সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম : * শহীদ মিনারে গুলি ও ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত   * শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে সিরিজ জয় বাংলাদেশের   * মাদারীপুরে অভিযান চালিয়ে বিপুল আতশবাজিসহ যুবক গ্রেফতার   * ‘বেঁচে থাকলে খুঁজে বের করে মারব’, নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি দিল ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড   * সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দু’টি ঘাঁটি থেকে খার্গে হামলা, বদলার হুঁশিয়ারি দিয়ে দুবাইয়ে হামলা ইরানের   * সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় অ্যাডভোকেট আজমিরি বেগম ছন্দা   * গণপরিবহনে তেল নেওয়ার সীমাবদ্ধতা থাকছে না : সড়ক মন্ত্রী   * ফয়সালকে পালাতে ‘সহায়তাকারী’ ফিলিপ ভারতে গ্রেপ্তার   * ইরানের পাশে দাঁড়াল রাশিয়া-চীন   * শিবচরে এমপি হানজালার বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল, নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা  

   মতামত
ইসলামী রাষ্ট্র কেন অপরিহার্য? (পর্ব:২)
  Date : 02-03-2026

ফিরোজ মাহবুব কামাল


উম্মাহর বিভক্তি ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়

ঈমান ও ইবাদত নিয়ে বাঁচার তাড়না থাকলে একতা নিয়ে বাঁচার তাড়নাটিও তীব্রতর হয়। কারণ, একতা নিয়ে বাঁচাও মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম। একতাবদ্ধ বাঁচার মধ্যে ব্যক্তির তাকওয়া দেখা যায়। নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ বহু সূদখোর, ঘুষখোর এবং মিথ্যাবাদীও আদায় করে, কিন্তু সে ইবাদত তাদেরকে বিভক্তির বিচ্যুতি থেকে বাঁচায় না। ব্যক্তির বেঈমানী স্পষ্ট দেখা যায় বিভক্তি গড়া ও সে বিভক্তি বাঁচিয়ে রাখার রাজনীতিতে। বিপুল সংখ্যক মুসলিমের প্রচণ্ড আসক্তি হলো বিভক্তির নিষিদ্ধ রাজনীতিতে। সে আসক্তির কারণেই নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের নামে মুসলিমগণ বিভক্ত ভূগোল নিয়ে বেঁচে আছে। সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতি যে কতটা বিশাল সেটি বুঝতে গবেষণা লাগে না; সেটি বুঝা যায় বিভক্তির  মাত্রা দেখে। কারণ বিভক্তির অর্থই হলো সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতি।

সে বিভক্তির রাজনীতি অনিবার্য করে শত্রু শক্তির গোলামী। তখন অসম্ভব হয় ভৌগলিক সংহতি নিয়ে বাঁচা। পরিতাপের বিষয় হলো, ১৯৭১’য়ে বিপুল বাঙালি মুসলিম ফ্যাসিস্ট মুজিবের ন্যায় এক দুর্বৃত্তের নেতৃত্বে একতার পথ ছেড়ে বিভক্তির পথ বেছে নিয়েছিল। তেমনি ১৯১৭ সালে বিভক্তির পথ বেছে নিয়েছিল জাতীয়তাবাদী ও গোত্রবাদী সেক্যুলার আরবগণ। ব্রিটিশ ও ফরাসী কাফিরদের সহায়তা নিয়ে তারা অখণ্ড আরব ভূমিকে খণ্ডিত করেছে ২২ টুকরোয়। অথচ মহান আল্লাহর তায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব পেতে নাস্তিক, জালেম বা মূর্তিপূজারী হওয়া লাগে না, বিভক্তির পথ বেছে নেয়াই সে জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কুর’আনে সে হুশিয়ারি শোনানো হয়েছে নিচের আয়াতে:     

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ ۚ وَأُولَـٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থ: “আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং নিদর্শন সমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে- তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫)।

একাকী একখানি গৃহ নির্মাণও অসম্ভব। তেমনি বিভক্তি নিয়ে কোন জনগোষ্ঠি সফল রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে না। রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য জরুরি হলো একতা। ভাষা, বর্ণ বা ভূগোল ভিত্তিক বিভক্তি নিয়ে অসম্ভব হলো শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণ। সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় একতাকেও ফরজ করেছেন। তিনি শুধু মদ, জুয়া, জ্বিনা, চুরি-ডাকাতি ও মানব খুনকে হারাম করেননি, হারাম করেছেন বিভক্তিকেও। বিভক্তি যে আযাবকে অনিবার্য করে সে ঘোষণা এসেছে উপরিউক্ত আয়াতে।

তাই মুসলিমগণ বিভক্ত হলো এবং দেশ ভাঙলো, অথচ তাদের আযাব এলো না -সেটি কখনো হয় না। বাঙালি মুসলিমগণ সে আযাব পেয়েছে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার পর। সে আযাবের নমুনা হলো, তারা ভারতের গোলাম হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি হাতে ভিক্ষুকের খেতাব জুটেছে, গণতন্ত্রের বদলে বাকশালী ফ্যাসিবাদ মিলেছে এবং ১৫ লাখের বেশী ১৯৭৪’য়ের দুর্ভিক্ষে না খেয়ে মারা গেছে। বহু হাজার মানুষ নিহত হয়েছে মুজিব ও হাসিনা সরকারের পরিচালিত গণহত্যায়। এগুলিই তো একাত্তরের মূল অর্জন। আরবগণ খেলাফত ভেঙেছে এবং ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে, ফলে তাদের উপরও আযাব অব্যাহত রয়েছে। বিধ্বস্ত ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ বহু আরব দেশ তো সে অর্জিত আযাবের সাক্ষি।

বৃহৎ রাষ্ট্র গড়ে একতা ও সম্পৃতির সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে জন্ম নেয় বিভক্তি ও ঘৃণা

বৃহৎ রাষ্ট্র গড়ে একতাবদ্ধ ভাবে বাঁচা ও রাজনীতির সংস্কৃতি। গড়ে উঠে নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মানুষের মাঝে পারস্পারিক সম্পৃতি। বৃহৎ রাষ্ট্র তখন কাজ করে সাংস্কৃতিক “মেল্টিং পট” রূপে। তখন আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, হাবশী একই শহরে পাশাপাশি বসবাস করেছে। বৈবাহিক সূত্রেও আবদ্ধ হয়েছে। বৃহৎ ভূগোলে বসবাসকারি মুসলিম জনগণ চেতনায় প্যান ইসলামী তথা বিশ্বজনীন মুসলিম ভাতৃত্বে বিশ্বাসী হয়। উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খেলাফত আমলে তো সেটিই দেখা গিয়েছিল। অপর দিকে দেশের ভূগোল ছোট হলে মনের ভূগোলও ছোট হতে শুরু করে। ছোট মনের মানুষগুলি তখন নিজ ভাষা, নিজ গোত্র ও নিজ এলাকার মানুষের বাইরে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবে না। চেতনার দিক দিয়ে তারা ট্রাইবাল হয়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র দেশ হওয়াতে বাংলাদেশীদের মাঝে সে ট্রাইবাল চেতনাটি প্রবল। তাই একজন বিহারী মুসলিম পাকিস্তানের বৃহৎ মানচিত্রে যতটা সম্মানজনক স্থান পায় বা যতটা স্থান পায় কলকাতার বাঙালিদের মাঝে -সেটি কখনোই তারা বাংলাদেশে পায়না। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বসবাসকারি মুসলিমদের রুচি, আগ্রহ ও সামর্থ্য থাকে না মুসলিম উম্মাহর সমস্যা নিয়ে ভাবার। অথচ মুসলিমদের ভূগোল যখন বৃহৎ ছিল তখন অন্য দেশের মুসলিমদের কল্যাণে তারা যুদ্ধ করেছে। যেমন মহম্মদ বিন কাসিম তাঁর বাহিনী নিয়ে সুদূর ইরাক থেকে ছুটে এসেছিলেন সিন্ধুর রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। লক্ষ্য ছিল, সিন্ধুর মজলুমদের মুক্তি দেয়া। একই কারণে কাশ্মীরী মুসলিমদের স্বাধীনতা দিতে বার বার যুদ্ধ করেছে পাকিস্তান। কিন্তু ভৌগলিক ক্ষুদ্রতার কারণে সে রুচি বাংলাদেশীদের নাই। ফলে প্রতিবেশী মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বার বার গণহত্যার শিকার হলেও তাদের পাশে কখনো দাঁড়ায়নি। ভারতীয় মুসলিমদের পাশেও দাঁড়ায়নি।     

ঈমান নিয়ে বাঁচার অর্থ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে একতা নিয়ে বাঁচা। মদ, জুয়া, জ্বিনা, সূদ, ঘুষ যেমন ঈমানদারের কাছে অসহ্য, তেমনি অসহ্য হলো বিভক্তি নিয়ে বাঁচা। ঈমানদারের প্রবল আগ্রহ যেমন নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতে, তেমনি আগ্রহ থাকে একতায়। মুসলিম উম্মাহর ৫০টির বেশী রাষ্ট্রে বিভক্ত মানচিত্র হলো বস্তুত তাদের মনের বেঈমানীর দৃশ্যমান রূপ। এ বেঈমানী কখনো নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে লুকানো যায়না। শয়তান মুসলিম মাঝে বিভক্তি চায় এবং কাফেরদের মাঝে একতা চায়। তাই শয়তানী শক্তিবর্গ জোট বেঁধে পাকিস্তানকে বিভক্ত করেছে; অথচ ভারতের ১২০ কোটি হিন্দুকে একতাবদ্ধ রেখেছে।

স্পেনে মুসলিমদের ৭ শত বছরের শাসন বাঁচেনি। কারণ, তারা ছিল বিভক্ত। স্পেনের মুসলিম শাসক পরিবারে দেখা গেছে পিতার বিরুদ্ধে পুত্রকে এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে যুদ্ধ করতে। পিতার হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে রাজপুত্ররা অমুসলিম রাজাদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছে এবং যুদ্ধে পিতাকে পরাজিত করেছে। অপরদিকে খৃষ্টানগণ ছিল একতবদ্ধ -একতাবদ্ধ হয়েছে এক রাজ্যের রাজা ফার্ডিনান্ড এবং অপর রাজ্যের রানী ইসাবেলা। বিভক্তির কারণে বিপুল সম্পদ, জনবল ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও স্পেন থেকে মুসলিমদের নির্মূল হতে হয়েছে। বিভক্তির প্রতি যুগে এবং প্রতি দেশে একই পরিণতি ডেকে আনে। আজও মুসলিমদের জনবল ও সম্পদে কমতি নেই; কিন্তু বিভক্তি ও দুর্বৃত্তির কারণে তারা আজ নিজ দেশেও পরাজিত ও অধিকৃত। ২২টি রাষ্ট্রে বিভক্ত ৪০ কোটি আরব আজ জিম্মি ৭০ লাখ ইসরাইলীদের হাতে। বিভক্ত মুসলিমদের এভাবে শাস্তি দেয়াই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। 

শত্রু শক্তির অধিকৃতি ও গোলামী থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের মাঝে একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। কিন্তু মুসলিমদের বিদ্রোহ পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার সে হুকুমের বিরুদ্ধে। নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের ন্যায় ইবাদত যতই পালন করা হোক তা কখনোই পরাজয় ও পরাধীনতা থেকে বাঁচায় না। অতীতেও বাঁচায়নি; ভবিষ্যতেও বাঁচাবে না। কারণ, নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের ন্যায় ইবাদতগুলি কখনোই ঈমান, একতা ও জিহাদের বিকল্প নয়। একতার বিকল্প একমাত্র একতা। তাই নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাতের বাইরে একতাকে আলাদা ভাবে ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীনতা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে অন্যান্য ইবাদতের সাথে জিহাদও চাই। তবে সে পবিত্র জিহাদ শুধু একাকী হলে চলে না, অন্যদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলতে হয়। অনৈক্যের কারণে অতীতে বার বার আযাব এসেছে। কিন্তু সে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ায় মুসলিমদের কোন আগ্রহ নাই! মহান রবের হুকুম পালন তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।


ঈমানদারের ভূ-রাজনৈতিক ভিশন এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের তাড়না

মুসলিমের লক্ষ্য শুধু মহান আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর দ্বীন ও নবী-রাসূলদের উপর বিশ্বাসী হওয়া নয়। শুধু নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তেলাওয়াত নিয়ে বাঁচাও নয়। মু’মিনের বাঁচার মধ্যে প্রতিক্ষণ অতি তীব্র ও অদম্য তাড়না কাজ করে। সেটি তাঁর মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার। তা থেকে সে পায় একটি ভূ-রাজনৈতিক ভিশন। সে ভিশন ও এজেন্ডা থেকে জন্ম দেয় শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের তাড়না। কারণ সে রাষ্ট্র ছাড়া তাঁর ভিশন ও এজেন্ডা শুধু স্বপ্নই থেকে যায়। সে রাষ্ট্রের নির্মাণে ও প্রতিরক্ষায় প্রতিটি ঈমানদারের জীবনে আমৃত্যু জিহাদও এসে যায়। তখন সে জিহাদে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের কুরবানীও আসে। সে পবিত্র এজেন্ডা, সে ভূ-রাজনৈতিক ভিশন এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রবল তাড়না দেখা গেছে খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর অনুসারী সাহাবাদের মাঝে।

নবীজী (সা:) তাঁর মাত্র ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনে সে এজেন্ডা ও ভিশনকে তিনি সফল করতে পেরেছিলেন। ফলে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চল-ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে এক বিশাল প্যান-ইসলামিক রাষ্ট্র। নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত সে রাষ্ট্রের আয়তন তাঁর জীবদ্দশাতেই বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণের অধিক ছিল। সাহাবীগণ সে রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের চেয়ে ৮০ গুণেরও বেশি বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ফলে মুসলিমগণ পরিণত হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তিতে। প্রকৃত ঈমানদার এবং নবীজী (সা:)’য়ের সত্যিকার অনুসারী তো তারাই যারা বাঁচে নবীজী (সা:)’য়ের ন্যায় সে এজেন্ডা, সে ভিশন এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সে তাড়না নিয়ে। আজকের মুসমদের মূল ব্যর্থতাটি এখানেই। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস এবং নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও তেলাওয়াত নিয়ে বাঁচলেও তারা বাঁচে না ইসলামের সে এজেন্ডা, ভিশন ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের তাড়না নিয়ে। দাড়ি, টুপি, পাগড়ি ইত্যাদি নবীজী (সা:)’য়ের এরূপ বহু সূন্নত পালনে তাদের আগ্রহ দেখা গেলেও আগ্রহ নাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ন্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি পালনে। অথচ মানব জাতির -বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য পাল্টাতে হলে সবচেয়ে জরুরি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সূন্নতটি পালন করা। নইলে ব্যর্থ হতে হয় নবীজী (সা:)’য়ের প্রকৃত অনুসারী হওয়ায়। পরিতাপের বিষয় হলো, বহুকাল যাবত ব্যর্থতা ও বিচ্যুতির সে পথটি বেয়েই নিচে নামছে এবং থামার নাম নিচ্ছে না।   

মুসলিম পরিবারে জন্মালে বা ইসলাম কবুল করলেই মুসলিমের দায়িত্ব শেষ হয়না। নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত এবং দোয়া-দরুদ পাঠ করলেও মুসলিম রূপে বাঁচার কাজটি যথার্থ ভাবে হয়না। বরং মুসলিম রূপে বাঁচা ও পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য অতি জরুরি হলো সহায়ক রাষ্ট্রীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা, সে কাজটি কাফিরদের অধিকৃত দেশে হয়না। পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য চাই সহায়ক শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও বুদ্ধিবৃত্তি। সেরূপ একটি সহায়ক রাষ্ট্রীয় পরিবেশ একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের পরই সম্ভব। সেরূপ পরিবেশ অনৈসলামী রাষ্ট্রে জুটে না। সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহর তায়ালার চেয়ে সে বিষয়টি আর কে জানে? তাই মহান রব’য়ের নির্দেশেই নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। অথচ নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সূন্নত মুসলিমদের মাঝে আজ বেঁচে নাই। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা না দিয়ে তারা বরং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে জাতীয়তাবাদী, গোত্রবাদী, ফ্যাসিবাদী ও রাজতন্ত্রী সেক্যুলার রাষ্ট্রে। মুসলিমদের রাষ্ট্রগুলি এভাবেই অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে। শত্রুশক্তির হাতে রাষ্ট্রকে এভাবে অধিকৃত রেখে সে রাষ্ট্রে প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার কাজটি শুধু কঠিনই হয় না, বরং অসম্ভব হয়। কারণ, সে রাষ্ট্রে অতি দুর্লভ বা অসম্ভব করা হয় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানার্জন এবং পূর্ণ ইসলাম পালন।

মুসলিম জীবনের মূল এজেন্ডা

মুসলিম জীবনের মূল এজেন্ডা হলো ঈমান বাঁচানো, ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা এবং মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালন। এ পথেই সে নিজেকে তাঁর রব’য়ের মাগফিরাত ও জান্নাতের জন্য প্রস্তুত করে। তবে সেরূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠার জন্য অপরিহার্য হলো কুর’আনী জ্ঞান। পানাহারের অভাবে দেহ বাঁচে না, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানের অভাবে ঈমান বাঁচে না। কুর’আনী জ্ঞানের মধ্যেই ঈমানের পুষ্টি। তাই কুর’আনী জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় ঈমান। সে বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বয়ান এসেছে সুরা আনফালের ২ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে:

وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ءَايَـٰتُهُۥ زَادَتْهُمْ إِيمَـٰنًۭا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

অর্থ: “এবং যখন তাদের সামনে কুর’আনের আয়াত পড়ে শুনানো হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তাঁরা তাদের রব’য়ের উপর নির্ভর করে।”

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ইবাদত কবুলের শর্ত হলো, ইবাদতকারীকে অবশ্যই ঈমানদার হতে হয়; তাঁর কাছে বেঈমানের নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের কোন মূল্য থাকেনা। তার কোটি টাকা দান -এমন কি প্রাণদানেও কোন লাভ হয়না। তাই ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে মহান আল্লাহতায়ালা কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে সর্বপ্রথম ফরজ করেছেন, নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলিকে নয়। এটিই হলো প্রকৃত মুমিন রূপে বেড়ে উঠার পবিত্র লড়াই তথা জিহাদ। এবং বুদ্ধিবৃত্তিক এ জিহাদকে বলা হয়েছে “জিহাদান কবিরা” তথা বড় জিহাদ। সে জিহাদের অস্ত্র হলো পবিত্র কুর’আন। নামাজের ওয়াক্ত দিনে পাঁচ বার, কিন্তু এ জিহাদের ওয়াক্ত প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ। এ জিহাদের হুকুম এসেছে সুরা ফুরকানের  ৫২ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে:

فَلَا تُطِعِ ٱلْكَـٰفِرِينَ وَجَـٰهِدْهُم بِهِۦ جِهَادًۭا كَبِيرًۭا

অর্থ: “অতঃপর (হে নবী) কাফিরদের অনুসরণ করবেন না এবং এই কিতাব (কুর’আন) দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বড় জিহাদটি করুন।” 

মুসলিম দেশে শয়তানের স্ট্রাটেজী

ইসলামের শক্তির উৎস কোথায় -শয়তান ও তার অনুসারীগণ সেটি বুঝতে কখনোই ভুল করে না। শক্তির উৎস যে পবিত্র কুর’আন -সেটি তারা জানে। ফলে তাদের এজেন্ডা হয়, কুর’আন থেকে জ্ঞানদানের কাজকে বন্ধ করা। অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে সিরাতাল মুস্তাকীম খুঁজে পাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো সে পথে চলা। মহান আল্লাহর তায়ালার ভাষায় সিরাতাল মুস্তাকীম হলো পবিত্র কুর’আন। তাই কাফির অধিকৃত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হয়, কুর’আন থেকে শিক্ষাদান বন্ধ করে মুসলিম ছাত্রদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে অসম্ভব করা। এবং সে সাথে সহজতর করা জাহান্নামের পথে চলা। সেটিই হলো শয়তানের ঘোষিত এজেন্ডা -যার উল্লেখ এসেছে পবিত্র কুর’আনে। তাই শয়তানের অনুসারিদের সে স্ট্র্যাটেজি দেখা যায় তাদের অধিকৃত প্রতিটি দেশে। সে স্ট্র্যাটেজি দেখা গেছে কম্যুনিস্ট অধিকৃত সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, আলবানিয়ার মত দেশগুলিতে। সে নীতির প্রয়োগ দেখা যায় বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি সেক্যুলার রাষ্ট্রেও।

অথচ মুসলিম দেশে কুর’আনের জ্ঞানে জনগণকে জ্ঞানবান করার দায়িত্বটি নিতান্তই রাষ্ট্রের। বস্তুত এটিই হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। জনগণ তাদের সন্তানদের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষুধা বিশেষ করে কুর’আনী জ্ঞানদানের দায়টি রাষ্ট্রের। সেজন্যই জনগণ রাষ্ট্রকে রাজস্ব দেয়। কিন্তু কুর’আনী জ্ঞানদানের সে কাজটি না হলে ছাত্রদের মাঝে বেঈমানীর মহামারি শুরু হয়। একাজটি দেশের কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি তথা সাধারণ জনগণ নিজ দায়িত্বে নিতে পারেনা। কিন্তু ভয়ানক বিপদের কারণ হলো বাংলাদেশের ন্যায় একটি অনৈসলামী রাষ্ট্রের সে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কখনোই হওয়ার নয়। অনৈসলামী রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। নিরেট বাস্তবতা হলো, মুসলিম ছা্ত্রদের ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠাই এ রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি অসম্ভব করে রেখেছে। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে ইসলামের বিরুদ্ধে নাশকতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল তাদের প্রবর্তিত এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। ইসলামের এ শত্রুগণ পরিকল্পিত ভাবে মুসলিম ছাত্রদের দূরে সরিয়েছে পবিত্র কুর’আন থেকে। এভাবে জ্ঞানার্জনের ফরজ পালন হতে দেয়নি।

ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে বহু আগে; কিন্তু তাদের প্রণীত সে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। যেসব দুর্বৃত্তরা বাংলাদেশকে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম করলো, তারা মাদ্রাসায় গড়ে উঠেনি, উৎপাদিত হয়েছে এ সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই। যতদিন এ সেক্যুলার রাষ্ট্র বেঁচে থাকবে, ততদিন দুর্বৃত্ত উৎপাদনের এ অভিশপ্ত কারখানাগুলিও বেঁচে থাকবে। কারণ, দেশের দুর্বৃত্ত কবলিত রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রশাসনের লাইফলাইন হলো এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি। তাই এ শিক্ষাব্যবস্থাকে তারা যে কোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখবেই। নইলে তাদের দুর্বৃত্তি-নির্ভর রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মৃত্যু ঘটবে। কারণ তারা এবং বিদেশী বন্ধুগণ জানে বাংলাদেশের বুকে ইসলামের উত্থান প্রতিহত করার মূল হাতিয়ার হলো ব্রিটিশদের প্রবর্তিত এই সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। ইসলামী জ্ঞানশূণ্য এই সেক্যুলার বদমায়েশগণ ভারতীয় মুসলিমদের ইসলামী পাকিস্তান নির্মাণের প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। ইসলামী বাংলাদেশ নির্মাণের যে কোন প্রচেষ্টাকেও এরা ব্যর্থ করবে।

অথচ নবীজী (সা:)’য়ের উম্মত রূপে বাঁচতে হলে তাঁর রাষ্ট্র নির্মাণের পবিত্র সূন্নতটিকেও অবশ্যই মানতে হয়। তিনি যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন ও ১০ বছর সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন -সেরূপ একটি রাষ্ট্রের কোন বিকল্প নাই। সে পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থ নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত থেকে বিচ্যুত হওয়া। এর অর্থ সিরাতালর মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়া। কারণ, নবীজী (সা:) যা কিছু করেছেন -সেগুলি তো সিরাতাল মুস্তাকীমেরই অংশ। এজন্যই শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করলে চলে না, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের সুরক্ষার দায়ভারটও মুসলিমদের নিজ কাঁধে নিতে হয়। এটিই হলো নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এটি হলো ঈমান নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠার জন্য প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানী দায়বদ্ধতা। সে ঈমানী দায় পালনে মুসলিম জীবনে জিহাদ অনিবার্য হয়ে উঠে। সে জিহাদ দেখা গেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনে। অর্ধেকের বেশি সাহাবী সে জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন।

অথচ যারা কুর’আন থেকে দূরে সরে, তাদের মাঝে সে জিহাদ কখনো দেখা যায় না। কারণ, কুর‌’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমানের সে দীপ কখনো জ্বলে না। সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে দ্রুত দূরে সরে এ ঈমানশূণ্যরাই খাড়া হয় ইসলামের প্রতিপক্ষ রূপে। এরাই হলো মুসলিম নামধারী ইসলামের ঘরের শত্রু। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও ইসলামের পক্ষের শক্তিকে পরাজিত রাখার কাজে রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ভোটকে এরা হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে। বাংলাদেশে এদের সংখ্যাটি বিশাল। তাদের ভোটে দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ নেতা, ঋণখেলাফি রাজনীতিবিদ, খুনের মামলার আসামীও বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। এরাই অসম্ভব করে রেখেছে সুবিচার ও সুশাসনের প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই হলো শয়তানের একনিষ্ঠ খলিফা।



  
  সর্বশেষ
২৫ রমজানের রোজা ও রাত অত্যন্ত বরকতময় বিশেষ ফজিলত হলো, এই দিনে রোজা রাখলে কবরের শাস্তি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়
কেরানীগঞ্জ প্রেসক্লাব আয়োজিত ইফতার ও দোয়ার মহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে
শহীদ মিনারে গুলি ও ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত
খিলক্ষেতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনজনের মৃত্যু



প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: তাজুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: ২১৯ ফকিরের ফুল (১ম লেন, ৩য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০ থেকে প্রকাশিত ।
ফোন: ০২৪১০৭০৯৯৬ মোবাইল: ০১৮৩৪৮৯৮৫০৪, ০১৭২০০৯০৫১৪

Web: www.dailyasiabani.com ই-মেইল: dailyasiabani2012@gmail.com