ফিরোজ মাহবুব কামাল: জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্ববৃহৎ বাহনটি হলো রাষ্ট্র; তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারটিও হলো রাষ্ট্র। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের চেয়ে বড় কল্যাণকর্ম এ পৃথিবী পৃষ্ঠে একটিও নাই। এ কাজ জিহাদ; একাজে নিহত হলে সাথে সাথে মাগফিরাত মেলে এবং সরাসরি প্রবেশ মেলে জান্নাতে। এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ মানবের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার -পবিত্র কুর’আনে যাকে “ফাউজুন আযীম” (সবচেয়ে বড় বিজয়) বলা হয়েছে। তাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার নিকট থেকে সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি চায়, তারা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে শামিল হয়। তাই নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের আমলে মুসলিমদের জানমালের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়; অর্ধেকের বেশি সাহাবা একাজে শহীদ হয়ে গেছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা:)’য়েরআগে লক্ষাধিক নবী-রাসূল এসেছেন। তাদের সবার ধর্মই ছিল ইসলাম। কিন্তু জাহান্নামের আগুন থেকে যে বিশাল সংখ্যক মানুষকে ইসলামের শেষনবী হযরত মহম্মদ (সা:) বাঁচিয়েছেন, সে কাজটি অন্য কোন নবীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্য কোন নবী-রাসূলের দ্বারা নবীজী (সা)’র ন্যায় ইসলামের বিশ্বময় প্রচার এবং ইসলামী সভ্যতার নির্মাণও সম্ভব হয়নি। কারণ, তাদের সামর্থ্য ছিল সীমিত। তাদের হাতে নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের ন্যায় কোন রাষ্ট্র ছিল না। তাদের হাতে রাষ্ট্র না থাকায় তারা ইসলামের শত্রু পক্ষের নির্মূলে এবং সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় ততটা সফল হতে পারেননি -যতটা সফল হয়েছেন নবীজী (সা:)। হযরত দাউদ (আ:) ও হযরত সুলাইমান (আ:)’য়ের হাতে রাষ্ট্র থাকলেও সে রাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্র ও আয়ু ছিল অতি সীমিত। ফলে নবীজী (সা)’র ন্যায় তাদের অনুসারীগণ বিশ্বশক্তির আসনে বসতে পারেননি
অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিই মানুষের মাঝে সমতা, আইনের শাসন, সুবিচার, নারী স্বাধীনতা এবং শ্রেণীভেদ ও বর্ণভেদ বিরোধী বড় বড় নীতি কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু কেউ কি সেগুলিকে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন? পারেননি, ফলে তাদের ভাল ভাল নীতি বাক্যগুলি শুধু কিতাবেই রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে নবীজী (সা:)ই একমাত্র ব্যতিক্রম। তিনি তাঁর নীতিকথা গুলিকে নিজ জীবনে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বুকে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। এজন্য এমনকি বহু অমুসলিমও তাঁকে মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের মর্যদা দেন। সে বিবেচনাতেই মাইকেল হার্ট তাঁর বিখ্যাত বই “দি হানড্রেড”য়ে মানব ইতিহাসের একশত শ্রেষ্ঠ মানুষের মাঝে হযরত মহম্মদ (সা:)কে প্রথম স্থান দিয়েছেন।
কিন্তু কিরূপে সম্ভব হলো নবীজী (সা:)’র হাতে সে বিশাল বিপ্লবী কাজ? হযরত মুহাম্মদ (সা:)’য়েরএ বিশাল সফলতার মূল কারণ, তাঁর ও তাঁর যোগ্য খলিফাদের হাতে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত হেয়ায়েতের গ্রন্থ পবিত্র কুর’আনই শুধু ছিল না, ছিল বিশাল রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিও। ছিল আদালত এবং সেনাবাহিনী। ফলে হিদায়েতের সে বাণীগুলিকে কার্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা দিতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলির সাহায্য নিতে পেরছিলেন। সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত না থাকলে সেটি তাঁর পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না। কিন্তু আজকের চিত্রটি ভিন্ন। আজ ঈমানদারদের ঘরে ঘরে আছে পবিত্র কুর’আন, তাদের জীবনে নামাজ-রোজাও আছে। কিন্তু দখলে নাই রাষ্ট্র। নামাজী ও রোজাদারদের সংখ্যা বাড়িয়ে বা তাবলিগে জামায়াতের ইজতেমায় বিশ-তিরিশ লাখ মানুষের সমাবেশে কি সে সফলতা জুটবে? কুর’আনী বিধানগুলি প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে সেটি নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত ত্বরিকা নয়। ইসলামের প্রতিষ্ঠার কাজটি তো ইজতেমায় হয় না। নামাজী-রোজাদার ও মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাবৃদ্ধিতেও হয় না। এজন্য তো রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা থেকে দুর্বৃত্তদের হটিয়ে ঈমানদারদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। প্রতিষ্ঠা দিতে হয় ইসলামী রাষ্ট্রের। তখন এ কাজে অপরিহার্য হয়ে পড়ে জিহাদ। সেটিই তো নবীজী (সা:)’য়ের রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের রোডম্যাপ।
রাষ্ট্র ইসলামী হলে জনগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজে কুর’আন-হাদীস, মসজিদ-মাদ্রাসা ও আলেম-উলামাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সুবিশাল প্রতিষ্ঠানগুলিও দিবারাত্র কাজ করে। সমগ্র দেশ জুড়ে তখন যে বিশাল রাজপথটি দৃশ্যমান হয় সেটি হলো সিরাতাল মুস্তাকীম; তখন বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে অবাধ্যতার রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তখন বিলুপ্ত করা হয় আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সকল আয়োজন তথা জাহান্নামের পথ। ঘুষ নেয়া দূরে থাক, রাষ্ট্রের কর্মচারীগণ তখন ঘুষ নির্মূলর যুদ্ধে সার্বক্ষণিক সৈনিকে পরিণত হয়। সরকার-প্রধান, সরকারি কর্মচারি, শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া কর্মী, টিভি, রেডিও, পত্র-পত্রিকা, স্কুলের পাঠ্য বই তথা সর্বপ্রকার জনশক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য জনগণকে জান্নাতের পথ দেখায় এবং দূরে রাখে জাহান্নামের পথ থেকে। তখন রাষ্ট্র জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় ইবাদতের সংস্কৃতি। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। এগুলিই হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ামত।
অপর দিকে অনৈসলামী রাষ্ট্রের বিপদটি ভয়াবহ। বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুকে জনপদে মূক্ত ছেড়ে দিয়ে কি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া যায়? তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধাচারি লক্ষ লক্ষ বিদ্রোহীকে সর্বপ্রকার রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি দিয়ে জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টির অধিকার দিলে কি সাধারণ মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো যায়? এটিই তো অনৈসলামী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নাশকতা। সমগ্র আরব ভূমি, পারস্য, মিশর, মধ্য-এশিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বভাগ জুড়ে সাধারণ মানুষের দলে দলে ইসলামের প্রবেশের যে জোয়ার শুরু হয় -সেটি তো আল্লাহতায়ালার শত্রুদের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামরিক শক্তি ছিনিয়ে নেয়ার পর। তার আগে নয়। তাদের নির্মূলের মধ্য দিয়ে অপসারিত হয়েছিল জান্নাতের পথে চলার সকল বাধা-বিপত্তি। বন্ধ করা হয়েছিল জাহান্নামের সকল অন্ধকার গলিপথ। দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য ঘোষিত হয়েছিল মিথ্যা ধর্ম ও অসত্য মতবাদের পথে ডেকে মানুষকে জাহান্নামে নেয়া। এ কাজ গণ্য হতো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ রূপে। রাষ্ট্রের কাজ শুধু আগ্রাসী শত্রুর হামলা থেকে দেশকে প্রতিরক্ষা দেয়া নয়, বরং প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ প্রতিরক্ষা দিতে হয় জনগণের চেতনার ভূমিকেও। সেটি মিথ্যা ধর্ম, মিথ্যা মতবাদ, অসত্য দর্শন ও শয়তানের নানারূপ কুমন্ত্রণা থেকে। অথচ অনৈসলামী রাষ্ট্রে জনগণের চেতনার ভূমিতে লাগাতর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন চালায় খোদ সরকার ও তাঁর আজ্ঞাবহ স্তাবকেরা। ১০/৩/২০২৬