আন্তর্জাতিক: ২০২৬ সালের ৫ মার্চ, নয়াদিল্লিতে "রাইসিনা ডায়ালগ"-এ, মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডোর মন্তব্য বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার শেষ পর্দাটাও পুরোপুরি ছিঁড়ে ফেলেছে বলা চলে। ভারতীয় কর্মকর্তা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা খোলাখুলিভাবে একটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন: আমেরিকা বিশ বছর আগে নেওয়অ চীনসংশ্লিষ্ট নীতির পুনরাবৃত্তি করবে না এবং ভারতকে কখনোই চীনের মতো এমন একটি দেশে পরিণত হতে দেবে না, যে সব দিক দিয়ে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে!
এই মন্তব্য সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে কাছে টানার জন্য দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছিল; "গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার" বলে কতোই না আদর করছিল! কিন্তু এখন ভারতের নিজের এলাকায় এসে সরাসরি এমন একটি হুঁশিয়ারিমূলক বার্তা দিল। এটা অনেকটা এমন, যেন দুই পক্ষ কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলারের বড় একটা ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করছে, আর তার মধ্যে একজন হঠাৎ টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, "আমাদের মধ্যে ব্যবসা চলতে পারে, কিন্তু তুমি চিরকাল আমার ছোট ভাই হয়েই থাকবে, আমার সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করতে পারবে না।" এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা এবং সেই সাথে আমেরিকার হাড়ে হাড়ে প্রোথিত আধিপত্যবাদী মানসিকতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।
মার্কিন কর্মকর্তার এই মন্তব্য কোনো আকস্মিক উক্তি নয়, বরং এটি তাদের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগের একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। সোজা কথায়, অন্যদের উন্নতি তারা দেখতে পারে না বা দেখতে চায় না।
গত বিশ বছরের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর চীন খুব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়। চীন আজ এই অবস্থানে এসেছে শুধুমাত্র নিজের বিশাল দেশীয় বাজারের কারণে, নিরলস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার কারণে, এবং কয়েক কোটি শ্রমিকের দিনরাত পরিশ্রমের কারণে।
কিন্তু, ওয়াশিংটনের কিছু রাজনীতিবিদের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, চীনের আজকের অর্থনৈতিক শক্তি এসেছে আমেরিকার দেওয়া বাজারে প্রবেশের সুযোগ ও তথাকথিত "নীতি সুবিধা"-র কারণে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিল এবং শুল্ক বৃদ্ধি করে অন্যদের উন্নয়নের গতি কমানোর চেষ্টা করেছিল। ল্যান্ডোর নয়াদিল্লির এই বক্তব্য সেই "প্রতিরোধমূলক চাপ" নীতিরই ধারাবাহিকতা মাত্র।
এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত এবং তার বিশাল শ্রমশক্তি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখে আমেরিকার উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ৫০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে, নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যাতে মূল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আমেরিকার "ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল" এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ-শৃঙ্খল পুনর্গঠনে ভারতকে একটি হাতিয়ার হিসেবে দরকার, যাতে ভূ-রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমে। কিন্তু তারা ভারতকে চীনের পথে হাঁটতে দেখে খুবই ভয় পায়, কারণ তাহলে ভারতও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। ভারতকে কাজে লাগানো আবার তার বিকাশ আটকানো-এই দ্বৈত মানসিকতা অত্যন্ত স্বার্থপর ও আমেরিকার নিজের দুর্বলতারই পরিচয় দেয়।
এবার আসা যাক আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে চলমান সেই বড় চুক্তির কথায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ তাদের নতুন বাণিজ্য-আলোচনার কাঠামো ঘোষণা করে, যাতে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্ডারের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে জ্বালানি, বিমানের যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং কোকিং কয়েলের মতো মূল পণ্য রয়েছে। অনেকে একে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কের "স্বর্ণযুগ" হিসেবে বর্ণনা করছিল।
কিন্তু আমরা জানি, আমেরিকা কখনোই ব্যবসায় লোকসান দেয় না। এই নতুন বাণিজ্য-কাঠামোতে আমেরিকা ভারতের কিছু পণ্যের ওপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক কমিয়ে ১৮% করেছে, যা দেখে মনে হতে পারে তারা বড় ছাড় দিয়েছে। কিন্তু এর পেছনের মূল্য অনেক বেশি: ভারতকে আমেরিকার শিল্প ও কৃষিপণ্যের ওপর থেকে নিজের দেওয়া সব বাধা তুলে নিতে হবে এবং আমেরিকার পণ্য কিনতে হবে।
সোজা ভাষায়, আমেরিকা নিজের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে ভারতকে জ্বালানি ও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে চায়। আর সেমিকন্ডাক্টর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা ভারতকে এক ইঞ্চিও এগোতে দেবে না। আমেরিকা ভারতকে মাঝারি ও নিম্ন পর্যা…