নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যত পাল্টাতে হলে পাল্টাতে হয় রাজনীতির বয়ানকে। সেকাজটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের সৈনিকদের। ইতিহাসের বই এক্ষেত্রে অস্ত্র। বয়ানই নির্ধারিত করে দেয় রাজনীতির অঙ্গণে কোনটি কাঙ্খিত ও কোনটি প্রশংসিত এবং কোনটি ঘৃণার ও পরিতাজ্য। একাত্তরের সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টদের বয়ানে বিচিত্র ভাষা, বিচিত্র বর্ণ ও বিচিত্র এলাকার মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তানের ন্যায় সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি ঘৃণার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতা চিত্রিত হয় অখণ্ড ভারত ভাঙার নিন্দিত বিষয় রূপে। এ বয়ানে বিশ্বাসীরাই একাত্তরে ভারতের পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পের সাথে একাত্ম হয়েছিল। মুজিব ও হাসিনার রাজনীতির ভিত্তি ছিল এই ভারতমুখী বয়ান।
চেতনায় ইসলাম বিরোধী এরূপ ভারতমুখী বয়ান ধারণ করে কারো পক্ষেই সম্ভব নয় বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পক্ষে কাজ করা। তাতে বিলুপ্ত হয় মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক কল্যাণের ভাবনা। তখন দেশে আগ্রাসী ভারতের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পাবে এবং সেটি প্রশংসা কুড়াবে -সেটিই বরং স্বাভাবিক।
একাত্তরের ভারতীয় বয়ান আগ্রাসী ভারতীদেরকে বন্ধু ভাবতে শেখায়। ইসলাম প্রেম ও মুসলিম ঐক্যএখানে অপরাধ গণ্য হয়। সেরূপ ভারতসেবী রাজনীতির প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে মুজিব ও হাসিনার রাজনীতিতে। সে বয়ান চরিত্র হনন করে সেসব ইসলামপন্থীদের যারা একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ থেকে একাত্তরের এ ভারতসেবী বিষাক্ত বয়ান নির্মূলে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের ইসলামকে বিজয়ী করার কাজটি সব সময় নিন্দিতই হতে থাকবে। ইসলাম বিবর্জিত সে সেক্যুলার বয়ান বিপন্ন করবে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ অতি গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরের বিষয় নিয়ে গবেষণার বিষয় যেমন অনেক, তেমনি শিখবার বিষয়ও অনেক। একাত্তরের পিছনে রয়েছে এক দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক, কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তবে একাত্তরের শুরু একাত্তরে, বরং ঘটনা প্রবাহের শুরু বহু পূর্ব থেকে বিশেষ করে ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা থেকে।
একাত্তরের পিছনে রয়েছে একটি বিশাল রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ। একাত্তরের যুদ্ধের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত বাঙালি মুসলিমের অতি পরিচিত শত্রু দেশ ভারত -যারা আমাদের ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল। একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল তাদেরও। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারত সরকার ও ভারতীয় সেনবাহিনীর ভূমিকাটি ছিল চুড়ান্ত। কারণ, মুক্তিবাহিনী নিজ শক্তি বলে সাড়ে ৮ মাসের যুদ্ধে সমগ্র বাংলাদেশে দূরে থাক কোন একটি জেলা বা থানাও স্বাধীন করতে পারিনি। সে কাজটি করে দিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের বিশাল ভারতীয় সেনাবাহিনী ।
ভারতের এজেন্ডা যেমন ১৯৪৭’য়ে ছিল, তেমনি ছিল ১৯৭১’য়েও। ১৯৪৭’য়ে ভারত বিজয় পায়নি; কিন্তু বিশাল বিজয় পেয়েছে ১৯৭১’য়ে। কি ছিল ভারতের ১৯৪৭’য়ের এজেন্ডা এবং কি ছিল ১৯৭১’য়ে এজেন্ডা -সেটি যে কোন বাংলাদেশীর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। এ গ্রন্থের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সে গবেষণার স্বাক্ষর। কারণ, ভারতীয় এজেন্ডার কথাটি সঠিক ভাবে না জানলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঁচানো অসম্ভব হবে। কারণ ভারতের এজেন্ডা বুঝেই প্রণীত হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব এজেন্ডা। দীর্ঘকালীন ফ্যাসিবাদী শাসনে শুধু দেশের প্রশাসন, পুলিশ, মিডিয়া ও বিচার ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করা হয়নি, ধ্বংস করা হয়েছিল বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা। ইতিহাসের বই রচনা পরিণত হয়েছিল নিছক প্রপাগাণ্ডার হাতিয়ারে। ২০২৪’য়ের আগস্ট বিপ্লবের পর স্বাধীনতা মিলেছে একাত্তরে নিয়ে স্বাধীন ভাবে গবষেণার। এই বইখানি মূলত সে স্বাধীন পরিবেশে স্বাধীন গবেষণারই ফসল। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিয়ে ভাবে, আশা করি এই বই খানি তাদের জন্য চিন্তার খোরাক জুগাবে।