|| ড. বি এম শহীদুল ইসলাম ||
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আসল চরিত্র জাতির কাছে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন ও তা অব্যাহত রাখার জন্য একাধিক রাজনৈতিক দল থাকা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সমমনা নাগরিকগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। একটি স্বতন্ত্র মঞ্চে সমবেত হতে পারেন। কোনো একটি মতাদর্শ বা মূলনীতিকে পুরোভাগে আনা রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা ও ভবিষ্যতের সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দল থাকা জরুরি। দল না থাকলে গণতন্ত্রের সূচনা কিংবা বিকাশ কোনটাই সম্ভব নয়, বরং ফ্যাসিবাদ একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। বলা যায়, দল ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র পরস্পরের সহগামী। বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে গণতন্ত্র চর্চার চেষ্টা চলছে। কিন্তু গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বিশ শতকের প্রথম ভাগের দিকে এ অঞ্চলে দল ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। এ থেকে বোঝা যায়, জনগণের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আগ্রহ ও ব্যাকুলতা রয়েছে। সেই মোতাবেক একটি বহুমাত্রিক সমাজ মানস ইতোমধ্যে গড়ে উঠলেও প্রায়শই জাতীয় নেতৃত্বে তার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় না। সেজন্যই গণতন্ত্র মসৃণ পথ ধরে সামনে অগ্রসর হতে পারেনি। গণতন্ত্র বিঘ্নিত ও ধাক্কা খেয়েছে বারবার। এর নিকৃষ্টতম উদাহরণ হচ্ছে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তীকালে বাকশাল গঠন ও বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদের ঘটনা। তারপর পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, গোমতি, কপোতাক্ষ, ভৈরব নদী অতিক্রম করে কাদারখাল দিয়ে ঢলঢলে বিল হয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে দু্র্গাপুরের বেন্না বিল পর্যন্ত বলা যায়। কিন্তু গণতন্ত্রের কতটুকু উন্নতি হয়েছে, তা দেশবাসী ভালো করেই জানেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের শাসনামলে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একদলীয় বাকশালের সূত্রপাত ঘটে। তারপর রাজনৈতিক ভূমিকম্পে বাকশালের ধ্বংসস্তূপের ওপর জাতি নতুন উদ্যমে গণতন্ত্র চর্চার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ায়। অতঃপর বহুদলীয় ব্যবস্থার বিকাশ হলেও কার্যত দেশে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা জনগণের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে। বিগত সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘুরে-ফিরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক ও স্যাকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা হিসেবে দাবি করে। এদিকে বিএনপি নিজেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ভারতের মদদপুষ্ট একটি স্যাকুলার দল। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে পতিত শেখ হাসিনা ভারত প্রীতি ছাড়া কিছুই বোঝেননি, যার পুরস্কার হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জনগণের আন্দোলনের ফলে দেশে টিকতে না পেরে পালিয়ে ভারত সরকারের আশ্রয়ে অবস্থান নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি মধ্যমপন্থি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে জনগণের নিকট নিজেকে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন। সততার মানদণ্ডে জিয়াকে অধিকাংশ জনগণ পছন্দ করে। তার প্রমাণ জিয়া হত্যাকান্ডের পর তার সুটকেসে ছেড়া গেঞ্জি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি। অপরপক্ষে শেখ হাসিনা পলায়নের সময় হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তি ১৪টি সুটকেসসহ অনেক কিছুই আত্মসাৎ করেছে। বিএনপি ভারতবিমুখ দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আসলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দল দু’টিকে কেন্দ্র করে জাতি দু’টি আলাদা আলাদা শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বিগত প্রায় সাড়ে তিন দশকে গভীরভাবে লক্ষ করা গেছে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দু’টি দল দেশের দু’টি প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা অন্য অনেক দেশেই রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মতো অবস্থা বিশ্বের কোথাও নেই। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় দুই শতাব্দী ধরে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ওই দেশের উভয় দলের নেতাদের মধ্যে এমন কোনো প্রতিহিংসা বা পরস্পরকে দুশমন ভাবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ক্ষমতায় যে দলই যাক না কেন, দেশ গড়ার কাজে তারা সবাই একসাথে হয়ে কাজ করে অব্যাহতভাবে। এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব শেষ পর্যায়ে। স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে তিনিও খ্যাতি অর্জন করেছেন। দীর্ঘ নয়টি বছর ফ্যাসিস্ট কায়দায় দেশ চালিয়েছেন।তিনি জীবিত থাকাকালীন এবং তার তিরোধানের পর তার রেখে যাওয়া দল ফ্যাসিবাদের পোষা প্রাণির মতো শেখ হাসিনার পদচুম্বন করে সুবিধা ভোগ করেছে এবং দেশের বারোটা বাজিয়েছে। জামায়াত পুরাতন দল হলেও তাদের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো দ্বিতীয় পজিশনে আসতে পারিনি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটি ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে গেছে। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের সময় এ দলটি চরম অত্যাচার নির্যাতন ও জুলুমের শিকার হয়েছেন। তাদের প্রথম সারির অন্তত ১১জন নেতৃত্বকে বিচারিক কায়দায় হত্যা করেছে। ফ্যাসিবাদের শাসনামলে দলটিকে ধ্বংস করার অশুভ ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু তারা এখনো পর্যন্ত টিকে আছে।
২০১৩ সালে বিএনপি তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ কর্মীসমাবেশ আয়োজন করে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ নানা স্তরের নেতাকর্মী সমর্থক বহু নারী-পুরুষ সেখানে সমবেত হয়। দেখা গেল, সভাটি যখন শেষ পর্যায়ে, দলের তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সমাপনী ভাষণদান করছেন, ঠিক তখন সভাস্থলের বিপরীত দিক থেকে আকস্মিকভাবে নিক্ষিপ্ত কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে চতুর্দিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি। সভাটি তখন প- হয়ে যায়। এর পরের ঘটনাবলী প্রায় সকলেরই জানা। অনতিদূরে অবস্থানরত পুলিশ বাহিনী পলায়নপর লোকদের ওপর হামলে পড়ে, আবার জলকামান দিয়েও চালানো হয় আক্রমণের অস্ত্র। একই সাথে চলে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। তাতে আহত হন কয়েকজন সামনের সারির নেতা। ভীত সন্ত্রস্ত নেতৃবৃন্দ সভামঞ্চ ত্যাগ করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এখানেই পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি। অবিলম্বে পুলিশ সদর্পে প্রবেশ করে বিএনপি কার্যালয়ের অভ্যন্তরে। তল্লাশির নামে অফিসে ব্যাপক ভাংচুর করে। তছনছ করে অফিসের নানা মূল্যবান ফার্নিচারসহ জিনিসপত্র। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রবল আক্রোশে মহাসচিবের কক্ষের দরজা হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলে। দলীয় চেয়ারপার্সনের কক্ষটিও তছনছ করা হয়, যদিও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এসব কক্ষে অবস্থানকারী বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে পুলিশ বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত হয় এবং অশোভন আচরণ করে। তাদেরকে জোরপূর্বক অফিসের বাইরে বের করে দেয়া হয়। তারপর বিএনপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে ধাক্কা দিয়ে পূর্ব থেকে এনে রাখা ৬টি প্রিজনভ্যানে তুলে নেয়া হয়। কোনো প্রতিবাদ, আপত্তি কিংবা কোনো প্রশ্নের উত্তর উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা না দিয়ে কিংবা কোনো গ্রেফতারি পরওয়ানা না দেখিয়েই সবাইকে আটক করে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে। তখন বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, পুলিশ শুধু অফিসটি ল--ভ-ই করেনি, মূল্যবান কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সুটকেস ভর্তি লক্ষ লক্ষ চাঁদার টাকা, বছরের পর বছর ধরে রক্ষিত পার্টির নানান রেকর্ডপত্র, অন্যান্য দরকারি কাগজপত্রও নিয়ে যায়। এক কথায় অফিসটিতে এলাহী কান্ড ঘটায় পুলিশ। পুলিশের এহেন ন্যাক্কারজনক কর্মকা-, লুটপাট, ভাংচুর এবং নেতাদের গণগ্রেফতার অসম্মান, অপমানজনক আচরণ কোনো সভ্যসমাজে কল্পনা করা যায় না। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটা অবিশ্বাস্য। কেবল দুর্দান্ত স্বৈরতান্ত্রিক ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট শাসনেই এমনটা সম্ভব হতে পারে। গণতন্ত্রের প্রতি সামান্য পরিমাণ শ্রদ্ধাবোধ থাকলে এহেন অগণতান্ত্রিক আচরণ করা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার পুলিশের এমন তা-বকে প্রকাশ্যে অনুমোদন করেছে আর অট্টো হাসিতে ফেটে পড়েছে। বিভিন্ন সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নগ্ন হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে তার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে তার অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছে। রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় দেশের জনগণের মধ্যে প্রচ- ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় উঠে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হাসিনার পুলিশ বাহিনী হেফাজতের সমাবেশে যে নারকীয় তান্ডব ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা গোটা বিশ্বকে অবাক করেছে। রক্তাক্ত শাপলা চত্বর এখনো লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের কথা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের জনগণ জানে যে, শেখ হাসিনা সরকারের গণতন্ত্রের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল না, ছিল না বিরোধী দলগুলোর প্রতি মিনিমাম সম্মানবোধ। আলেমদের প্রতিও অসম্মানের ঝুঁড়ি নিক্ষেপ করা হয়েছে বারবার। সাংবাদিকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ ও হত্যাকন্ডের মতো ঘটনা কম ঘটেনি। শিক্ষকদের অবমাননাকর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে। মানবাধিকারের প্রতি তাদের উদাসীনতার কোনো ঘাটতি ছিল না। তৎকালীন আওয়ামী ক্ষমতাসীনদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে, তারা শুধু বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্নই করতে চায়নি, উপরন্তু দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য, হানাহানি, রাহাজানি, সৃষ্টি হোক তা চেয়েছিল। সমাজের সকল স্তরে একটা রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ুক সেটাই চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল এর মধ্য দিয়ে দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তারই ফাঁক-ফোকর বেয়ে দেশে কোনো তৃতীয় শক্তির উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই ফাঁকে কুশাসনের বোঝা ফেলে দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজের গা বাঁচিয়ে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে পালিয়ে গেলেও তার যেন কোনো সমস্যা না হয়। তারা মনে করেছিল এতে তাদের সমস্ত অপকর্ম আড়াল হয়ে যাবে। তাদের পালিয়ে যাওয়াটা সত্যে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা জনগণের কঠিন আন্দোলনে চাপের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট ক্ষমতা ছেড়ে দলীয় নেতাকর্মীদের অন্ধকারে রেখে ভারতে পালিয়ে গেছে। সেখান থেকে দেশের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। ফ্যাসিবাদের যারা অনুসারী আমি তাদেরকে বলতে চাই, শেখ হাসিনার অপকর্মের বোঝা আপনারা বহন করবেন না। আপনারা যদি সত্যিকার অর্থে দেশকে ভালোবাসেন তাহলে গঠনমূলক কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করুন এবং দেশের স্বার্থে কাজ করুন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে চিরতরে পরিত্যাগ করুন।
বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট নামের আপদ সরকারের লুটপাট, চাঁদাবাজি, দলবাজি দুর্নীতি ও দখলদারি চালিয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে, মিডিয়ার ওপর দলন-পীড়ন চালিয়েছে, দেশজুড়ে ত্রাস, খুন, গুম ও আয়নাঘরের রাজত্ব কায়েম করেছে। জাতিকে বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বিশেষ দেশ ও সম্প্রদায়ের পদতলে নিবেদন করেছে। সর্বোপরি অন্তহীন দুর্নীতির নয়া মহাভারত রচনা করেছে। তাতে তারা বুঝে গেছে যে, তাদের জন্য নতুনভাবে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন তো দূরের কথা রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসাটাও অসম্ভব। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের জনগণ কোনোভাবেই চায় না আওয়ামী লীগ আবার নতুনভাবে রাজনীতির মাঠে নেমে আসুক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যেভাবে মানুষ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাতে মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিচার অনিবার্য এবং ইতোমধ্যে তা শুরু হয়ে ফাঁসির রায়ও হয়েছে। এ রায় কার্যকর হোক জনগণ সেটা চায়। জনগণ চায় গণহত্যার বিচার, শেখ হাসিনার পুনর্বাসন নয়। আওয়ামী লীগ চেয়েছিল জেল-জুলুম, হত্যা, গুম, খুন, গ্রেফতার, ফাঁসি প্রভৃতি দ্বারা রাজনীতির ময়দান শূন্য করে, বিরোধী দলহীন ফাঁকা মাঠে একটি সাজানো নির্বাচন করে ক্ষমতা পুনর্দখল করতে। এছাড়া পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, দলীয় কর্মী-ক্যাডার দিয়ে দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতা প্রলম্বিত করা। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। কোনো ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে তা সম্ভব হবে না। গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে- সমঝোতা, সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে বিকশিত করা। সংঘাত, প্রতিহিংসা কিংবা উৎখাতের সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ধারণার বিপরীত।
আওয়ামী লীগের গোটা শাসনকাল সচেতনভাবেই সংঘাতের পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হচ্ছে প্রতিপক্ষকে বরদাশত করা, তাদের কথা শোনা, তাদের বিরোধিতা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া, প্রতিহত করা নয়। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে বিরোধী দলকে প্রতিহত করা, প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে নির্মূল করার সমস্ত অপকৌশল চর্চা করা হয়েছে। সেই অপচেষ্টা রক্তাক্ত রূপধারণ করেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। জাতিকে গণতন্ত্রের উন্মুক্ত ময়দান থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল নিরন্তরভাবে। সমাজে ক্রমশ আতঙ্ক-উদ্বেগের কোনো সীমা ছিল না। জাতি হয়ে পড়ছিল বিভাজিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করেছে শাসক মহল। দিনের পর দিন ঘটেছে রাজনৈতিক প্রাণহানির ঘটনা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিহিংসা ও শত্রুতা নয়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার সমাজের নানান গোষ্ঠী আলেম-ওলামা, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী প্রভৃতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে বারবার। সংঘাত-শত্রুতা উসকে দিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরিতে আনুকূল্য প্রদর্শন করেছে সবসময়। এতে করে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটিয়ে চুপিসারে পালিয়েছে দলবল নিয়ে। রাজনৈতিক পালাবদলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হতে হবে জনগণের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজ রাজনৈতিক দলের প্রধানমন্ত্রী হবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানমন্ত্রী। জনগণের প্রধানমন্ত্রী নন। নিজ দলের বাইরের জনগণ ছিল তার নিকট তুচ্ছ। দেশের সাধারণ জনগণকে তিনি সবসময় মূল্যহীন মনে করতেন। "তিনি মনে করতেন দেশ আমার, আমার পিতার, আমি চিরকাল ক্ষমতায় থাকতে চায়"। তাই তিনি একাধিকবার গ্রাম পাড়া মহল্লায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়ে জাতিকে চূড়ান্তভাবে বিভাজিত করেছিলেন। বিএনপি-জামায়াতসহ সকল প্রতিপক্ষের নামের তালিকা তৈরি করতে বলে তিনি জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনার মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে গৃহযুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
হিটলার ও মুসোলিনি যেমন একচ্ছত্র নেতৃত্বের অভিলাষে ভ্রান্ত আবেগ উসকে দিয়ে গোটা জাতি এবং তার দলকে সহিংস ও ভয়ানক মবোক্রেসিতে পরিণত করে তুলেছিলেন, তেমনি করে শেখ হাসিনার ইঙ্গিতে তারুণ্যের নামে গণজাগরণ মঞ্চ সাজিয়ে ‘ফাঁসি চাই’, ‘জবাই কর’ ইত্যাদি ভয়ংকর শ্লোগান তুলে জাতিকে বিশেষভাবে নবীন প্রজন্মকে অসংযত আবেগে উদ্বেলিত করে তোলা হয়েছিল। বিচারিক কায়দায় ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বিএনপির সুযোগ্য ও প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মুজাহিদ সাহেব ও মীর কাশেম আলীকে। জেলখানায় বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়েছে সাঈদী, গোলাম আযম, মাওলানা একেএম ইউসুফ ও মাওলানা আব্দুস সোবহানসহ বড় বড় খ্যাতিমান আলেমদেকে। এ যেন ছিল এক বিভৎস মৃত্যুপুরী। পরিকল্পিত উপায়ে হাস্যকরভাবে কোমলমতি স্কুলের বাচ্চাদের টেনে আনা হয়েছিল বড়দের সহিংস তামাশায়। কচি-কাঁচাদের মনকে জিঘাংসায় উত্তপ্ত করে তোলা হয়েছিল দেশের সামগ্রিক অবস্থাকে। তাদের ষড়যন্ত্র ছিল শিশু-কিশোররা অসুস্থ ও মনোবিকারগ্রস্ত একটি প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠবে, যার পরিণাম হবে ভয়ংকর। একটি অশুভ শক্তির পদচারণায় বাংলাদেশ ভারতের ফাঁদে পা দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার অযোগ্য দুর্নীতিবাজ শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির মাধ্যমে এক অখ্যাত শিক্ষা নীতির অমদানি করে ভারত থেকে, যা গোটা জাতিকে অনৈতিক জাতি হিসেবে এবং মূর্খ হিসেবে গড়ে তোলার গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। তরুণ প্রজন্মকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখার কুৎসিত খেলায় মেতে উঠেছিল। ক্ষমতার জন্য জাতি ধ্বংস ও ভারতের কাছে দেশ বিক্রীতেও আওয়ামী লীগের এতটুকু কার্পণ্য ছিল না। তার গোটা সময়কাল এ সত্যেরই প্রমাণ বহন করে। তাই ফ্যাসিবাদের আগমনের হুমকি দেশবাসী পরোয়া করে না।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান সরকারের নিকট জাতির প্রত্যাশা, তারা যেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী না হয়ে ওঠে। জনগণ এবং ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়। সর্বশেষ ফ্যাসিবাদের গুরু শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের যেসব নিকৃষ্ট চরিত্রের দুর্নীতিবাজ, সচিবালয়সহ সারা দেশে প্রশাসনে ঘুষ বাণিজ্য ও নামে বেনামে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ঐসব প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে শিক্ষক ও কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে বিদেশি সাহায্য সংস্থার নিকট থেকে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যত বড় খান, চৌধুরী, সৈয়দ, গোলাম-মুনিব, শিল্পকলার মালিক অথবা ধর্মের গুরু বলে নিজেদেরকে দাবি করেন না কেন, এদেরকে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে অপরাধের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় জুলাই শহীদদের বিসর্জিত রক্তের ঋণ কখনোই পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট।