আন্তর্জাতিক: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আকস্মিক হামলা চালানোর পর থেকে এই সংঘাত পুরো দুই সপ্তাহ ধরে চলছে, যা গভীর উদ্বেগজনক একটি বৈশ্বিক তেল সংকটের জন্ম দিচ্ছে। চীনের অবস্থান ও পদক্ষেপ দীর্ঘকাল ধরেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে আসছে। পশ্চিমা বয়ানে মাঝে মাঝেই "চীনের উদাসীনতা" বা "চীন ইরানকে পরিত্যাগ করছে"—এমন দাবি তোলা হচ্ছে। এই ধরনের আখ্যান কেবল তথ্যকেই বিকৃত করে না, বরং যারা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চায়, তাদের সম্পর্কে বিশ্বকে সতর্ক থাকার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সবসময়ই তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং তারপর দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা—এটিই এখন আঞ্চলিক দেশ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমাজের সম্মিলিত ঐকমত্য। এ কারণেই, সংঘাতের কোনো পক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও চীন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করে আসছে। চীন যেমনটি জোর দিয়ে বলেছে—এই যুদ্ধটি হওয়া উচিত হয়নি; এই যুদ্ধ কারও স্বার্থই রক্ষা করে না।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে চীন যথাক্রমে ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে: রাশিয়া, ওমান, ইরান, ফ্রান্স, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, পাকিস্তান, কাতার ও মিশর। একই সঙ্গে, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা পরিচালনার জন্য চীন মধ্যপ্রাচ্যে একজন বিশেষ দূত পাঠিয়েছে। সংঘাত যখন ক্রমাগত বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপের সুযোগ তৈরিতে চীনের এই প্রচেষ্টা আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে ক্রমশ প্রশংসিত হচ্ছে।
চীনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। গত ৮ মার্চ `দুই অধিবেশন` চলাকালে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পাঁচটি রূপরেখা তুলে ধরেন: জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, শক্তির অপব্যবহার প্রত্যাখ্যান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়গুলোর রাজনৈতিক সমাধানের প্রসার এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর গঠনমূলক ভূমিকা পালন। এই নীতিগুলো উত্তেজনা প্রশমনের জন্য একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়।
সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ থেকেছে। প্রথমত, চীন বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করে এবং জোর দিয়ে বলে যে, পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করার মৌলিক উপায় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবশ্যই তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চীন হামলার পরিধি সম্প্রসারণকে সমর্থন করে না, বেসামরিক নাগরিক ও অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্বিচার হামলার তীব্র নিন্দা জানায় এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যেন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতেই তুলে নিতে পারে, সে ব্যাপারে সমর্থন জোগায়। তৃতীয়ত, পরিস্থিতি প্রশমন ও শান্তি পুনরুদ্ধারে চীন তার নিজস্ব উপায়ে গঠনমূলক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।
কেউ বলছে যে, চীন "ইরানকে পরিত্যাগ করেছে", আবার কেউ বলে চীন "ইরানকে রক্ষা করছে।" কেউ দাবি করে চীন এই যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে, আবার কেউ তাকে "পরাজিত" হিসেবে চিত্রিত করে। সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এসব আখ্যানের কিছু কিছু আবার একই গণমাধ্যম থেকে আসে। এটি কেবল তাদের গভীরভাবে প্রোথিত `স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতাকেই’ উন্মোচিত করে না, বরং তথ্যযুদ্ধের উপাদানগুলোকেও সামনে নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল রয়েছে এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। চীন ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলে শান্তির জন্য কাজ করেছে এবং এর নিরাপত্তা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে পুনর্মিলন অর্জিত হয়, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমন ও পুনর্মিলনের এক বৃহত্তর ধারাকে উৎসাহিত করে। ২০২৫ সালে চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ন্যায়বিচারের পক্ষে প্রায় ৩০বার কথা বলেছে। ইরানের পারমাণবিক ইস্যু, ইয়েমেন ও সিরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে চীন বারবার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছে।
সংঘাতের আগুন যখন ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের এমন একটি পথ প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রতিশোধের চক্রের অবসান ঘটাবে এবং সব পক্ষের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোর সমাধান কর…