লায়ন উমার রাযী: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসে আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি এ দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যুগে যুগে এই জনপদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং বিশেষ করে দিল্লির নগ্ন হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে যারা বুক পেতে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেজর জলিল থেকে শুরু করে আপোষহীন নেত্রী বেগম জিয়া- প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভারতের আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন। নিচে তাঁদের শাহাদাত ও জীবনাবসানের তারিখ অনুযায়ী সেই ঐতিহাসিক পরিক্রমা তুলে ধরা হলো:
১. মেজর এম. এ. জলিল: রণাঙ্গনের প্রথম প্রতিবাদী- (মৃত্যু: ১৯ নভেম্বর, ১৯৮৯)
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার কণ্ঠস্বর মেজর এম. এ. জলিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের পরপরই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল মানচিত্র অর্জনে নয়, বরং বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় নীতিতে নিহিত। যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ভারতীয় বাহিনীর লুণ্ঠন ও বাংলাদেশের সম্পদের ওপর তাদের খবরদারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাঁকে কারান্তরীণ হতে হয়। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর এই বীর সেনানী মৃত্যুবরণ করেন, যার রেখে যাওয়া দর্শন আজও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূলমন্ত্র।
২. আবরার ফাহাদ: সার্বভৌমত্বের আধুনিক প্রতীক- (মৃত্যু: ৭ অক্টোবর, ২০১৯)
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সমকালীন ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আবেগঘন নাম আবরার ফাহাদ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের পানি ও বন্দর বিষয়ক অসম চুক্তির যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা করার অপরাধে তাঁকে নৃশংসভাবে প্রাণ দিতে হয়। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন `ছাত্রলীগ`-এর ক্যাডারদের হাতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আবরারের রক্তই প্রমাণ করেছে যে, এ দেশে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর সেই আত্মত্যাগই তরুণ প্রজন্মের মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
৩. আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: আধিপত্যবাদ বিরোধী তাত্ত্বিক কণ্ঠস্বর- (মৃত্যু: ১৪ আগস্ট, ২০২৩)
বাংলাদেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন আল্লামা সাঈদী। তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং আধিপত্যবাদী শক্তির পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে তাঁকে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় কারান্তরীণ রাখা হয়। পরিশেষে, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রহস্যজনক পরিস্থিতিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায়- যাকে অনেকেই ‘মেডিকেল কিলিং’ হিসেবে অভিহিত করেন- তাঁকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। তাঁর মৃত্যু আধিপত্যবাদ বিরোধী জনতাকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে।
৪. আবু সাঈদ: স্বৈরাচার ও গোলামি বিরোধী লড়াইয়ের বীরগাথা- (মৃত্যু: ১৬ জুলাই, ২০২৪)
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আবু সাঈদ ছিলেন সাহসিকতার এক অনন্য উদাহরণ। ভারতীয় মদদপুষ্ট স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশের রাইফেলের নলের সামনে দুহাত প্রসারিত করে তিনি যে প্রতিরোধের দৃশ্য তৈরি করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৬ জুলাই ২০২৪-এ রংপুরে তাঁর এই বীরত্ব ফ্যাসিবাদের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তিনি শুধু কোটা সংস্কারের জন্য নয়, বরং একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, যেখানে দিল্লির কোনো আজ্ঞাবহ সরকার থাকবে না।
৫. শরীফ ওসমান বিন হাদী: দ্বিতীয় স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী- (মৃত্যু: ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫)
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতির এক দীপ্তমান নক্ষত্র শরীফ ওসমান বিন হাদী। তিনি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী। জুলাই শহিদদের অধিকার রক্ষা ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনে তিনি ছিলেন আপোষহীন। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় নির্বাচনী ক্যাম্পেইন চলাকালে তিনি আধিপত্যবাদের দোসরদের গুলিতে বিদ্ধ হন। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই ত্যাগী রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মী শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর রক্ত আজও আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
৬. বেগম খালেদা জিয়া: আপোষহীন নেত্রীর চিরবিদায়- (মৃত্যু: ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫)
বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধাত্রীভূমি এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের প্রধান রাজনৈতিক অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনোই দিল্লির ইচ্ছার কাছে মাথা নত করেননি। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই আপোষহীন অবস্থানের কারণেই তাঁকে বছরের পর বছর নির্জন কারাবাস ও উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এই কিংবদন্তি নেত্রীর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের একটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি বিয়োগান্তক ঘটনা নয়, বরং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াইয়ের এক জীবন্ত ইতিহাস।
উপসংহার:
ইতিহাসের এই বাঁকগুলোতে তাকালে দেখা যায়, আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটিই- ভারতের প্রভাবমুক্ত ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। মেজর জলিল থেকে শুরু করে ২০২৪-এর বিপ্লবীরা এবং আপোষহীন নেত্রী বেগম জিয়া আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়েও স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এই অগ্রসেনানীদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না যদি আমরা তাঁদের চেতনাকে ধারণ করে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বিনির্মাণে একতাবদ্ধ থাকি।
লায়ন উমার রাযী
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক ও বিশ্লেষক