| |
| দক্ষতা নয়, সম্পর্ক: কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির অদৃশ্য রাজনীতি |
| |
|
|
|
|
|
|
|
| |
| |
|
| |
| |
| ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন: কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি সাধারণত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও কর্মক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা অনেক কর্মী পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন, অথচ তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ কিন্তু প্রভাবশালী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকটবর্তী কর্মীরা দ্রুত উন্নতির সুযোগ পান। ফলে কর্মক্ষেত্রে একটি নীরব প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে—পদোন্নতি কি সত্যিই দক্ষতার ভিত্তিতে হয়, নাকি এর পেছনে কাজ করে সম্পর্ক, তোষামোদ ও অদৃশ্য প্রভাবের এক জটিল রাজনীতি? ১. নীরব দক্ষতার দ্বিধা দক্ষ ও মেধাবী কর্মীদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো তারা কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করতে চান। তাদের বিশ্বাস—কাজের মানই একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয়। তাই তারা প্রায়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি করার কৌশলের পরিবর্তে নিজের কাজকে আরও নিখুঁত করার দিকে মনোযোগ দেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মূল্যায়ন সবসময় কেবল কাজের ফলাফলের উপর নির্ভর করে না। ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত ধারণা, সামাজিক যোগাযোগ এবং কর্মীর দৃশ্যমানতা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে যারা নীরবে কাজ করেন কিন্তু নিজেদের প্রচার করেন না, তারা অনেক সময় ব্যবস্থাপকের নজরে কম পড়েন। ২. তোষামোদ ও ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সংগঠন মনোবিজ্ঞানে “Ingratiation” বা তোষামোদ একটি সুপরিচিত আচরণ। এটি এমন একটি কৌশল যেখানে কর্মী সচেতনভাবে বসের মতামতের সাথে একমত হওয়া, অতিরিক্ত প্রশংসা করা অথবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে চেষ্টা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের আচরণ অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মীর প্রকৃত দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তার প্রতি একটি ইতিবাচক ব্যক্তিগত ধারণা তৈরি হয় এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে সে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যেতে পারে। ৩. কর্মক্ষেত্রে পক্ষপাতের বাস্তবতা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে কর্মক্ষেত্রে পক্ষপাত বা favoritism ব্যাপক সমস্যা। অনেক প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পছন্দ-অপছন্দ বড় ভূমিকা পালন করে। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী তাদের কর্মজীবনে কোনো না কোনো ধরনের পক্ষপাত লক্ষ্য করেছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী এই কারণে চাকরি পরিবর্তনের কথা ভেবেছেন। Harvard Business Review–এর গবেষণায়ও বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপকরা অনেক সময় অবচেতন পক্ষপাত বা “unconscious bias” দ্বারা প্রভাবিত হন। ৪. দৃশ্যমানতার সুবিধা মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কর্মী নিজেদের সাফল্য বা অর্জন তুলে ধরতে পারেন, তারা ব্যবস্থাপকদের কাছে বেশি সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত হন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “visibility advantage”। অন্যদিকে যারা নীরবে কাজ করেন, তারা প্রায়ই “low visibility employee” হয়ে পড়েন। ফলে বাস্তবতা অনেক সময় এমন দাঁড়ায় যে—যে বেশি কথা বলে, যে নিজের সাফল্য তুলে ধরতে সক্ষম, এবং যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে—সে প্রায়ই পদোন্নতির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। ৫. প্রতিষ্ঠানের জন্য নেতিবাচক প্রভাব তোষামোদ বা পক্ষপাত কেবল ব্যক্তিগত অন্যায় সৃষ্টি করে না; এটি প্রতিষ্ঠানের জন্যও ক্ষতিকর। যখন কর্মীরা মনে করেন যে পদোন্নতি ন্যায্যভাবে হচ্ছে না, তখন আস্থাহীনতা তৈরি হয়। ফলে কর্মীদের মনোবল কমে যায়, দলগত সহযোগিতা দুর্বল হয় এবং দক্ষ কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যেতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও সাংগঠনিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ৬. ন্যায়ভিত্তিক কর্মসংস্কৃতির প্রয়োজন সমাধান হলো স্বচ্ছ ও ন্যায্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা। কর্মীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্মক্ষমতার সূচক, লিখিত মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক উন্নত প্রতিষ্ঠান এখন “360-degree evaluation” ব্যবহার করে, যেখানে একজন কর্মীর মূল্যায়ন শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতামতের উপর নির্ভর করে না; বরং সহকর্মী ও অধীনস্থদের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়। উপসংহার যখন কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি নির্ভর করবে প্রকৃত যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার উপর—not তোষামোদ বা সম্পর্কের উপর—তখনই মেধাবী কর্মীরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাবেন, আর প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে সত্যিকারের শক্তি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। লেখক পরিচিতি ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন একাধারে একজন আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সমাজচিন্তক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন প্রশাসনে পিএইচডি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমফিল সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট। চীনের বৃহৎ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান CRCC-এর সাবেক আইন উপদেষ্টা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন এবং ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ড. জাভেদ সালেহউদ্দিন শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সক্রিয়, ফরিদপুর মধুখালীতে প্রতিষ্ঠিত ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন টেকনিক্যাল কলেজ ও বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা। আইন, সমাজনীতি, কর্মসংস্কৃতি, নৈতিকতা, জাতীয় উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটটি।
|
| |
|
|
|