| |
| বাংলাদেশে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা |
| |
|
|
|
|
|
|
|
| |
| |
|
| |
| |
| এইচ এম সাব্বির: গত দুই দশকে বাংলাদেশের দ্রুত শিল্পায়ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে। তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, নির্মাণ কার্যক্রম এবং উৎপাদনশিল্পের বিকাশ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং জাতীয় জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে এই অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (OHS) নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে। নির্মাণ সাইট, শিল্প কারখানা এবং অবকাঠামো প্রকল্পে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো বারবার প্রশ্ন তোলে—উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি সত্যিই নিশ্চিত করা হয়েছে? ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধস বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বিভিন্ন সংস্কারের সূচনা করে। এরপর থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পে অগ্নি-নিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত মান এবং তদারকি ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে। তবে নির্মাণ, ক্ষুদ্র উৎপাদন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে শুধুমাত্র একটি নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা উচিত। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং দুর্ঘটনাজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি কমায়। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং যথাযথ নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন প্রায়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়, বিশেষ করে ছোট প্রকল্প এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে। মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জাতীয় মানবাধিকার সংগঠন লাইটহাউসের সদস্য সচিব এবিএম সাইফুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন অবশ্যই শ্রমিকদের সুরক্ষার সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগোতে হবে। তিনি বলেন, “প্রত্যেক শ্রমিক একটি নিরাপদ কর্মক্ষেত্র পাওয়ার অধিকার রাখে। উন্নয়ন কখনোই মানুষের জীবনের বিনিময়ে হতে পারে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, শিল্পমালিক, ঠিকাদার এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। গিলডান (এসডিএস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড)-এর ইএইচএস সুপারিনটেনডেন্ট মো. জাকারিয়া জানান, অনেক দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং মানবসৃষ্ট ঝুঁকির ফল। তার মতে, প্রকল্পের কাগজপত্রে নিরাপত্তা নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তা সবসময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। অনেক নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্পে ক্লায়েন্ট ও ঠিকাদারের চুক্তিতে নিরাপত্তা শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বল থাকে। তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের অগ্রগতিকে নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একটি প্রকল্পের সাফল্য শুধু সময়মতো শেষ হওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং তা কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে কি না—সেই ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা উচিত।” তবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে। জাকারিয়ার মতে, কিছু বহুজাতিক এবং দায়িত্বশীল স্থানীয় প্রতিষ্ঠান উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করছে। এই ধরনের উদ্যোগ যদি আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একাডেমিক বিশেষজ্ঞরাও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, যথাযথ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনেক কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা অনেক সময় হঠাৎ মনে হলেও, বাস্তবে সেগুলো পূর্বাভাসযোগ্য—যদি ঝুঁকির উপাদানগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।” উন্নত দেশগুলোতে পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেলিং ও পূর্বাভাসমূলক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়। তার মতে, বাংলাদেশেও এ ধরনের তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণেও কিছু খাতে নিরাপত্তা ঘাটতি স্পষ্ট। লাইটহাউসের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও দৈনিক কালের কথা’র সম্পাদক খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওসারী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের হেলমেট বা সেফটি হারনেস ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু উন্নতি হলেও ছোট নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে নিরাপত্তা চর্চা এখনো দুর্বল, যেখানে তদারকি সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। শ্রমিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগকে অতিরিক্ত ব্যয় নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ যখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না—বরং সেই উন্নয়নে যারা অবদান রাখছে, তাদের সুরক্ষার ওপরও নির্ভরশীল। অবশেষে, উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু অবকাঠামো বা শিল্প সম্প্রসারণ দিয়ে নয়, বরং কতটা নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে সেই উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে—তার মাধ্যমেই পরিমাপ করা হবে। লেখক: এইচ এম সাব্বির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা লাইট হাউজ
|
| |
|
|
|