সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * শহীদ মিনারে গুলি ও ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত   * শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে সিরিজ জয় বাংলাদেশের   * মাদারীপুরে অভিযান চালিয়ে বিপুল আতশবাজিসহ যুবক গ্রেফতার   * ‘বেঁচে থাকলে খুঁজে বের করে মারব’, নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি দিল ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড   * সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দু’টি ঘাঁটি থেকে খার্গে হামলা, বদলার হুঁশিয়ারি দিয়ে দুবাইয়ে হামলা ইরানের   * সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় অ্যাডভোকেট আজমিরি বেগম ছন্দা   * গণপরিবহনে তেল নেওয়ার সীমাবদ্ধতা থাকছে না : সড়ক মন্ত্রী   * ফয়সালকে পালাতে ‘সহায়তাকারী’ ফিলিপ ভারতে গ্রেপ্তার   * ইরানের পাশে দাঁড়াল রাশিয়া-চীন   * শিবচরে এমপি হানজালার বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল, নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা  

   মতামত
বিষাদের ঈদ: যখন গাজার আকাশ শোকে ভারি
  Date : 14-03-2026

জনি সিদ্দিক: পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ভূখণ্ড আছে, যেখানে আনন্দের দিনেও বিষাদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। যেখানে উৎসবের রঙ আলো ছড়ায় না। ফিলিস্তিন, বিশেষত গাজা উপত্যকা, তেমনই এক নাম। মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর বা ঈদ-উল-আযহা যখন বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসে, ফিলিস্তিনিদের কাছে তা কেবলই আরও একটি স্বজন হারানোর শোকের দিন, ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। এবারের ঈদও ব্যতিক্রম নয়। যেখানে নতুন পোশাকের গন্ধ, সুস্বাদু খাবারের আয়োজন আর কোলাকুলি করার দৃশ্য থাকার কথা, সেখানে ফিলিস্তিনি শিশুরা দেখছে বোমার ধোঁয়া, ধ্বংসস্তূপ নগরী, ক্ষুধার জ্বালা আর তাঁবুর মধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের ফলে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ে পৌঁছেছে। গাজার পরিচয় এখন কেবল একটি ভৌগোলিক নাম হিসেবে নয়, বরং মহা আগ্রাসন ও মানবসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
১. মানবিকতার চরম সংকট:
পরিসংখ্যান কখনো কখনো কেবল সংখ্যা নয়, অসংখ্য মানুষের বেদনার চিত্র তুলে ধরে। গাজার পরিসংখ্যান বলতে মানবিকতার ন্যূনতম মূল্যও নেই এখানে। ক্ষমতার কাছে মনুষ্যত্বের পরাজয় ঘটেছে। গাজায় নিহতদের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায়ষাট হাজারের কোটা ছাড়িয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক কিছু সংবাদ সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত এই নির্মম সত্য তুলে ধরছে। হামাসের আক্রমণের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর একতরফা সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকার অবকাঠামো কার্যত সম্পূর্ণই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাইলের পর মাইল বাড়িঘর, মসজিদ, দোকানপাট, হাসপাতাল, বিদ্যালয় সব কিছুই কেবল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন বহন করছে। গাজার কোনো কিছুই এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। যারা প্রাণে বেঁচে আছেন, তারা খাদ্য, পানি, চিকিৎসা এবং আশয়ের চরম সংকটে ভুগছেন। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। যেমনটি সম্প্রতি আমরা সমুদ ফ্লোটিলার সঙ্গে ঘটতে দেখেছি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশুদ্ধ জলের অভাব এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয়ের ফলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের সংক্রমণ ও বোমার তেজস্ক্রিয়ায় বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ বা সরঞ্জাম নেই; হাসপাতালগুলো নিজেই টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আমরা পত্রিকায় দেখতে পেয়েছি গাজাবাসীদের শেষ ভরসা সাগর। সাগরে জাল ফেলে মাছ ধরছে বাবা। ইসরাইলি সৈন্যরা সকল দিক দিয়ে আসা ত্রাণের বহর আটকে দিচ্ছে।
২. বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা:
সংঘাতের তীব্রতা গাজাবাসীকে বারবার বাস্তুচ্যুত করেছে। উত্তর গাজা থেকে শুরু করে প্রায় সমগ্র জনসংখ্যাকে দক্ষিণ দিকে বিশেষ করে রাফা শহরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চল রাফাও রেহাই পায়নি। লাখ লাখ মানুষ, যাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু, তারা এখন খোলা আকাশের নিচে, কিংবা প্লাস্টিকের অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে, শীতের ঠান্ডায় অবর্ণনীয় মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। কল্পনা করুন, ঈদের দিন সকাল বেলা। সাধারণত এই দিন প্রতিটি ঘরে হাসির রেখা ফোটে, শিশুরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে ঈদ সালামি পায়। কিন্তু গাজার তাঁবুগুলোতে, এই শিশুরা ক্ষুধার্ত পেটে বোমা বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ঈদ সালামি নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার পর কপালে জোটে হয়তো এক টুকরো ত্রাণের শুকনো রুটি। তাদের খেলার সামগ্রী বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। স্বজন হারানোর শোক এই ঈদকে বিষাদে ঢেকে দিয়েছে। যে শিশুর বাবা কিংবা মা আর নেই, তার জন্য ঈদ কিভাবে আনন্দময় হতে পারে? এই চিত্রগুলোই প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনে ঈদ এখন উৎসব নয়, বরং টিকে থাকার এক ভয়াবহ পরীক্ষা। ফিলিস্তিনিদের এই উদ্বাস্তু জীবন কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিক ট্রমাও সৃষ্টি করছে। যুদ্ধ, মৃত্যু এবং অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার প্রায় সকল শিশুই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার (গবহঃধষ ঐবধষঃয ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ) অভাবে ভুগছে। যুদ্ধ সব দিক দিয়ে গাজাবাসীদেরকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। সেখানে নেই কোন নিরাপত্তা, নেই কোন নিশ্চয়তা। জীবন মানেই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
৩. আন্তর্জাতিক নীরবতা ও ফিলিস্তিনিদের দৃঢ়তা:
ফিলিস্তিনের এই চলমান মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সমাজকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেক রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানালেও, কার্যকর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি করলেও তারা বারবার খোঁড়া অজুহাতে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ইসরাইলের পাশে বন্ধু হিসেবে আমেরিকা প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে। কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, তা গাজার মানুষের কষ্ট লাঘবে যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও আমেরিকা, জার্মানির মতো দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারের ফলে তা কার্যকর করা যায়নি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হলেও, সংঘাতের তীব্রতা কমেনি। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ফিলিস্তিনের পক্ষে তীব্র প্রতিবাদ এবং সমর্থন দেখা গেলেও, বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক কূটচাল গাজার পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। সারা বিশ্বব্যাপী আন্দোলন জোরদার হলেও কোন কিছুই ইসরাইলকে দমাতে পারছে না। এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা যায়। বছরের পর বছর চলা সংঘাত, অবরোধ এবং ধ্বংসযজ্ঞের মুখেও তারা তাদের ভূমি এবং অধিকারের প্রতি অবিচল। এই অদম্য স্পৃহা এবং টিকে থাকার অঙ্গীকারই ফিলিস্তিনি সংগ্রামের মূল শক্তি। ঈদের দিনেও তারা তাদের ভাই-বোনও হারানো স্বজনদের জন্য প্রার্থনা করে। শত্রুর আগ্রাসনের মধ্যেও তারা তাদের পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখে। কারণ তাদের সংঘাতের মূল উদ্দেশ্যই হলো ধর্মগত কারণে। ইহুদিবাদী ও তাদের দোসর গোষ্ঠী চায় ইসলাম ধর্মের অনুসারীদেরকে অবদমিত করে রাখতে। তারা কখনোই চায়না মুসলমানরা সামরিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যাক।

পরিশেষে বলা যায়Ñ ফিলিস্তিনের আজকের অবস্থা বিশ্ব বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন। এটি কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং মানবিকতার চরম অবমাননা। ঈদের এই দিনে, যখন আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে হাসি-আনন্দে মেতে উঠি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীর এক কোণে হাজার হাজার মানুষ একটি নিরাপদ আশ্রয় আর এক ফোঁটা পানির জন্য নিজেদের মাতৃভূমিকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করতে লড়াই করছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য সত্যিকারের ঈদ তখনই আসবে, যখন তাদের অস্থায়ী তাঁবুগুলো আর থাকবে না। যখন শিশুরা নির্ভয়ে রাস্তায় খেলবে। যখন আল-আকসার মিনার থেকে সুমধুর আযান ভেসে আসবে। আর প্রতিটি মা তার সন্তানকে বুকে টেনে নিয়ে বলবে: “আর কোনো ভয় নেইরে সোনা মানিক, আমরা স্বাধীন।” আজ, আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো গাজার মানুষের এই কান্নাকে ভুলে না যাওয়া। এই ঈদ আমাদের কাছে কেবল আনন্দের দিন নয়, এটি প্রতিজ্ঞা করার দিন যেন আমরা বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার এবং শান্তির জন্য নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করি। ফিলিস্তিনের মাটি থেকে রক্ত মুছে গিয়ে যেন আবার ফুটতে পারে নতুন ভোরের গোলাপ। শান্তির অপেক্ষায় এক ভূখণ্ড থেকে প্রার্থনা করিÑ আজ ফিলিস্তিনের ঈদ হয়তো বিষাদময়, কিন্তু আগামী দিনের স্বপ্ন হোক উজ্জ্বল। মহান আল্লাহ ইসরাইলের অন্যায় আগ্রাসন থেকে গাজাবাসীদেরকে হেফাজত করুন। ঈদ বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি। আমিন।


 



  
  সর্বশেষ
২৫ রমজানের রোজা ও রাত অত্যন্ত বরকতময় বিশেষ ফজিলত হলো, এই দিনে রোজা রাখলে কবরের শাস্তি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়
কেরানীগঞ্জ প্রেসক্লাব আয়োজিত ইফতার ও দোয়ার মহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে
শহীদ মিনারে গুলি ও ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত
খিলক্ষেতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনজনের মৃত্যু



প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত ।
ফোন: ০২৪১০৭০৯৯৬ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪

Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com