নিজস্ব প্রতিবেদক: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কথিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বাতিল করে সব বৈধ ও লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সিকে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে কর্মীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ না নেওয়া এবং বিদেশ যেতে শ্রমিকদের খরচ কমানোর দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবীর মিলনায়তনে ‘মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি: সিন্ডিকেট, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব দাবি জানান।
সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের কাঠামো পুরোপুরি পরিবর্তন হয়নি। তাদের ভাষায়, ‘সিন্ডিকেট বদলেছে, কিন্তু কাঠামো বদলায়নি।’ তারা বলেন, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ কেন্দ্রীভূত হলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং এর চাপ পড়ে শ্রমিকদের ওপর।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটি সঞ্চালনা করেন দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সমন্বয়ক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব নুরুল আমিন ও ফখরুল ইসলাম এবং সাংবাদিক রাজীব আহমেদ বক্তব্য দেন।
সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দেওয়ার আগে সরকার নানা ধরনের যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কিন্তু লাইসেন্স দেওয়ার পর যদি সেই এজেন্সিগুলো কাজের সুযোগ না পায়, তাহলে লাইসেন্স দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তিনি বলেন, সব লাইসেন্সধারী এজেন্সিকে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থে সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদেশ যাওয়ার আগে শ্রমিকদের যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মঞ্জু বলেন, অনেক এজেন্সি ইতোমধ্যে ভাইভা নেওয়া শুরু করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শ্রমিকদের স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ৫ আগস্টের আন্দোলনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ রেখেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকরা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। অথচ ধনীদের সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেশের অর্থ বাইরে নিয়ে যান। শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে শ্রমিকদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, নির্দিষ্ট ২৫টি কোম্পানির মধ্যে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সীমাবদ্ধ না রেখে তা উন্মুক্ত করা হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিদেশ যেতে শ্রমিকদের ব্যয় কমবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকরা যাতে সহজ, স্বচ্ছ ও কম খরচে বিদেশ যেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, প্রবাসী শ্রমিকরা সামান্য আয়ের জন্য অসহনীয় কষ্ট করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম মানবিকতাও দেখা যায় না।
তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করলেই হবে না; তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে ফুয়াদ বলেন, প্রবাসীদের নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলা মেনে নেওয়া হবে না। তিনি ২৫ কোম্পানির সিন্ডিকেট বাতিল করে কম খরচে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর দাবি জানান।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় করা হয়েছে। কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ১৭টি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তার জবাব দিতে হবে।
তিনি প্রশ্ন করেন, জনগণের সরকার হলে কেন সিন্ডিকেটের কাছে মাথানত করতে হবে। নেপাল ও ফিলিপাইন নিজেদের অবস্থান থেকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো বহাল থাকা দুঃখজনক।
তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে প্রত্যাশিত দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমান নীতিমালায় বরং সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব নুরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসেবে তিনি আশা করেন, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন এবং অতীতের সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন।
সাংবাদিক রাজীব আহমেদ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, গণমাধ্যমে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরেন।
স্বাগত বক্তব্যে এবি পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াহাব মিনার বলেন, জীবিকার তাগিদে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও পুরোনো সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।