজরে আসবে, যেখানে রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পদে এমন সব ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব আসীন হয়েছেন, যাদের তৃণমূল পর্যায়ের আইডেনটিফিকেশন ও প্রোফেশনাল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেড়ার ঘর, মাটির ঘর, টিনের ছাপড়া অথবা ইটের লাল দালানের ছোট অথবা বড় রকমের শ্রেণি কক্ষ। ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার এ মেলবন্ধন কিভাবে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল, তা উপলব্ধি করতে হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-রাষ্ট্রনায়কদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আলেখ্য, ইতিহাস, দর্শন ও রাজনৈতিক উত্থানের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি দেওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। বিশ্বের এমন অনেক ব্যক্তিত্ব `জীবনের পান্তা ভাতের আমানী` পাড়ি দিয়ে রাজ সিংহাসনের মুকুটে পরিণত হয়েছেন, যারা অনেকেই ছিলেন শিক্ষক, কেউবা ছিলেন পেপার বিক্রেতা, কেউবা চা বিক্রেতা, কেউ আবার ছিলেন দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত দারুণ অভাবী। তবে শিক্ষক নামের মানুষ গড়ার ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা কম নয়। এসব ইঞ্জিনিয়ারাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতির আসন অলংকৃত করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়। তাদের কয়েকজনকে নিয়েই আমার আজকের এ ক্ষুদ্র অবতারণা।
১. রাধাকৃষ্ণন: সক্রেটিস ছিলেন প্রাচীন কালের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক। খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০-৩৯৯ খৃষ্টাব্দের ঘটনা। তিনি অসাধারণ জ্ঞানী লোক ছিলেন। তাই তাকে বলা হতো "ওয়াইজ ম্যান অব দ্য ওল্ড"। আমি তখন স্কুলের কোনো এক শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। হঠাৎ করে স্কুল পরিদর্শনে শিক্ষা বিভাগের বড় কর্মকর্তার আগমন। পদবি এসডিও। শিক্ষকগণের বুক তো ধপাস ধপাস করছে!! ক্লাসে একজন শিক্ষক এসে সতর্ক করে বলে গেলেন, এসডিও এসেছে, তোমরা প্রস্তুত হও। কিছুক্ষণ পর প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকগণ অতিথি এসডিও-স্যারকে সাথে নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। এসডিও স্যার ঢুকেই তড়িৎ গতিতে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হু ওয়াজ সক্রেটিস"? উত্তরটা ভাগ্যক্রমে আমার জানা ছিল। আমি সাথে সাথে সাহস করে দাঁড়িয়ে জবাব দিলাম, "হি ওয়াজ দ্য গ্রেটেস্ট ফিলোসোপার অব এ্যানশিয়েন্ট গ্রিক"। তিনি একই প্রশ্ন আরো দুই বার করলেন। কারণ আমার উত্তরে একটি শব্দ অতিরিক্ত বলে ফেলেছিলাম। অর্থাৎ `অব`-এর পর `হিজ` বলেছিলাম। প্রচন্ড ভীতির কারণেই হয়তো এটি হয়েছে। যেটি আমি নিজেও বুঝতে পারিনি যে, কোনো একটি শব্দ বেশি বলেছি। তারপর তিনি দ্বিতীয় বার পুনরায় একই প্রশ্ন করলেন। আমি আগের মতই উত্তর বললাম। তিনি তৃতীয় বার একই প্রশ্ন করার সাথে সাথে আমার আর বুঝতে বাকি থাকল না যে, আমার একটুখানি ভুল হয়েছে। তখন আমি বলে ফেললাম; "Socrates was the greatest Philosopher of ancient Greece". সঠিক উত্তর জানার পর এসডিও স্যার খুব খুশি হলেন এবং আমার শিক্ষকগণকে ধন্যবাদ জানালেন। তবে আমার ভুলটা কি ছিল সেটি তো বলা হয়নি। সেটি ছিল `অব` এর পরে `হিজ` শব্দের ব্যবহার। এ ঘটনা বলার কারণ নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পেরেছেন। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আর আমি ঐসব বিখ্যাত মনীষীদের মতোই একজন শিক্ষক, "যদিও আমার মতো একজন পিপীলিকাতুল্য ক্ষুদ্র মানুষটি কখনো ঐসব বিখ্যাত মনীষীদের কাতারে যাওয়ার স্বপ্নই দেখে না"।
বর্ণিত এই সক্রেটিস-এর ছাত্র ছিলেন প্লেটো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক’-এ একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দিতে গিয়ে ‘দার্শনিক রাজা’র ধারণা তুলে ধরেছিলেন। প্লেটোর মতে, যিনি দর্শনের মর্ম বোঝেন এবং জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের সন্ধান করেন, তিনিই রাষ্ট্রের সবচেয়ে উপযুক্ত শাসক হিসেবে গণ্য হন। শিক্ষকগণ লোভ লালসার উর্ধ্বে উঠে মানুষকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তাই তারা মহৎ। বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন ভারতে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া যেন সেই প্রাচীন দর্শনেরই এক আধুনিক ও বাস্তব রূপায়ণ ছিল। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর তিরুত্তানি নামের এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৮৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাধাকৃষ্ণন। অর্থাভাব তার শৈশবকে তাড়া করলেও মেধা ও অদম্য ইচ্ছা শক্তির জোরে তিনি দর্শন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে এম এ শেষ করে তিনি শিক্ষকতাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে বেছে নেন। কর্ম জীবনের শুরুতে তিনি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের জুনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ১৯২১ সালে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কিং জর্জ পঞ্চম দর্শনের অধ্যাপক’ হিসেবে মনোনীত হন। রাধাকৃষ্ণনের পাণ্ডিত্য ও প্রাচ্য দর্শনের গভীর ব্যাখ্যা কেবল ভারতের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৩৬ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইস্টার্ন রিলিজিয়নস অ্যান্ড এথিকস’ বিভাগের স্প্যাল্ডিং অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রাচ্যের বেদান্ত দর্শন এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তাধারার মধ্যে এক চমৎকার বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
১৯৬২ সালে তিনি যখন স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। কিন্তু ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য শিক্ষক পরিচয় ভুলে যাননি। রাষ্ট্রপতি ভবনের আড়ম্বর তার সরল জীবনযাপনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার রাষ্ট্রপতিত্বের সূচনালগ্নে যখন একদল ছাত্র ও অনুরাগী তার জন্মদিন মহা-আড়ম্বরে উদযাপনের অনুমতি চাইতে আসেন, তখন এই মহান শিক্ষক নির্দ্বিধায় বলেছিলেন; “আমার জন্মদিন ব্যক্তিগতভাবে উদযাপন না করে যদি দিনটিকে সমগ্র দেশের শিক্ষকদের প্রতি উৎসর্গ করা হয় এবং ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, তবে আমি সবচেয়ে বেশি গর্বিত ও সম্মানিত হব।” সেই থেকে আজ অবধি প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর দিনটি ভারতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রনায়ক রাধাকৃষ্ণন তার প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নৈতিক দর্শনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কারণ তিনি তার অতীত পরিচয় শিক্ষকতাকে ভুলে যাননি।
২.ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ: প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনের পর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব পালন শেষে বাঙলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু শিক্ষকতার মর্যাদাকে তিনি আমৃত্যু ধরে রেখেছেন।
৩.মির্জা ফখরুল: বাংলাদেশর ইতিহাসে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে ৩৫ বছর পর্যন্ত একদলীয় প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। তার এ মনোনয়ন ছিল দলের চরম সংকটকালে এক রাজপথের সৈনিকের প্রতি স্বীকৃতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি।পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। ১৯৭৯ সালে তিনি তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ৭৮তম বছরে দাঁড়িয়ে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিক এখন বঙ্গভবনের মানুষ। এখানে আমরা একজন শিক্ষককে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে পাই।
৪. এপিজে আবদুল কালাম: ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বড় পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন ড. এপিজে আব্দুল কালাম। তার মধ্যে মানবতা ও শিক্ষকতার এক অনুপম সমন্বয় ছিল। তিনি ছিলেন ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি। তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের এক সাধারণ নৌকার মাঝির ঘরে জন্ম নেওয়া আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আবদুল কালামের জীবন ছিল এক অনন্ত এথিকস। এক সময় সংবাদপত্র বিক্রি করে যার পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়েছিল, তিনিই পরবর্তীতে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (DRDO) নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে পরমাণু ও মহাকাশ প্রযুক্তির এ্যালিট ক্লাবে প্রবেশ করান। তাকে ভূষিত করা হয় ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ উপাধিতে। এটি তার জন্য বড় গৌরবের বিষয়। কিন্তু এই সুবিশাল বৈজ্ঞানিক সাফল্যের চেয়েও কালামের হৃদয়ের গভীরতম টান ছিল শ্রেণি কক্ষ, গবেষণা এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের প্রতি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই তিনি ভারতের আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনোলজি অ্যান্ড সোসাইটাল ট্রান্সফরমেশন বিভাগের প্রফেসর হিসেবে তরুণদের মাঝে প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার নিয়ে পাঠদান করতেন। ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর রাইসিনা হিলসের রাষ্ট্রপতি ভবনটি পরিণত হয়েছিল এক উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে। প্রোটোকলের বেড়াজাল ভেঙে তিনি হাজার হাজার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করতেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের মনে আত্মবিশ্বাস ও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস বপিত করা। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের সফল মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলো তাকে আরও এক মেয়াদে রাখার আগ্রহ দেখালেও তিনি সরাসরি রাজনীতি বা ক্ষমতার মোহে না জড়িয়ে আবার ফিরে যান তার প্রিয় শ্রেণি কক্ষে। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরদিনই তিনি শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দেন। এটি ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। আন্না বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের আইআইএম শিলংয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘লাইভেবল প্ল্যানেট আর্থ’ বিষয়ে ভাষণ দেওয়ার সময় ডায়াসেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং ইন্তেকাল করেন।
৫. বারাক ওবামা: ওবামা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী বৈশ্বিক নেতা। বারাক ওবামার বাগ্মিতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ১২ বছরের শিক্ষকতার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে আইন ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ওবামা ছিলেন হার্ভার্ড ল রিভিউয়ের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সভাপতি। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বড় বড় করপোরেট আইনি প্রতিষ্ঠান থেকে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব পেলেও ওবামা শিকাগোতে নাগরিক অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৯২ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ল স্কুলে সাংবিধানিক আইনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগ তিনি সেখানে লেকচারার ও সিনিয়র লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা করেন। তার পাঠদানের মূল বিষয়গুলো ছিল মার্কিন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য, মার্কিন গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী চতুর্দশ সংশোধনীর আলোকে নাগরিক অধিকার ও সমতা বিধান এবং বর্ণবৈষম্য বিরোধী আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া। শিকাগোর শিক্ষার্থীদের কাছে ওবামা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিক্ষক। এই শিক্ষকই ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রতিটি নীতিতে সেই আইনের অধ্যাপকের ছাপ স্পষ্ট ছিল। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, ইরান পরমাণু চুক্তি এবং অভিবাসননীতি প্রণয়নের সময় তার আইনি সূক্ষ্মতা ও সংবিধানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করেছিল। তবে ইরান প্রশ্নে তিনি কঠোরতা অবলম্বন করেন।
৬. হোয়াইট হাউসের কর্ণধার উইলসন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রেসিডেন্ট টমাস উড্রো উইলসন ছিলেন মূলত শিক্ষাবিদ। ১৮৫৬ সালে ভার্জিনিয়ায় জন্ম নেওয়া উইলসন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল আমেরিকার কংগ্রেসীয় সরকার ব্যবস্থা। ব্রিন মার কলেজ ও ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ১৮৯০ সালে তিনি তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। অধ্যাপনা চলাকালীন তার রচিত পাঠ্যবইগুলো মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় নতুন যুগের সূচনা করে।১৯০২ সালে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আমাদের দেশে যাকে উপাচার্য বলা হয় । ১৯১০ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এর শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার এই প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতাই তাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯১২ সালে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেন যখন সমগ্র বিশ্ব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুনে রূপ নিচ্ছিল। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উইলসনের শিক্ষকসুলভ ও তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে :চৌদ্দ দফা নীতি (Fourteen Points): বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে এবং উপনিবেশবাদের অবসানে তিনি ১৯১৮ সালে মার্কিন কংগ্রেসে তার বিখ্যাত ১৪ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নৈতিকতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই তাত্ত্বিক রূপায়ণের জন্য তাকে ১৯১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এটি তার জন্য বড় গৌরবের বিষয়।
৭. প্রণব মুখোপাধ্যায়: ভারতের আর এক রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহার গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান প্রণব মুখোপাধ্যায় কিভাবে ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং পরবর্তীতে ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হলেন, তার নেপথ্যে ছিল এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তীতে আইনের ডিগ্রি অর্জনের পর প্রণব মুখোপাধ্যায় ১৯৬৩ সালে কলকাতার অদূরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিদ্যাসুন্দর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লেকচারার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। একই সঙ্গে তিনি কিছুকাল সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।শ্রেণি কক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জটিল কাঠামো, সংবিধানের ধারা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যে পাঠ তিনি ছাত্রদের দিতেন, সেই গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞানই পরবর্তীকালে রাজনীতির মাঠে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অর্থ, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রের মতো ভারতের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে সামলেছেন। রাজনীতিতে তিনি পরিচিত ছিলেন এক জীবন্ত ‘সংবিধান ও তথ্যের এনসাইক্লোপিডিয়া’ হিসেবে। যেকোনো জটিল জাতীয় সংকটে তার শিক্ষকসুলভ প্রজ্ঞা ও তথ্যনিষ্ঠ যুক্তির কাছে প্রতিপক্ষ দলগুলোও নতি স্বীকার করত। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষক দিবসে তিনি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতরের রাজেন্দ্র প্রসাদ সর্বোদয় বিদ্যালয়ের ১১শ ও ১২শ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সংবিধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস নিতেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সরাসরি পাঠদানের এই দৃশ্য বিরল। যা ইতিহাসকে নতুনভাবে সাজিয়েছে।
৮. কাস্তিলো: সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে পেদ্রো কাস্তিলোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ছিল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রূপকথা। তিনিও ছিলেন একজন শিক্ষক। আফ্রিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার চরম দরিদ্র এলাকা চোটায় জন্ম গ্রহণ করা কাস্তিলো ছিলেন এক কৃষক পরিবারের সন্তান। নিজের চেষ্টায় শিক্ষকতার ডিগ্রি নিয়ে তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর শিক্ষকতা করেন। কাস্তিলো এমন এক অঞ্চলে শিক্ষকতা করতেন, যেখানে স্কুলে যাওয়ার মতো পাকা রাস্তা ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, এমনকি শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। শ্রেণি কক্ষে শিশুদের প্রতিদিনের অভাব ও বঞ্চনা দেখতে দেখতে কাস্তিলো শিক্ষকদের অধিকার এবং গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে দেশব্যাপী শিক্ষক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে পেরুর ইতিহাসের বৃহত্তম জাতীয় শিক্ষক ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী লিমার রাজপথে নেমে আসা হাজার হাজার শিক্ষকের দাবি আদায়ে কাস্তিলোর দৃঢ় নেতৃত্ব তাকে জাতীয় নায়কে পরিণত করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে কোনো বড় করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তিনি ‘ফ্রি পেরু’ দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার নির্বাচনি প্রতীক ছিল একটি বিশাল আকারের কাঠের ‘পেন্সিল’। তিনি স্লোগান তুলেছিলেন ‘ধনী দেশে আর কোনো দরিদ্র মানুষ থাকবে না’; এবং পেরুর দীর্ঘ দিনের কোটিপতি ও অভিজাত রাজনীতিকদের পরাজিত করে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
৯. রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে কায়েস সাইদ: তিউনিশিয়া আরব বসন্তের সূতিকাগার। ২০১৯ সালে আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিশিয়ায় সংঘটিত হয় আধুনিক গণতন্ত্রের এক অনন্য ঘটনা। কোনো চিরাচরিত রাজনৈতিক দল, করপোরেট ফান্ডের প্রাচুর্য কিংবা বড় বড় ব্যানার-ফেস্টুন ছাড়াই কেবল একজন সাবেক আইনের অধ্যাপক সাধারণ মানুষের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি হলেন কায়েস সাইদ। তিউনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছিলেন কায়েস সাইদ। সারাজীবন সাদামাটা জীবন যাপন করা এ অধ্যাপক তার শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান ও আপসহীন। তিউনিশিয়ার দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম ও তার সাবেক শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়া এবং পাড়া-মহল্লায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার পক্ষে প্রচারণা চালান। কফি শপে বসে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তিনি যে আস্থা অর্জন করেন, তা তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে প্রেসিডেন্টের মসনদে বসায়। একজন শিক্ষকের সততা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে পারে, সাইদের উত্থান তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ।
১০.লেপোল্ড: সেনেগালের প্রথম প্রেসিডেন্ট লেপোল্ড সেদার সেংঘর ছিলেন একাধারে বিশ্ববরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, তাত্ত্বিক এবং পেশাদার শিক্ষক। প্যারিসের বিখ্যাত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো আফ্রিকান নাগরিক, যিনি ফরাসি ব্যাকরণ ও ভাষার সর্বোচ্চ শিক্ষকতার ডিগ্রি ‘আগ্রেগাসিওঁ’ অর্জন করেন। ফ্রান্সের বিভিন্ন খ্যাতনামা উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দীর্ঘকাল ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আফ্রিকান সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় পুনর্জাগরণের বিখ্যাত বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন নেগ্রিচিউড এর অন্যতম পুরোধা ছিলেন। ১৯৬০ সালে সেনেগাল স্বাধীন হলে সেংঘর দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা বিশ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেন। ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে ১৯৮০ সালে তিনি নিয়মতান্ত্রিক
১১. খাতামি ও আহমাদিনেজাদ: ইরানের আধুনিক রাজনীতিতে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধ্যাপনার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাবেক সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক, যার মেয়াদে ‘সভ্যতার সংলাপ’ তত্ত্ব আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এমনকি দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রইসিও বিচার বিভাগীয় দায়িত্বের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় তেহরানের ইমাম সাদেক বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে আইনের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন।
১২. জুলিয়াস নায়ারারে: তানজানিয়ার জাতির জনক ও প্রথম প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস কাম্বারাগে নায়ারারের নাম আফ্রিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরভাস্বর। ১৯২২ সালে তাঙ্গানিকার এক সাধারণ উপজাতি প্রধানের পরিবারে জন্ম নেওয়া নায়ারারে ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। উগান্ডার মাকেরেরে কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি তৎকালীন তাঙ্গানিকার সেন্ট ফ্রান্সিস কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম তাঙ্গানিকান নাগরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিলেত থেকে ফিরে এসে তিনি আবারও সেন্ট ফ্রান্সিস কলেজে শিক্ষকতায় ফিরে যান। কিন্তু পরাধীন দেশের মুক্তির তাড়নায় তিনি বেশিদিন শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেননি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে রাজনীতি ও শিক্ষকতার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা দিলে তিনি নির্দ্বিধায় দেশমাতৃকার মুক্তির স্বার্থে শিক্ষকতার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং গঠিত হয় তার নেতৃত্বে ‘তাঙ্গানিকা আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’। ১৯৬১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর তিনি দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছলেও দেশের মানুষ তাকে কোনো সামরিক বা রাষ্ট্রীয় গালভরা উপাধিতে ডাকত না; পুরো জাতি তাকে ভালোবেসে ডাকত ‘মুয়ালিমু সোয়াহিলি ভাষায় যার অর্থ ‘শিক্ষক’। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নায়ারারের গৃহীত নীতিগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শ্রেণি কক্ষের মানবিক দর্শন উপজাতি ভিত্তিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত দূর করতে তিন একটি একক ভাষার মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজ গ্রামে কৃষকের মতো জীবন যাপন করে গেছেন।
১৩. মেদভেদেভ: রাশিয়ার আধুনিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ক্রেমলিনের নীতিনির্ধারণে দিমিত্রি মেদভেদেভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক সহযোগীর ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল একজন আইনের শিক্ষক হিসেবে। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯০ সালে আইনে ডক্টরেট-ক্যান্ডিডেট অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভের পর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ানি আইন বিভাগে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর সহকারী অধ্যাপক ও লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা করেন। সিভিল ও রোমান আইনের জটিল ধারাগুলো পড়ানোর পাশাপাশি তিনি দেওয়ানি আইনের একটি প্রামাণ্য পাঠ্যপুস্তকের সহলেখক ছিলেন। ১৯৯৯ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের তৎকালীন নগর প্রশাসনের কাজে যুক্ত হয়ে তিনি সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। মেদভেদেভ প্রমাণ করেন যে, একাডেমিক আইনের নিখুঁত অনুশাসনকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কঠিন দাবা খেলায় কিভাবে রূপান্তর করা সম্ভব।
১৪.সারমিয়ন্তো, কার্দোসো ও কাস্তিলো ল্যাতিনের তিন কীর্তিমান শিক্ষক ছিলেন। ডমিঙ্গো ফাউস্টিনো সারমিয়েন্তো, ছিলেন গ্রামীণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেখান থেকে হয়েছেন আর্জেন্টিনা প্রেসিডেন্ট। তিনি আর্জেন্টিনার শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও ‘শিক্ষক-প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে পরিচিতি। ফার্নান্দো হেনরিক কার্দোসো, ছিলেন সাও পাওলো ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সেখান থেকে হয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট।
সমাপনী: শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার এ দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কিছু মৌলিক সত্য উন্মোচিত হয়। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও ধৈর্য, যোগাযোগের অসাধারণ দক্ষতা এবং নৈতিকতার মানদণ্ড। এক্ষেত্রে উইলসন, জুলিয়াস, বারাক ওবামা, ড. এপিজে কালাম দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে এই যাত্রা পথ সব সময় কুসুম-কোমল হয় না। আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতা কেন্দ্রিক বাস্তবতায় অনেক সময় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে অনেক রাষ্ট্রপতিকে। পেরুর কাস্তিলোর রাজনৈতিক সংকট তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ইতিহাসের পাতায় তাদের এ পদচিহ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার এক চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে। আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে শিক্ষকদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সংখ্যা ও ইতিহাস হয়তো সমৃদ্ধ হবে। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার এ পদ কি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে? না, কারো কারো জন্য অশান্তির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে তা দেখবার বিষয়। বাংলাদেশের সদ্য দায়িত্ব প্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম কি দায়িত্বশীলতার সাথে দায়িত্ব পালনের শেষে শিক্ষকতা পেশায় প্রত্যাবর্তন করবন ,না নতুন করে রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটাবেন তার জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। আর হ্যাঁ, বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের করুণ দশা ও প্রতিকার সম্পর্কে নতুন এ রাষ্ট্রপতি নতুন কিছু ভাববেন কি?
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক ও কলামিস্ট